সোমবার ,৪ মে, ২০২৬
sbacbank
Home Blog Page 696

হাজীগঞ্জে সংঘর্ষ-মৃত‌্যু, ১৪৪ ধারা জারি

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বাজারে মিছিলে গুলিতে তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- বাবলু (২৮), আল আমিন (১৮) ও শিশু হৃদয় (১৪)। এই ঘটনায় আহত হয়েছে কমপক্ষে ২০ জন।

এদিকে সহিংস পরিস্থিতিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন।

হাজীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সোহেল আহমেদ চিশতী বলেন, হাসপাতালে চারজন ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন মারা গেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী মজিবুর রহমান পাটোয়ারী জানান, বুধবার সন্ধ্যায় হঠাৎ হাজীগঞ্জ বাজারে একটি প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বাজারের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে হাজীগঞ্জ মধ্য বাজার মন্দিরের সামনে গেলে হট্টগোল শুরু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়।

পুলিশ জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে তারা রাবার বুলেট ছুড়েছে।

এতে মিছিলে থাকা রায়চোঁ গ্রামের আল আমিন (১৮), হোটেল শ্রমিক চাপাইনবাবগঞ্জের বাবলু (২৮) ও পথচারী শিশু রান্ধুনীমুড়া গ্রামের ফজলুর ছেলে হৃদয় (১৫) গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাদেরকে হাজীগঞ্জ থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে রাতে হাজীগঞ্জ পশ্চিম বাজার বিশ্বরোড এলাকায় গাড়ি ভাংচুর করা হয়েছে বলে যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন।

পরিস্থিতি শান্ত করতে হাজীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান গাজী মো. মাঈনুদ্দিন, পৌর মেয়র আসম মাহবুব উল আলম লিপনসহ নেতারা ও পুলিশ প্রশাসন প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

হাজীগঞ্জ থানার ওসি হারুনুর রশিদ বলেন, আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। হামলাকারীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, মৃত্যুর কথা শুনেছি। তবে কয়জন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি এখনও।

এদিকে সহিংস পরিস্থিতিতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাজীগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন।

একই সঙ্গে বুধবার রাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক অঞ্জনা খান মজলিশ জানিয়েছেন।

হাজীগঞ্জ থানার ওসি হারুনুর রশিদ রাতে বলেন, হাজীগঞ্জ বাজারের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গ্যাসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার পুতিনের

ইউরোপ জুড়ে চলা গ্যাস সংকটকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এই সব অভিযোগকে ‘ সম্পূর্ণ ভুয়া এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ প্রণোদিত গালগল্প’ হিসেবে দাবি করেছেন তিনি। বুধবার বিবিসির প্রতিবেদনে এ খবর জানা গেছে।

বুধবার মস্কোর এনার্জি ফোরামে আলাপকালে পুতিন প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউরোপকেই বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী করে বলেন, শীতের পর ইউরোপিয়রা গ্যাস সংরক্ষণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।

ইউরোপের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাসের জোগানদাতা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে গ্যাস সরবরাহ আটকে রাখার অভিযোগ উঠেছে।

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি মোকাবেলার জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি একত্রে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গ্যাসের পাইকেরি মূল্য অন্তত ২৫০ শতাংশ বেড়েছে। গ্রাহক ও ব্যবসায় ওপর এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পড়েছে।

এই রেকর্ড পরিমান মূল্যবৃদ্ধির জন্য করোনা মহামারি পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে অর্থনীতিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণ হয়েছে।

 

মালয়েশিয়ায় করোনায় ১ লাখ ৬৫ হাজার বেকার

মালয়েশিয়ায় মহামারি করোনায় ১ লাখ ৬৫ হাজার লোক বেকার হয়েছেন। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বেকারত্বের হার ৪.৪ শতাংশ বা ১৬৫০০০ বেকার ব্যক্তির রেকর্ড করা হয়েছে বলে জানান রাজ্যের একজন নির্বাহী কাউন্সিলর।

রাজ্য সরকার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়েছে এবং আশা করছে যে, “জেলাজাহা সেলাঙ্গর বেকারজা ২০২১” এর মাধ্যমে শতকরা হার কমিয়ে প্রায় ২৫০০০ চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। রাজ্য যুব প্রজন্ম উন্নয়ন, খেলাধুলা এবং মানব মূলধন উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খায়রুদ্দিন ওথমান এ তথ্য জানান।

১২ অক্টোবর সেলাঙ্গরে অনুষ্ঠিত একটি আলোচনা সভায় ওথমান বলেন, ২০০টি কোম্পানিকে যুক্ত করা কর্মসূচিতে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে বেকারত্বের হার ৭.৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০১৯ সালে সেলাঙ্গর বেকারত্বের হার ২.৯ শতাংশ এবং ২০২০ সালে মহামারিজনিত কারণে এ সংখ্যা ৪.৫ শতাংশ বেড়েছে।

জেলাজাহ সেলাঙ্গর বেকারজা ২০২১ চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে; যা শাহ আলম, কুয়ালা সেলাঙ্গর, কুয়ালা কুবু ভারু, হুলু লাঙ্গাত এবং পেটালিংয়ে কার্যক্রম শুরু হবে এবং এটি একটি হাইব্রিড ইভেন্ট হবে।

এছাড়া ক্যারিয়ার কার্নিভাল ইনভেস্ট সেলাঙ্গর ভিডির সহযোগিতায় মহাকাশ শিল্পে চাকরির পাশাপাশি পরিষেবা, উৎপাদন, ইলেকট্রনিক্স এবং ব্যবস্থাপনা খাতের অন্যান্য চাকরির ওপরও নজর দেবে।

বিশেষ করে যুবকরা তাদের কর্মজীবনের বিকল্পগুলো চিহ্নিত করতে এবং নিয়োগকর্তাদের তাদের প্রয়োজনীয় জনশক্তি পেতে সাহায্য করার জন্য www.selangorbekerja.com.my ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে রাজ্য সরকার প্রদত্ত উদ্যোগের সুবিধা গ্রহণ করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ ৩ সংস্থা চুপ

বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানিতে (বিআইএফসি) লুটপাটের ঘটনার সময় ‘নীরব দর্শকের ভূমিকা’য় ছিলেন তদারকির তিন সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সংস্থাগুলো হচ্ছে-বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ, শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং কোম্পানিগুলোর নিবন্ধক পরিদপ্তর যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মগুলোর নিয়ন্ত্রক (আরজেএসসি)।

অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠান অনিয়ম প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে লুটপাটের পক্ষে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। অথচ প্রতিটি সংস্থারই নিজস্ব আইনে অনিয়মের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার যথেষ্ট আইনি ভিত্তি ছিল।

আর্থিক খাতে জাল-জালিয়াতির বিষয়ে আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের গঠিত ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং’ বা ‘কারণ অনুসন্ধান’ কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, ১ অক্টোবর বিআইএফসির আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে ওই কমিটি। প্রতিবেদনটি আদালতে উপস্থাপন করা হবে। আদালত তিনটি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের বিষয়ে কারা কিভাবে জড়িত সে বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মধ্যে বিআইএফসির তদন্ত প্রতিবেদন গভর্নরের কাছে জমা দেওয়া হলো। এখন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ও পিপলস লিজিংয়ের ওপর তদন্ত হবে।

প্রতিবেদনে বিএফএফইসর অনিয়ম-দুর্নীতির প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব বিভাগের কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিবন্ধন নিয়ে বিআইএফসি আর্থিক কার্যক্রম শুরু করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লাইসেন্স দেখে আমানতকারীরা অর্থ জমা রাখেন। এখন আমানত ফেরত দিতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যর্থতার দায় নিয়ন্ত্রক হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংককেও নিতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির তাদকির দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, পরিদর্শনের দায়িত্ব পালন করত ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ ২ এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান উপবিভাগ এবং পরে গঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রক হিসাবে কাজ করত আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা পরিচালক মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ৬৭টি হিসাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। বর্তমানে সুদসহ এটি বেড়ে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিনি ১০৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন। বাকি টাকা পরিশোধ করেননি। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানায় বদল হয়।

পরপর তিন দফা মালিকানা বদল হয়ে সেটি পিকে হালদার গ্রুপের কাছে যায়। আদালতের হস্তক্ষেপের আগে পিকে হালদারের ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার এর পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। আর পরিচালক ছিলেন পিকে হালদারের নিকটাত্মীয়রা। তারা এখন পলাতক। কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরের সময় যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি। যদিও মেজর (অব.) আবদুল মান্নান একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো টাকা আত্মসাৎ করেননি। তার কাছ থেকে মালিকানা বদল হওয়ার পরই টাকা আত্মসাৎ হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিআইএফসির আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে এতে প্রশাসক নিয়োগের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিচের স্তর থেকে সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই সুপারিশ তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক শাহ আলম তার কাছে আটকে রেখেছিলেন। তিনি তা উপরের দিকে উপস্থাপন করেননি। ফলে এতে প্রশাসক নিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। এতে প্রশাসক নিয়োগ করলে পরে জালিয়াতির ঘটনাগুলো ঠেকানো যেত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের ২ এর আওতায় একটি উপবিভাগ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিদর্শন করার জন্য। এ বিভাগ থেকে প্রতিষ্ঠানটির ওপর যথাযথ পরিদর্শন হয়নি। পরে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ হলে সেখান থেকেও তদারকির অভাব ছিল। ওই সময়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর একে সুর চৌধুরী। তদারকির ক্ষেত্রে তার গাফিলতি রয়েছে। যে কারণে ওই প্রতিষ্ঠানের অনেক নেতিবাচক তথ্যই উপরের দিকে যেত না এবং প্রতিকারমূলক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সুর চৌধুরীর পর ডেপুটি গভর্নর হিসাবে এ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন এসএম মনিরুজ্জামন। কমিটি ওই দুই ডেপুটি গভর্নরসহ, নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

তদারকি সংস্থা হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিচের স্তরের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে উপরের স্তরের কর্মকর্তা যারা বিআইএফসির অবৈধ সুবিধা দেওয়ার তালিকার ফাইলে স্বাক্ষর করেছেন তাদের একটি তালিকা প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী এ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। তাকেও তালিকায় আনা হয়েছে। তিনি অবসরে যাওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অপর ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান এ বিভাগের দায়িত্বে আসেন। তিনিও ওই তালিকায় রয়েছেন।

২০১৫ সালের পর তিন দফা এর মালিকানা বদল হয়েছে। প্রতি দফায় মালিকানা বদল হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি নমনীয় ভূমিকা রেখেছে। তারা শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যথাযথ নিয়ম পরিপালন করে অনুমোদন দেননি। সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা বদলের ক্ষেত্রে শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে বেনামি কোম্পানির নামে। এসব কোম্পানির নামে কিভাবে নিবন্ধন দেওয়া হলো সে প্রশ্ন তুলেছে কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে একটি পরিদর্শক দল কোম্পানিগুলোর ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পরিদর্শক দল ওই ঠিকানায় কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।

এসব কোম্পানির নামে শেয়ার হস্তান্তরের আগে যেমন কোনো নিয়ম-কানুন মানা হয়নি, তেমনি কোম্পানির পর্ষদ গঠনের ক্ষেত্রে অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিএসইসির সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা ছিল নীরব। কোম্পানি গঠনের ক্ষেত্রে আরজেএসসি যথাযথ ভূমিকা পালন করেনি। নিবন্ধন দেওয়ার পরও তারা এসব কোম্পানির কোনো তদারকি করেনি। তাদের কাছে কোম্পানিকে যেসব জবাবহিদিতা করতে হয় সেগুলো তারা করেনি। এ ব্যাপারে আরজেএসসি নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

তিন দফা মালিকানা বদলের ক্ষেত্রে প্রথম দফায় খ্যাতিমান লোকদের পরিচালক পদ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। পরে বেনামে নেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ওই সময়ে ভূমিকা রাখতে পারেনি। বিএসইসি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেনি।

একই সঙ্গে আরজেএসসি নিবন্ধন দেওয়ার ক্ষেত্রে যেমন নিয়ম-কানুন মানেনি। তেমনি নিবন্ধন দেওয়ার পর তারা কোম্পানির কার্যক্রমে কোনো তদারকি করেনি। অথচ প্রতিটি পর্যায়ে সব সংস্থার নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনের বিধান রয়েছে। তারা যে দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি বলে এর সম্পদ লুটপাটের সুযোগ হয়েছে।

সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালে কোম্পানিটি নিবন্ধিত হয়। ১৯৯৮ সালের মার্চে ব্যবসা শুরু করে। কোম্পানির মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার ৪০ দশমিক ৫৫ শতাংশ। প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ৪১ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ।

সূত্র জানায়, বিআইএফসির মোট আমানতের পরিমাণ ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৮০৮ কোটি টাকা। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি আর কোনো আমানত সংগ্রহ করতে পারেনি। মুনাফাসহ আমানতের পরিমাণ বেড়ে এখন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। পিকে হালদার গ্রুপ প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নিতে বেনামে কোম্পানি খুলে সেগুলোর নামে শেয়ার কিনে বিআইএফসির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

এসব কোম্পানির বেশিরভাগের ঠিকানা পুরানা পল্টনের ইস্টার্ন ট্রেড সেন্টারে ও কারওয়ান বাজারের ডিএইচ টাওয়ারে। বিআইএফসির মালিকানা যেসব কোম্পানির নামে ছিল সেগুলোর মধ্যে দুটি কোম্পানি ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের একই দিনে নিবন্ধিত হয়েছে।

বিআইএফসির অংশীদার ‘টিজ মার্ট ইনকরপোরেটেড’ নামে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এর পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ চেয়ে আদালতে আবেদন করলে বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর ওই কমিটি গঠনের আদেশ দেন। আদালত বলেছেন, ২০০২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনতে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এই কমিটির প্রধান করা হয় ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খানকে। পরে আদালত আরও দুজনকে কমিটিতে যুক্ত করেন।

মিথ্যা তথ্যে প্রস্তাবিত পিপলস ব্যাংক

মিথ্যা তথ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রাথমিক সম্মতিপত্র পেয়েছে পিপলস ব্যাংক। এরপর প্রায় দুবছর ধরে পরিচালক নিয়োগের নামে অর্থ লোপাটে চলছে নানামুখী তৎপরতা। এর নেপথ্যে রয়েছেন প্রস্তাবিত ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মার্কিন প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক আবুল কাশেম।

ইতোমধ্যেই ঋণের টাকা ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন হিসাবে দেখাতে গিয়ে বিএফআইইউর তদন্তে অভিযুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বেশ কয়েকজন পরিচালক। আবার অনিয়মের অভিযোগে দুই পরিচালককে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে বাদ দেওয়া হয়েছে।

যুগান্তরের অনুসন্ধান ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে প্রস্তাবিত ব্যাংকটির এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।

আরও জানা গেছে, প্রাথমিক সম্মতিপত্র পাওয়ার দুই বছর চলে গেলেও এখন পর্যন্ত মূলধন জমা দিতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। নানা অজুহাতে তিন দফা সময় বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনকভাবে নির্বিঘ্নে সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক-এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাগজপত্রে দেখা গেছে, তিন দফা সময় বাড়িয়েও পরিশোধিত মূলধনের অর্থ জমা করতে না পারায় প্রাথমিক সম্পত্তিপত্রও এখন বাতিলের শঙ্কায়। গত ৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের এক চিঠিতে বলা হয়েছে. ‘বিশেষ বিবেচনায় আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেষবারের মতো সময় বৃদ্ধি করা হলো। বর্ধিত সময়ের মধ্যে প্রযোজ্য শর্তাবলি পূরণ করে লাইসেন্স গ্রহণের আবেদনে ব্যর্থ হলে ইস্যুকৃত ‘লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই)’ চূড়ান্তভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বৃহস্পতিবার মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, এলওআইয়ের শর্ত পূরণ করার জন্য প্রস্তাবিত পিপলস ব্যাংক তিন মাস সময় চায়। বোর্ড তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সময় দিয়েছে। এ সময়ে তারা শর্ত পূরণ করতে না পারলে নিয়ম অনুযায়ী তাদের এলওআই বাতিল হয়ে যাবে।

মিথ্যা তথ্য দিয়ে সম্পত্তিপত্র নেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকটির আবেদনের নথিপত্রে কিছু গরমিল আছে। আমাদের নিজস্ব মেকানিজমে সবই বের হচ্ছে। বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে কেউ টাকা এনে তা মূলধন হিসাবে দেখাতে চাইলে সেটিও ধরা পড়বে।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত ব্যাংকটির যারা পরিচালক, তাদের অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা জমা নেই।’

সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারির পরিচালনা পর্ষদের সভায় বেঙ্গল কমার্শিয়াল, সিটিজেন ও পিপলস নামে নতুন তিনটি ব্যাংকের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে দুটি ব্যাংক বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করলেও অস্তিত্ব সংকটে পিপলস ব্যাংক।

গোড়ায় গলদ : ব্যাংকটির আবেদন নথিতে আবুল কাশেম নিজেকে ২৩৬ ইস্ট সেকেন্ড স্ট্রিট ব্রুকলীন, নিউইয়র্কের বাসিন্দা ও একজন ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচয় দেন। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম কাশেম কনট্রাকটিং ইনক। সেখানে তার রিয়েল এস্টেট ব্যবসা আছে বলেও দাবি করা হয়। ১৫ বছর ধরে সেখানে তিনি ব্যবসা করেন। ২০১৮ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত সেখানে তার ৫১ লাখ ২২ হাজার মিলিয়ন ডলারের সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয় আবেদনে।

এর মধ্যে ব্যাংকে নগদ ৬২ হাজার ১৫০ ডলার, লাইফ ইনস্যুরেন্স পলিসি ১১ হাজার ৩২২ ডলার, রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় বিনিয়োগ ২১ লাখ ৬২ হাজার ডলারসহ বিভিন্ন খাতের ৫১ লাখ ৩৯ হাজার ১৬ ডলারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেওয়া হয়। বিপরীতে সেখানে ব্যাংকে তার দেনা দেখানো হয় ৫ হাজার ১২২ ডলার।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রকৃতপক্ষে আমেরিকায় তার এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ নেই। তার এই সম্পদ বিবরণীর নথিপত্র মিথ্যা তথ্য দিয়ে তৈরি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়। এ কারণে লেটার অব ইনটেন্টের ৩ নম্বর শর্ত গত দুই বছরেও পূরণ করতে পারেননি আবুল কাশেম। ৩ নম্বর শর্তে বলা আছে, ব্যাংকের প্রস্তাবিত চেয়ারম্যান আবুল কাশেমের বাংলাদেশি নেটওয়ার্থের ৫৬ লাখ টাকা বাদে অবশিষ্ট প্রয়োজনীয় অর্থ যুক্তরাষ্ট্রে তার নেটওয়ার্থ হিসাবে প্রদর্শিত সম্পদ থেকে অর্জিত অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে হবে।

নিউইয়র্কের ‘পুরোনো বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বুধবার রাতে মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, আবুল কাশেমের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই শর্ত পূরণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ ব্যাংকে তিনি যে সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন তার বেশির ভাগই মিথ্যা। এখন নিউইয়র্কে তার ব্যবসা বলতে কিছুই নেই। রিয়েল এস্টেট ব্যবসা দূরের কথা, তার নতুন বিল্ডিং বানানোর কোনো লাইসেন্সও নেই। পুরোনো ভবন রেন্যুভেশনের একটি লাইসেন্স থাকলেও নেই কাজকর্ম। ব্রুকলিনে একটি বাড়ি আছে। বাড়িটি তার ও স্ত্রীর যৌথ নামে। বাড়ি কেনার বিপরীতে ব্যাংক লোনও আছে। তিনি এখন ‘বিগ ফিস’র পেছনে দৌড়াচ্ছেন। তার সঙ্গে কেউ যৌথ বিনিয়োগে গেলে নির্ঘাত প্রতারিত হবেন।

কে এই আবুল কাশেম : অনুসন্ধানে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আবুল কাশেমের বাড়ি সন্দ্বীপে। চট্টগ্রামের হালিশহরেও রয়েছে তার বাড়ি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাস করেন। সেখানে কার সার্ভিসিং ও পুরোনো বাড়ি সংস্কার কাজের ব্যবসা রয়েছে তার। পাশাপাশি তিনি নিজেকে নিউইয়র্ক আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে পরিচয় দেন।

সেই সুবাদে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রভাবশালী একজন মন্ত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। ওই মন্ত্রীর আশীর্বাদে ব্যাংকের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। প্রথম দফায় ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় দফার চেষ্টায় প্রাথমিক সম্মতিপত্র বাগিয়ে নেন। এরপর রাজধানীর অভিজাতপাড়া হিসাবে পরিচিত বনানীতে ব্যাংকের অফিস খুলে ঘুরতে থাকেন বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের দ্বারে দ্বারে। পরিচালক করার কথা বলে ফাঁদ পাতেন।

শুরুর দিকে এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত একটি বেসরকারি ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকিং ব্যবসা এখন আর তেমন লাভজনক নয়। তবে অনেক নব্যধনী ‘জাতে উঠতে’ ব্যাংকের পরিচালক হতে মুখিয়ে থাকেন। তাদের এখন পরিচালক করার চেষ্টা করছেন আবুল কাশেম। এমন ব্যবসায়ীদের কাছে টানতে পারলেই কেবল বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ব্যাংকটির কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

ফাঁদে পা দিয়েছেন যারা : সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে নতুন ব্যাংক করতে ৪০০ কোটি টাকা মূলধন দরকার। প্রাথমিক সম্মতিপত্র পাওয়ার পরই এই মূলধন সংগ্রহ করতে নানামুখী তৎপরতা শুরু করেন আবুল কাশেম। তার ফাঁদে পা দিয়ে উদ্যোক্তা হিসাবে যুক্ত হন মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আলিম, খান ব্রাদার্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফায়েল কবির খান, তমা কনস্ট্রাশনের পরিচালক মুকিতুর রহমান, কার সিলেকশনের কর্ণধার আসলাম সেরনিয়াবাত এবং জাকির হোসেন পাটোয়ারী, সামিহা আজিম, তাসলিমা ইসলামসহ বাংলাদেশি ও প্রবাসী বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী।

যদিও আবুল কাশেমের আর্থিক টানাটানি ও টালবাহানা টের পেয়ে এদের কয়েকজন এক পর্যায়ে সরে পড়েন। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পিপলস ব্যাংকে ১০ কোটি টাকা মূলধন বিনিয়োগ করেছিলেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা শহীদুল আহসান। তার মালিকানাধীন এজি অ্যাগ্রোর প্রতিনিধি হিসাবে মেয়ে রাহনুমা আহসানকে পরিচালক করতে চেয়েছিলেন আবুল কাশেম। নিয়ম অনুযায়ী, কর পরিশোধ করা আয়কেই শুধু মূলধন হিসাবে দেখানো যায়। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে এই অনিয়ম চিহ্নিত হওয়ায় তাকে বাদ দেওয়া হয়।

এ ব্যাপারে গত ৭ অক্টোবর শহিদুল আহসান মোবাইল ফোনে যুগান্তরকে বলেন, এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি এখন আর নেই। তার বিনিয়োগ করা টাকাও তুলে নিয়েছেন। আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। একইদিন বিকালে খান ব্রাদার্স গ্রুপের এমডি তোফায়েল কবির খান ফোনে যুগান্তরকে বলেন, শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়া পরিচালকদের তালিকায় তার নাম ছিল। কিন্তু নানা কারণে মান-ইজ্জত রক্ষায় তিনি এখন আর পিপলস ব্যাংকের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নেই।

এছাড়া প্রস্তাবিত ব্যাংকটির পরিচালক কার সিলেকশনের কর্ণধার আসলাম সেরনিয়াবাত পিপলস ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ব্যাংকটির পরিচালক হতে গিয়ে এখন মানসম্মান রক্ষা করাই দায়। এক-দুজন পরিচালকের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বাদ দিয়েছে বলে শুনেছি। আমি গত কয়েক বছর সর্বোচ্চ করদাতাদের একজন হয়েও আমাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেকেই ফোন করে জানতে চান আমাদের ব্যাংক কবে রান করবে। তাদের কোনো জবাব দিতে পারি না। ব্যাংকটির উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান কাশেম সাহেব জানেন তিনি কীভাবে কী করছেন। মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রাথমিক সম্মতিপত্র পাওয়ার বিষয়টি জানেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে আসলাম সেরনিয়াবাত বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই। তবে কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকার অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।’

পরিচালকের তালিকায় নাম থাকা মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম ফোনে যুগান্তরকে বলেন, ‘ব্যাংকটির উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান আবুল কাশেম সাহেবকে আমি চিনতাম না। পিপলস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে তাকে চিনেছি। এখন আর এর সঙ্গে আমি নেই। আমি শুধু বলব, এলওআই পাওয়ার পরও কোনো ব্যাংক যদি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করতে না পারে তাহলে তা দুঃখজনক।’

মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকের সম্মতিপত্র নেওয়া ও পরিচালক নিয়োগ নিয়ে নানামুখী তৎপরতা সম্পর্কে জানতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে আবুল কাশেমের মোবাইল ফোনে কল করে সময় চাইলে করোনা পরিস্থিতির কারণে তিনি কোনো ভিজিটরের সঙ্গে দেখা করেন না বলে জানান। তখন এ প্রতিবেদক ফোনেই তার বক্তব্য জানতে চাইলে মিটিংয়ের অজুহাতে এড়িয়ে যান। কখন ফোন করলে কথা বলা যাবে-জানতে চাইলে এক সপ্তাহ পর কল করতে বলেন।

এক সপ্তাহ পর ৭ অক্টোবর দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ওইদিন (৭ অক্টোবর) তার হোয়াটসঅ্যাপে নির্ধারিত তিনটি প্রশ্ন লিখে বক্তব্য জানতে চেয়ে বার্তা পাঠানো হয়। বার্তাটি তিনি দেখেছেন-তা নিশ্চিত হওয়া গেছে এই প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনে ওঠা নির্ধারিত সংকেতের মাধ্যমে। কিন্তু বুধবার রাত আটটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।

এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে বনানী ডিওএইচএসে প্রস্তাবিত ব্যাংকটির অফিসে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। অফিসের স্টাফ পরিচয়ে মোমরেজ নামের এক যুবক জানান, ‘স্যার (আবুল কাশেম) অফিসে আসেননি। বাসায় আছেন।’ গুলশান ১০৯ নম্বর রোডের বাসায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়। কলিংবেল বাজালে ভেতর থেকে এ প্রতিবেদকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর দরজা না খুলেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আবুল কাশেম বলেন, ‘আপনি আমার বাসায় এলেন কীভাবে। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলব না।’

এরপরও দরজার বাইরে থেকেই তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো প্রশ্নের ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক নেতা নই যে, আমার বক্তব্য কোনো নিউজ হতে পারে। সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব না দিয়ে উলটো এ প্রতিবেদক কেন বাসায় তার বক্তব্য আনতে গেলেন-তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিবেদককে চলে যেতে বলেন আবুল কাশেম।

কুমিল্লার ঘটনায় জড়িত কেউ ছাড় পাবে না: ওবায়দুল কাদের

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, কুমিল্লার ঘটনায় যারাই জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে, কেউ ছাড় পাবে না।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর কেআইবি প্রাঙ্গণে শারদীয় দুর্গা পূজার মহাষ্টমী’র শুভেচ্ছা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।

কুমিল্লার ঘটনা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কাজ উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা হিন্দুদের মন্দিরে হামলা চালায় তারা দলীয় পরিচয়ের হলেও ছাড় দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি যারা নষ্ট করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, সারাদেশে এক উৎসব মুখর পরিবেশে সার্বজনীন দুর্গাপূজা দুর্গা উৎসবে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, সারাদেশে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার পূজামণ্ডপে উৎসব পালিত হচ্ছে, তাই একটি কুচক্রী মহলের গাত্রদাহ হচ্ছে।

ওবায়দুল কাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, কোনো দুর্বৃত্ত যাতে মন্দিরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা হামলা করতে না পারে সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।

পণ্যের বেঁধে দেওয়া দাম মানে না ব্যবসায়ীরা

বেসামাল নিত্যপণ্যের বাজার। মজুত ও সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকার পরও চাল, ডাল, ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজসহ সব ধরনের পণ্যের দামে আগুন। আয়ের সঙ্গে ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে অধিকাংশের।

এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু তা বরাবরই কাগজে-কলমে আটকে ছিল। ব্যবসায়ীরা তা বাস্তবায়ন করেনি। তারা বেশি দামেই পণ্য বিক্রি করেছে। অথচ ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা বৈঠকে সরকারকে আশ্বাস দিয়ে এসেছে। এরপরও তারা কথা রাখেনি।

মাঠ পর্যায়ে সরকার বেঁধে দেওয়া দাম নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। ফলে বাজারে পণ্য কিনতে ভোক্তার বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে।

এদিকে চিনি, পেঁয়াজ ও ভোজ্যতেলের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার হচ্ছে এমন খবরেও খুচরা বাজারে কোনো প্রভাব পড়েনি। দোকানে কোনো পণ্যের দাম কমনি। খুচরা ব্যবসায়ী ও ডিলারদের মতে, আমদানি ব্যয় ও প্রচলিত মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় থাকতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে না পারলে শুল্ক প্রত্যাহার হলে শুধু লাভবান হবেন মিলমালিক ও উৎপাদনকারীরা।

অভিযোগ রয়েছে, করোনার লোকসান পুষিয়ে নিচ্ছে বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে পণ্যের দাম কমছে না। এ ধরনের ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েকবার বৈঠক করে ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে সরকার। প্রতিবারাই ব্যবসায়ীরা সরকারকে আশ্বস্ত করেন দাম বাড়বে না। তারা হাঁকডাক দিয়ে ভোক্তার উদ্দেশে বলেন, সরকারের নির্ধারিত দামেই তেল বিক্রি হবে। কিন্তু বাজারে চিত্র পালটায় না। ব্যবসায়ীরা যতবার বলেছেন দাম বাড়বে না, ঠিক ততবার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৪-৫ টাকা বেশিতে ভোজ্যতেল বিক্রি করেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের পর মার্চ মাসেও দাম নির্ধারণ করে। সে সময়ও চিত্র ছিল একই।

সর্বশেষ ৫ সেপ্টেম্বর বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভোজ্যতেলের দাম ঠিক করে দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাণিজ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক থেকে ব্যবসায়ীরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে দেশের বাজারে পরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য জানানো হয়।

সে অনুযায়ী খোলা এক লিটার সয়াবিন তেলে সর্বোচ্চ খুচরা দাম নির্ধারণ হয় ১২৯ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতিলিটার ১৫৩ টাকা। কিন্তু বাজারে প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৩৫-১৪০ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকা লিটার।

গত নয় সেপ্টেম্বর ভোক্তার স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে চিনির দাম নতুন করে নির্ধারণ করে দেয় সরকার। আগস্টের শুরু থেকে দাম বাড়তে থাকায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে দাম বেঁধে দেওয়া হয়। এতে সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, দেশবন্ধু গ্রুপসহ কয়েকটি কোম্পানির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেদিন খোলাবাজারে প্রতি কেজি চিনি ৭৪ টাকা এবং প্যাকেট ৭৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অথচ খোলা চিনি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ এবং প্যাকেট ৮৫ টাকা।

জানতে চাইলে ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন সময় সরকারের পক্ষ থেকে পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে কার্যকর হয়নি। যে বা যারা কার্যকর করবে তারা ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে ভোক্তারা সুফল পায়নি। তাই মনিটরিং সংস্থার আদেশ কার্যকর করতে কঠোর হতে হবে।

রমজান মাসেও পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখতে মূল্য নির্ধারণ করে দেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। সে সময় খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ছোলার দাম রাখা হয় ৬৩-৬৭ টাকা, পেঁয়াজ ৪০ টাকা, ভোজ্যতেলের এক লিটারের বোতল ১৩৯ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতল ৬৬০ টাকা, মোটা দানার মসুর ডাল ৬৭-৬৯ টাকা এবং চিনির খুচরা মূল্য কেজি প্রতি ৬৭-৬৮ টাকায় ধরা হয়। কিন্তু সে সময়ও সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে পণ্য বিক্রি করেনি বিক্রেতারা।

গত বছর সেপ্টেম্বরে সরকার ৫০ কেজি ওজনের ভালো মানের এক বস্তা মিনিকেট চালের দাম মিল গেটে ২৫৭৫ টাকা এবং মাঝারি মানের চালের দাম ২১৫০ থেকে ২২৫০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও পরে তা মানা হয়নি। একইভাবে আলুর দাম বেড়ে গেলে পরপর দুবার আলুর দর পুনর্নির্ধারণ করে প্রতি কেজি ৩৫ টাকা বেঁধে দেয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। কিন্তু সেই নির্ধারিত দরও মানা হয়নি। তখন প্রতি কেজি আলুর দর ৬০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, শুধু এবারই নয়, এর আগেও কখনো সরকার নির্ধারিত কোনো ভোগ্যপণ্যের দরই ব্যবসায়ীরা মানেনি। তারা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে পণ্য বিক্রি করেছে। অথচ সেই পণ্যের দাম নির্ধারণের সময় তারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। গত বছর করোনা মহামারি ও চার দফা বন্যার কারণে যখন চালের বাজার অস্থির, তখন মিল মালিকদের পাশাপাশি পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী বৈঠক করে চালের দর নির্ধারণ করে দেন। কিন্তু মিল পর্যায় থেকে দাম মানা হয়নি। যে কারণে বেশি দরে চাল ভোক্তাকে কিনে খেতে হয়েছে।

কাওরান বাজারের নিত্যপণ্য কিনতে আসা মো. মাসুম বলেন, দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার সংশ্লিষ্টরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রেখে বৈঠক করে। নতুন দাম নির্ধারণ করে। সেখানে দাম বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয়। তারপরও ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামের আরও ৫-১০ টাকা বেশিতে বিক্রি করে। তিনি বলেন, সরকারনির্ধারিত দর ব্যবসায়ীরা না মানলে তা কেন নির্ধারণ করা হয়? যারা নির্ধারিত দর মানছে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে না। যারা দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে তারাই কিন্তু সরকারসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করছে। তারা তো চিহ্নিত, তারপরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?

জানতে চাইলে বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, যতবার পণ্যের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ঠিক তখন থেকেই দাম কার্যকর করতে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সারা দেশের বাজার তদারকি করা হয়েছে। এখনো করা হচ্ছে। কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে দেরি হয়। কারণ যে খুচরা বিক্রেতা পাইকারি বা মোকাম থেকে বেশি দামে পণ্য কিনে দোকানে মজুত করেছে সেই পণ্য বেশি দরে বিক্রি করেছে। লস দিয়ে বিক্রি করেনি। যে কারণে দাম কমতে একটু দেরি হয়েছে। তবে সরকারের বেঁধে দেওয়া দর কার্যকরে অধিদপ্তরের মনিটরিং সদস্যরা কাজ করেছে। এখনো করছে। এছাড়া অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে তদারকি করা হচ্ছে। এবার কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। কঠোর শাস্তির আওতায় এনে বাজার মূল্য পরিস্থিতি ঠিক করা হবে।

বুধবার সরেজমিন দেখা গেছে, বাজারে খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে কেজি ৭৫ থেকে ৮০ টাকায়। প্যাকেট চিনির মূল্য আরও বেশি। আমদানিকৃত পেঁয়াজ ৬৫ টাকা কেজি, মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৩০ টাকা পর্যন্ত। ৫ লিটারের সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ৭শ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে চিনির মূল্য বেড়েছে ২৭ শতাংশ।

খুচরা ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি বোতলজাত তেল, প্যাকেট চিনি ও খোলা চিনির লাভ কমিয়ে দিয়েছে। কাওরান বাজারের এক খুচরা বিক্রেতা অভিযোগ করে বলেন, কোম্পানির লোকজনকে বলেছি আপনারা গায়ের মূল্য বৃদ্ধি করেছেন কিন্তু আমাদের লাভ বৃদ্ধি করেননি। জবাবে কোম্পানির লোকজন বলেছে, সরকার ভ্যাট ও কর বাড়িয়েছে। এজন্য দাম বাড়ানো হয়েছে। অনেকে সানফ্লাওয়ার ভোজ্যতেল খেত। দাম বৃদ্ধির কারণে সেটি বাদ দিয়ে সয়াবিন খাচ্ছে।

ডিলাররা জানান, শুল্ক প্রত্যাহার করলে এর সুফল পাবে উৎপাদনকারী। তারা মিলগেটে দাম না কমালে শুল্ক প্রত্যাহার করে লাভ হবে না। তারা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়তে থাকলেও শুল্ক কমিয়ে লাভ হবে না।

 

কুমিল্লার ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

কুমিল্লার ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বুধবার রাতে একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘কুমিল্লার ঘটনা…. আমার মনে হয় কেউ ‘সাবোটেজ’ করে করেছে কিনা, এটা দেখার বিষয়।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এভাবে ঘটনা ঘটানোর সাহস ….বিশ্বাস হচ্ছে না। তারপরেও দেখা যাক… সবকিছু এখন কন্ট্রোল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। উদ্ধার করব প্রকৃত ঘটনা কী?’

তিনি বলেন, ‘প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’

বিশ্ববাজারে কদর বাড়ছে ইফা’র হালাল সার্টিফিকেটের

আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভোক্তা পর্যায়ে সাধারণত পণ্য হালাল হারামের প্রশ্ন না উঠলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।

মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মুসলিমরা হালাল হারাম বিষয়ে অনেক সচেতন। যে কোনো পণ্য কেনার আগে তা হালাল কিনা যাচাই করে নেন তারা।

এ প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে হালাল সার্টিফিকেটের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। প্রায় প্রতিটি দেশেই একটি অথরিটি রয়েছে, যারা হালাল সার্টিফিকেট নিয়ে কাজ করেন। তাদের স্বীকৃতির ওপর নির্ভর করে বিশ্ববাজারে পণ্যটি হালাল অথবা হারাম হিসাবে বিবেচ্য হয়। এদিক থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল লোগো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ থেকে যে কটি কোম্পানি তাদের প্রস্তুতকৃত পণ্য বহির্বিশ্বে রপ্তানি করে থাকেন, তাদের অধিকাংশই পণ্যের গায়ে হালাল লোগো ব্যবহার করতে বাধ্য। ২০০৭ সাল থেকে যাচাই-বাছাই করে রপ্তানিকৃত পণ্যকে হালাল সার্টিফিকেট দিচ্ছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক ড. আবু সালেহ পাটোয়ারী বলেন, এ সার্টিফিকেট গ্রহণ করে ১৪০টি কোম্পানি তাদের উৎপাদিত প্রায় ১ হাজার পণ্যের অনুক‚লে হালাল সনদ গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ৫০টি কোম্পানি প্রায় ৩৫০ পণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের বিপুল চাহিদা থাকায় আন্তর্জাতিক বাজার দখলে প্রসিদ্ধ কোম্পানিগুলো ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল লোগো ব্যবহার করছে।

এর ফলে দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী পণ্যের গায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল লোগো দেখে নিশ্চিন্তে ক্রয় করতে পারছেন। পাশাপাশি বহির্বিশ্বে প্রস্তুতকৃত পণ্য রপ্তানিতে যে বাধা ছিল, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লোগো ব্যবহারের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সেই বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে না রপ্তানিকারকদের। আমাদের লোগো বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্য।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র বলছে, এ কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর শত কোটি টাকার দেশি পণ্য রপ্তানি হচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। বিশেষত বাংলাদেশে উৎপাদিত ওষুধ মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকায়ও রপ্তানি হচ্ছে।

এর মাঝে যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর সাতটি দেশে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ তাদের উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করছে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল লোগো ব্যবহার করে।

প্রাণ, ইউনিভার্সাল ও বনফুল ইউরোপ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্তত ৬টি দেশে তাদের পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে হালাল সার্টিফিকেটের মাধ্যমে। প্রসিদ্ধ ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল তাদের উৎপাদিত ওষুধ রপ্তানি করছে থাইল্যান্ড, আমেরিকা, জর্জিয়া এবং ইউক্রেনে।

অর্থনীতিবিদদের বক্তব্য অনুসারে, সারা বিশ্বে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্যের বাণিজ্য হয়। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় হালাল পণ্যের বাজার অত্যন্ত প্রশস্ত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব আরোপ করলে শত কোটি টাকার বাণিজ্য সহস্র কোটিতে পৌঁছতে কালক্ষেপণ করবে না।

 

ড. আবু সালেহ পাটোয়ারী বলেন, যেসব কোম্পানি তাদের উৎপাদিত পণ্য হালাল হিসাবে স্বীকৃতি নিতে চায়, তারা ইসলামিক ফাউন্ডেশন বরাবর আবেদন করার পর আমরা একটি এক্সপার্ট টিম নিয়ে সেই কোম্পানি ভিজিট করতে যাই।

সেই টিমে হালাল-হারাম বিষয়ে এনালাইসিস করার জন্য ইসলামিক স্কলার, পণ্য সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তি যেমন, পণ্যটি যদি ওষুধ হয় তাহলে, আমাদের সঙ্গে একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ থাকেন। এ মেডিসিনের যাবতীয় উপকরণ তিনি বিজ্ঞ আলেমদের সামনে উপস্থাপন করার পর তারা সিদ্ধান্ত নেন-পণ্যটিকে হালাল হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় কি-না।

‘অনুরূপভাবে প্রতিটি পণ্য আমরা সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দ্বারা যাচাই করে হালাল হিসাবে স্বীকৃতি দেই। বিষয়টি খুব বেশি জটিল হলে আমরা সংশ্লিষ্ট বড় কোনো ল্যাবে পাঠিয়ে তারপর সিদ্ধান্ত জানাই। সে দিক থেকে আমি বলব ইসলামিক ফাউন্ডেশনের হালাল বিষয়ক সার্টিফিকেট অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং সারা বিশ্বে সমাদৃত।’

এ বিষয়ে কাতার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের ইমাম মাওলানা ইউসুফ নূর বলেন, মুসলিমবিশ্ব, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই হালাল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা। বাংলাদেশে উৎপাদিত কিছু পণ্য এখন মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশে পেয়েছি। তবে এর পরিমাণ খুবই সীমিত। প্রবাসীদের মাঝে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা রয়েছে শুধু এ অংশটুকুও যদি দেশীয় পণ্যের মাধ্যমে পূরণ করা যেত, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্য আরও বিস্তৃত হতো।

প্রবাসী আলেম হিসাবে আমরা মনে করি, বাংলাদেশ সরকারের এ বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে হালাল সার্টিফিকেট প্রদান করা হলে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হবে। ধর্মীয় বিষয়গুলো ধর্মীয় ব্যক্তিদের নেতৃত্বে হলে সংশয়ের অবকাশ থাকে না।

আলিয়া মাদ্রাসার স্বায়ত্বশাসন আদায় ও এটিএম হেমায়েত উদ্দীন (রহ.)

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে নিজের দক্ষতা, সচ্ছতা, দূরদর্শীতা, আপসহীনতা, অপ্রতিরোধ্য পথচলা ও জনদরদী রাজনীতির জন্য যে মহান ব্যক্তিরা আজীবন গণমানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন, মিডিয়া কর্মী, বন্ধুপ্রতীম ও ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলের লোকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন অধ্যাপক মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দীন রহ. ছিলেন তাদের অন্যতম।

ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার তিন সেশনের (১৯৮১-৮৩) কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার উদ্যোগে আলিয়া মাদরাসা ছাত্রদের ১৭ দফা দাবি আদায়ে জাতীয় সংসদ ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।

দূরদর্শী ও অপ্রতিরোধ্য অন্দোলনের মাধ্যমে অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের স্বায়ত্বশাসনের দাবি আদায় করেন। পরবর্তীতে স্বায়ত্বশাসিত মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান জনাব বাকিবিল্লাহ খানের উপস্থিতিতে মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দীনকে সংবর্ধিত করা হয়। এটি তার সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে অন্যতম বড় সফলতা।

বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জে বাবা আলহাজ মাওলানা আব্দুল আলীর প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার হাতেখড়ি তাঁর। তারপর খুলনা শিরোমনি হাফেজিয়া মাদরাসায় পবিত্র কুরআন হেফজ করেন তিনি। পরে ঢাকা আলিয়া থেকে কামিল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজে এমএ সম্পন্ন করেন তিনি।

আপাদমস্তক এই রাজনীতিবিদ অধ্যাপনা ও সমাজমুখী কাজে ছিলেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। ফার্মগেটের পশ্চিম রাজাবাজার জামে মসজিদে ৪২ বছর ধরে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়াও তিনি মালিবাগ আবুজর গিফারী কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন এবং আমৃত্যু রামপুরা কামরুন্নেসা ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপকের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

১৯৮৭ সালে পশ্চিম রাজাবাজার হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ঢাকার মালিবাগে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী আবুজর গিফারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। কিছুদিন তার পিতার প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি রামপুরা একরামুন্নেছা ডিগ্রি কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন।

মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন পশ্চিম রাজাবাজার হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও মাতুয়াইল আল্লাহ কারীম মাদ্রাসাসহ বহু মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।

সদা হাস্যোজ্জ্বল, সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটি যখন রাজপথে মুষ্টিবদ্ধ হাতে শ্লোগান তুলতেন তখন যে কারো তনু মনে এক ধরনের রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যেত। নিজেকে ধরে রাখতে পারতেন না। অঝোর ধরায় অগ্নিঝরা ভাষণের জন্য তিনি ছিলেন সুপরিচিত। গগনবিদারী বক্তব্যে মুহূর্তের মধ্যেই আলোড়ন তুলতো সর্বত্র। তার পুরো দেহ ও হৃদয়জুড়ে প্রতিবাদের স্রোতধারা বয়ে যেতো। তার শরীরের প্রতিটি রক্তকণায় মিশে ছিল দেশপ্রেম, ইসলাম আর কল্যাণরাষ্ট্র বিনির্মাণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। নির্মল আদর্শের অকুতোভয় এক সৈনিক ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির পথিকৃৎ হাফেজ্জী হুজুর রহমাতুল্লাহর সঙ্গের ইনসাফপূর্ণ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন।

খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে থেকেই হাফেজ্জী হুজুরের রহ.-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল খুবই মধুর। হাফেজ্জী হুজুরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ঝাপিয়ে পড়েন সর্বস্ব দিয়ে। খেলাফতের স্বপ্ন পূরণে ত্যাগ আর কুরবানির নযরানা পেশ করেন। হাফিজ্জী হুজুরের মৃত্যুর পর হাফিজ্জী হুজুরের শিষ্য মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম (পীর সাহেব চরমোনাই রহ.) এর নেতৃত্বে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন জনদরদী সংগ্রামী নেতা মাও. এটি এম হেমায়েত উদ্দীন রহ.।

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই রহ.)এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।

১৯৮৭ সালে ১৩ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হওয়া সেই রাজনৈতিক শক্তিটি আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম ইসলামী শক্তি হিসেবে আবিভূত হয়েছে। তিনি ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতির সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে ছিলেন, মনে হতো তার জীবনের লক্ষ্য, নেশা এবং পেশাই ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। পীর সাহেব চরমোনাইর প্রতি তার আনুগত্য, সংগঠনপ্রীতি, ইসলাম দেশ ও মানবতার প্রতি দরদ ছিল অতুলনীয়।

অধ্যাপক মাও. এটিএম হেমায়েত উদ্দিন রহ. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে সর্বশেষ অবিভক্ত ঢাকা মহানগরীর দীর্ঘদিনের লড়াকু সভাপতি ও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ ও ৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের অন্যতম শরীক দল পীর সাহেব চরমোনাইর নেতৃত্বাধীন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পক্ষ্য মিনার প্রতিকে বাগেরহাট-৪ আসন থেকে নির্বাচন করেন।

২০০১ সালে ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বাগেরহাট ৩-৪ আসনে নির্বাচন করেন। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট ছিল ২০০২ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের হয়ে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবস্থান। সেই নির্বাচনে সাদেক হোসাইন খোকার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ঢাকাবাসীসহ দেশবাসিকে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

পীর সাহেব চরমোনাই আহুত ইসলাম, দেশ ও মানবতার পক্ষের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে প্রথম সারির এক বীরের নাম এটিএম হেমায়েত উদ্দীন। আন্দোলন, সংগ্রাম, মিছিল মিটিংয়ে পুলিশের টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে পল্টনের রাজপথে সর্বদা গর্জে ওঠতেন বীরদর্পে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংগ্রামী আমির, পীর সাহেব চরমেনাই রহ. এর ডানহাত হয়ে ইসলামী রাজনীতিতে জীবন বিলিয়েছেন লাভ লোকসানের হিসেব মিলানো ছাড়াই। বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদ করে জেল খেটেছেন দীর্ঘ সময়। ভারতের ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধ বিরোধী আন্দোলন, বাবরি মসজিদ রক্ষার আন্দোলন, মায়ানমার, ফিলিস্তন, কাশ্মীর ও ওইঘুরে মুসলিম নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন,ফতোয়া বিরোধী আন্দোলন সহ এমন কোন আন্দোলন সংগ্রাম নেই যেখানে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। রাজপথ থেকে যতবার গ্রেফতার হয়েছেন ততবারই দ্বিগুণ আগ্রহ নিয়ে ফিরে এসেছেন আবারও রাজপথে। রাজনীতিতে ভয় বলে কোন শব্দ ছিল না তার জীবনে। বহুবার মিছিলের ব্যানার ছিনেয়ে এনেছেন পুলিশের হাত থেকে।

ইসলাম, দেশ ও মানবতার অতন্দ্র প্রহরী এই মহান ব্যক্তি দীর্ঘদিন ফুসফুসে আক্রান্ত থেকে ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর মহান প্রভূর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন। আল্লাহ সুবহানুহু তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন।

লেখক: নূরুল বশর আজিজী

নির্বাহী সম্পাদক, প্রেজেন্ট নিউজ