গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা তাঁদের বক্তব্য শেষ করেন ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে। এ স্লোগানটি ঐতিহাসিকভাবে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকায় এটি নতুন দলের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ: স্লোগানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব ২০২২ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯২১ সালে মাওলানা হাসরাত মোহানি প্রথমবারের মতো ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ (বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক) স্লোগানটি ব্যবহার করেন। এটি পরবর্তীতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বিপ্লবী নেতা ভগত সিং-এর কণ্ঠেও শোনা যায়।
হাসরাত মোহানি ছিলেন একজন উর্দু কবি, শ্রমিক নেতা ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তিনি এ স্লোগানটি ব্যবহার করেন, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন বিপ্লবী ও কমিউনিস্ট আন্দোলনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯২৯ সালে আদালতে দেওয়া এক জবানবন্দিতে ভগত সিং বলেন,
“ইনকিলাব বা বিপ্লব বোমা বা পিস্তলের সংস্কৃতি নয়। আমাদের বিপ্লবের অর্থ হলো প্রকাশ্য অন্যায়ের ভিত্তিতে দাঁড়ানো বর্তমান পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া।”
এনসিপির অবস্থান ও স্লোগানের ব্যবহার
জাতীয় নাগরিক পার্টির আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে এই স্লোগান ব্যবহৃত হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এটি কি দলের আনুষ্ঠানিক স্লোগান? দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন,
“এটি আমাদের দলীয় স্লোগান নয়। যেহেতু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় এ স্লোগানটি জনপ্রিয় হয়েছিল, তাই আমরা এখনো কিছু কর্মসূচিতে এটি ব্যবহার করছি। আমাদের দলীয় স্লোগান ও মূলনীতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।”
‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র’ (সেকেন্ড রিপাবলিক) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছে। তাঁদের মতে, ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করা এবং গণতান্ত্রিক চরিত্র সংরক্ষণ করাই তাঁদের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর ঘোষণা দেন। যদিও আহ্বায়ক কমিটিতে ১৭১ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তবে দলটির আনুষ্ঠানিক আদর্শ ও কর্মসূচি এখনো সম্পূর্ণ নির্ধারিত হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এনসিপি ও স্লোগানের তাৎপর্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, এই স্লোগান দেওয়া মানেই এনসিপি কমিউনিস্ট ভাবাদর্শ গ্রহণ করেছে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। তিনি বলেন,
“বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের পরিচিতি প্রকাশে বিভিন্ন প্রতীক ও স্লোগান ব্যবহার করে। জাসদ একসময় ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ স্লোগান দিত, বিএনপি ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ স্লোগান দেয়। এনসিপি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ দিচ্ছে, সেটিও তাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তবে দলটির আনুষ্ঠানিক স্লোগান ও মূলনীতি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটির ব্যবহার আপাতত ঐতিহাসিক ও আন্দোলনকালীন জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় ঘটেছে বলে নেতারা দাবি করছেন। তবে ভবিষ্যতে এটি তাদের দলীয় পরিচয়ের অংশ হবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।


