দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশকে দুর্যোগসহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সে লক্ষ্যে সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করছে। এতে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।
সোমবার বিকালে যুগান্তর সভাকক্ষে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০২১ এবং সিপিপির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। গোলটেবিল বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, গণ উন্নয়ন কেন্দ্র এবং যুগান্তর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ গোলটেবিলে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন সাংবাদিক কেরামত উল্লাহ বিপ্লব। এবারের আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো-‘দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে, কাজ করি একসাথে।’
ডা. এনামুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিশন-২০২১ এবং ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ঘোষণা করেছেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এক সময় দুর্যোগের দুর্নামমুক্ত হবে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক পরিসরেও শক্তিশালী ভূমিকা রাখছেন। জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্বন-নিঃসরণ কমানোর দাবি জানাচ্ছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন বিশ্বনেতা, একজন বলিষ্ঠ নেতা বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার চারপাশে অনেক দক্ষ লোক তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন কার্যকর সমন্বয়। সে কাজটি আমরা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে করার চেষ্টা করছি। গৃহীত প্রকল্পগুলো সবাইকে নিয়ে বাস্তবায়ন করা হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-তে উপকূল এবং বন্যাপ্রবণ কয়েকটি এলাকাকে হট স্পট হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিটি হট স্পটের বাজেট ধরা হয়েছে ৩৭ বিলিয়ন ডলার। প্রতি বছর বন্যা ব্যবস্থাপনা ও বাঁধ ব্যবস্থাপনায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার করে খরচ করা হবে। এখন অর্থ সংস্থানের চেষ্টা চলছে। সেটা হলে এতদিনের দুঃখের নিরসন করা সম্ভব হবে। চীনের হোয়াংহো নদীর মডেলে নদীগুলোর উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে এ কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শুভেচ্ছা বক্তৃতায় যুগান্তরের সম্পাদক এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে দুর্যোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জন করা জরুরি। বাংলাদেশ দুর্যোগসহনশীলতায় ইতোমধ্যে অনেক উন্নতি করেছে। এটা চলমান প্রক্রিয়া। সব সময় দুর্যোগ প্রতিরোধের বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। দুর্যোগবিষয়ক আলোচনায় পাঠকরা উপকৃত হন। এজন্য এ ধরনের আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন বলেন, বঙ্গবন্ধুর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের বিষয়ে টেকসই চিন্তা করেছেন। উত্তরসূরি হিসাবে তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর দর্শন অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছেন। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর মতো দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস করতে বলিষ্ঠভাবে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে সমস্যা তুলে ধরে সমাধানের পরামর্শ দিচ্ছেন। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মুখপাত্র হিসেবে গ্রহণ করেছে।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস করতে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা দাবি করছেন, তারা একসঙ্গে কাজ করছেন। বাস্তবে সেটা লক্ষ করা যাচ্ছে না। দুর্যোগসহনশীল দেশ গড়তে কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। তাহলে বাংলাদেশকে দুর্যোগসহনশীল দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যখন বৃষ্টির প্রয়োজন তখন হচ্ছে না, অন্য সময় বৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে ফসল উৎপাদন কম হচ্ছে। দেশের বরিশাল অঞ্চলে গত দুই বছর ধরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, যেটা ইতোপূর্বে কখনো হয়নি। রংপুরে গত বছর অল্প সময়ে ৪৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় এমন হলে একতলা পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম নাজেম বলেন, আমরা গবেষণায় দেখেছি ঢাকায় আগত ২১ ভাগ মানুষ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে এসেছে। নদীভাঙন নীরব ঘাতকের ভূমিকা পালন করছে। নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ স্বাভাবিক হতে ৩০ থেকে ৪০ বছর সময় লেগে যায়। এভাবে ক্ষতিগ্রস্তরা গ্রামে কিছুটা সুবিধা পেলেও শহরাঞ্চলে কোনো সুবিধা পান না।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দুর্যোগসহনশীল দেশ গড়তে হলে দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এক্ষেত্রে বিস্তর ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই অবকাঠামো গড়ে উঠছে। মানহীন অবকাঠামো উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান আবদুস সালাম বলেন, দুর্যোগ আঘাত হানার পর ত্রাণ কার্যক্রম না চালিয়ে দুর্যোগের আগেই ভুক্তভোগীদের কাছে সাহায্য পৌঁছানো যায় কিনা সেটা ভেবে দেখতে পারে সরকার।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন যুগান্তরের উপসম্পাদক এহসানুল হক, প্রধান প্রতিবেদক মাসুদ করিম, সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার আবুল খায়ের চৌধুরী, সিপিপি পরিচালক আহমেদুল হক, অক্সফামের কান্ট্রি ডিরেক্টর এনামুল মাজিদ খান, ডব্লিউএফপির প্রতিনিধি মো. ইকবাল, গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের সমন্বয়ক আফতাব হোসেন ও মিজানুর রহমান, গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রোগ্রাম ম্যানেজার (মানবসম্পদ) অভিজিৎ রায়, অক্সফামের প্রতিনিধি ফ্রেডরিক শুভ্র নাথ, গণ উন্নয়ন কেন্দ্রের অফিসার ইরফান মণ্ডল প্রমুখ।


