পোশাক শিল্পের কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী ২৬ মাস বাড়ানোর পক্ষে সম্মতি দিয়েছে। যদিও বিজিএমইএ পক্ষ থেকে এই ঋণ ফেরত দেওয়ার মেয়াদ ৩ বছর চেয়েছে।
এর আগে দেড় বছরের মধ্যে ১৮টি কিস্তি পরিশোধের জন্য সময় বেঁধে দেয় সরকার। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সব কিস্তি পরিশোধ করতে পারেননি উদ্যোক্তারা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
সূত্র জানায়, প্রণোদনা ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে গত ২ জানুয়ারি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে চিঠি দিয়েছে বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ। দুটি বৈঠকে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় সায় দিয়েছে।
আরও জানা গেছে, পোশাক খাতের শ্রমিকদের বেতন ভাতা পরিশোধে সরকারের দেওয়া প্রণোদনা ঋণ ১৮টি কিস্তিতে পরিশোধের শর্ত ছিল। হিসাব করে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত উদ্যোক্তারা ঋণের ৫টি কিস্তি পরিশোধ করেছেন। বাকি ১৩টি কিস্তি এখনো বকেয়া আছে। এই ১৩ কিস্তি পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ২৬ মাস সময় দেওয়ার পক্ষে সম্মতি দিয়েছে অর্থ বিভাগ। খুব শিগগিরই এটি কার্যকর হতে পারে। জানতে চাইলে বিকেএমইএ’র নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম যুগান্তরকে জানান, আমরা ইতোমধ্যে ৫টি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছি। এখন পাওনা আছে ১৩টি কিস্তি। এটি পরিশোধের জন্য ৩ বছর সময় চেয়েছি। গত সপ্তাহে এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তারা আমাদের ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। তিনি আরও বলেন, ‘ঋণের কিস্তি পরিশোধ করার মতো পরিস্থিতি এখনো পোশাক শিল্পে তৈরি হয়নি। এতদিন শুধু টিকে থাকার চেষ্টা করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে ওমিক্রন শঙ্কা বিদেশি ক্রেতারা সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানি মূল্য পরিশোধে বিলম্ব করছে।
এদিকে অর্থমন্ত্রীকে দেওয়া বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলেন, বিশ্বব্যাপী করোনার নানা ধরনের কারণে আরও গভীর সংকটের মুখে পড়েছে তৈরি পোশাক শিল্প। এ শিল্পের মালিকরা পোশাক শিল্পের ভবিষ্যৎ, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও শ্রমিকদের মজুরিসহ অন্যান্য কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন।
করোনাভাইরাসের কারণে বড় ধরনের হুমকির মধ্যে পড়েছিল এ খাত। সরকারের সহযোগিতার কারণে এ শিল্পের উদ্যোক্তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা এখনো অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু করোনার নানা ধরনের কারণে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করছে। এছাড়া রপ্তানি করা পণ্যের মূল্য পরিশোধে অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সময় নিচ্ছেন। অধিকাংশ ক্রেতা সময়মতো মূল্য পরিশোধ করছেন না। নির্দিষ্ট সময়ে পেমেন্ট না পাওয়ার কারণে শিল্পে তারল্য সংকট ক্রমেই বাড়ছে। তাই এই সংকটকালীন সময়ে কর্মীদের বেতন-ভাতা দেওয়ার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধে কিস্তির সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিজিএমইএ প্রণোদনা ঋণের কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে চিঠি দিয়েছে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগেও একবার কিস্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। এরপর কিছু কিস্তি পরিশোধও করেছেন তারা। নতুন করে বিজিএমইএ কিস্তি সংখ্যা বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে সেটি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, করোনায় পোশাক খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। ২০২০ সালের এপ্রিলে এ খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে প্রথমে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। পরে এর পরিমাণ বেড়ে ১০ হাজার ৫শ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। ঋণের প্রথম কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে। এরপর বিজিএমইএর পক্ষ থেকে কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পরিশোধের গ্রেস পিরিয়ড ৬ মাস দিয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির সার্কুলার জারি করে। সেখানে বলা হয়, অক্টোবর থেকে ১৮ মাসের মধ্যে ১৮টি সমান কিস্তিতে উদ্যোক্তারা এই টাকা পরিশোধ করবেন। এরপর মোট ৫টি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে ওমিক্রনের প্রভাব, যা এ শিল্পকে আবারও বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলে দেয়।


