জমি উদ্ধারে ১৮ বছর ধরে হয়রানির শিকার ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুণ বসাক

0
218

অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান পদার্থবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক তিনি।

অভিযোগ উঠেছে, ৮২ বছর বয়সি খ্যাতিমান এই শিক্ষাবিদের সম্পত্তি দখল করে বিগত ১৮ বছর ধরে হয়রানি করছেন তার প্রতিবেশী। সেই প্রতিবেশী অধ্যাপক বসাকের সম্পত্তি দখল করে রেখেছেন। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জিতলেও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সেই জমিকে তিনি দখলমুক্ত করতে পারছেন না। প্রতিবেশী কোনোভাবেই দখলে নেওয়া জমি ছাড়ছেন না। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এসব যন্ত্রণায় তিনি মানসিক পীড়া ও অনিরাপদ বোধ করছেন।

অভিযোগে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর সাগরপাড়া এলাকায় অধ্যাপক বসাকের নিবাস। বাড়ি ভিটার জমিটি বসাকের স্ত্রী দেবিকা বসাকের নামে ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরে স্ত্রী দেবিকা বসাকের মৃত্যুর পর নিঃসন্তান বসাকই প্রাচীন এ বাড়িটির মালিক হন।

অরুণ কুমার বসাক জানান, তিনি জীবনভর পড়াশোনা ও গবেষণা নিয়েই থেকেছেন। নিজের সম্পদ সম্পত্তির খোঁজখবর রাখতে পারেননি। ২০০৩ সালে তার প্রতিবেশী ইয়াহিয়া ফেরদৌস নিজের জমিতে দুই তলা বাড়ি তৈরি করেন। ইয়াহিয়া ফেরদৌস সাগরপাড়া ওয়াকফ এস্টেট নামের একটি এস্টেটের মোতোয়াল্লি বা তত্ত্বাবধায়ক। বাড়ি তৈরির সময় ইয়াহিয়া ফেরদৌস প্রতিবেশী বসাকের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দুই ফুটের বেশি জায়গা দখল করে নিজের বাড়িটি নির্মাণ করেন।

প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, প্রতিবেশী ফেরদৌস যখন আমাদের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ভেঙে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন, তখনই আমার স্ত্রী দেবিকা বসাক নির্মাণ ও ইমারত বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ দেন রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু আরডিএ কর্তৃপক্ষ দখলদারকে শোকজ নোটিশ পাঠাতে সাত মাস সময় পার করে। ফলে এই সময়ে দখলদার ইয়াহিয়া ফেরদৌস সহজেই তার বাড়ি নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে ফেলেন। এর পর আরও এক বছর পর ২০০৮ সালে আরডিএ ফেরদৌসকে অবৈধ নির্মাণ অংশ অপসারণের নোটিশ জারি করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দখলদার ফেরদৌস রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অবৈধ ইমারত অপসারণ নোটিশের কার্যকারিতা বন্ধে কৌশলে রাজশাহীর একটি আদালতে মামলা করেন। অভিযোগকারী দেবিকা বসাককে হয়রানি করার জন্য দখলদার ফেরদৌস এস্টেটের জমি দখলের উল্টো অভিযোগ আনেন তার বিরুদ্ধে।

শুনানির পর আদালত ফেরদৌসের মামলা খারিজ করে দেন। ২০১৪ সালে ফেরদৌস নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। তবে মিথ্যা মামলা করার দায়ে আদালত ফেরদৌসকেই ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। ২০১৭ সালে ফেরদৌস উচ্চ আদালতে আপিল করেন নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে রায় দেন উচ্চ আদালত। সেখানেও হেরে যায় ফেরদৌস।

প্রফেসর অরুণ বসাক বলেন, ২০২০ সালের জানুয়ারি উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে আদেশ দেন। একই রায়ে উচ্চ আদালত ইয়াহিয়া ফেরদৌসকে নির্দেশ দেন দেবিকা বসাকের কাছে ক্ষমা চাইতে এবং তাকে ও তার পরিবারকে হয়রানি না করার অঙ্গীকারনামাও দিতে।

জানা গেছে, উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী ২০২০ সালের অক্টোবর ফেরদৌস তার অবৈধ অংশ ভেঙে ফেললেও এখনও জমির ওই অংশের দখল ছাড়েননি। তিনি জায়গাটির চারপাশে ধাতব গ্রিল দিয়ে ঘিরে রেখে গাছ লাগিয়েছেন। এটা নিয়ে বসাক রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চেয়ে একাধিকবার অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার পাননি। ফলে অধ্যাপক বসাক তার জমি উদ্ধারে কারও সহযোগিতা না পাওয়ার কথা বলেছেন।

অন্যদিকে উচ্চ আদালতের রায় ও নির্দেশনা অনুযায়ী দখলি জমি ছেড়ে না দেওয়া প্রসঙ্গে প্রতিবেশী ফেরদৌস বলেন, আদালত আমাকে বলেছেন— আমি যেন অধ্যাপক বসাককে সন্তষ্ঠ করি। আমি জায়গাটি থেকে গাছগুলো কেটে ফেলব। প্রাচীরটি কবে অপসারণ করবেন জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। তবে তিনি দাবি করেন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরামর্শেই তিনি ওই মামলা করেছিলেন।

এ বিষয়ে জানতে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) অথরাইজড্ অফিসার আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মঙ্গলবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ইমারত বিধি লঙ্ঘন করায় আমরা ইয়াহিয়া ফেরদৌসকে তার অবৈধ অবকাঠামো অপসারণের নোটিশ দিয়েছিলাম। আমাদের আদেশের বিরুদ্ধে তিনি মামলা মোকদ্দমা করে ১৮ বছর পার করেছেন। উচ্চ আদালতের রায়ের পর সম্প্রতি ইয়াহিয়া ফেরদৌস বাড়ির নির্মিত অবৈধ অংশ অপসারণ করেছেন। এখন প্রফেসর বসাক যদি মনে করেন তিনি তার বেদখল হয়ে যাওয়া জায়গা পাচ্ছেন না, সে ক্ষেত্রে তিনি আদালতে উচ্ছেদের মামলা করতে পারেন। বিষয়টি এখন আরডিএর কর্তৃত্বে নেই। আদালত আদেশ দিলে আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা উচ্ছেদের পদক্ষেপ নিতে পারব। এখন প্রফেসর বসাকের জমি উদ্ধারের বিষয়টি ভূমি প্রশাসনের এখতিয়ার বলে অভিমত দেন আরডিএর এ কর্মকর্তা।

জমি নিয়ে দীর্ঘ ভোগান্তি হয়রানি প্রসঙ্গে অরুণ কুমার বসাক আরও বলেন, আরডিএ সময়মতো পদক্ষেপ নিলে বিষয়টি এতদূর গড়াত না। আমি পড়াশোনা ও গবেষণা নিয়েই ব্যস্ত থেকেছি আজীবন। সম্পত্তি দেখাশোনা করতে পারিনি। আর এ সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন আমার প্রতিবেশী। আমি এখন নিজের বাড়িতেই অনিরাপদ বোধ করি। আমি এর সমাধান খুঁজতে দুয়ারে দুয়ারে গেছি। কিন্তু কেউ সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেননি।

উল্লেখ্য, কৃতি শিক্ষাবিদ প্রফেসর অরুণ কুমার বসাক ১৯৬৩ সালে রাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতায় যুক্ত হন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, বিভাগের সভাপসিহ বিভিন্ন পদ অলংকৃত করেন। তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান। ফিরে এসে ২০০৮ সালে নিজ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। পরে ২০০৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে রাবির পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস (আজীবন) প্রফেসর নিয়োগ করেন। শিক্ষাজীবনে সর্বস্তরে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত এই কৃতী পদার্থবিজ্ঞানী ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে পাঠদান করেছেন। বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি তাকে গোল্ড মেডেল দিয়ে সম্মানিত করেন। এখন তিনি চান তার বেদখল হওয়া জমিটি উদ্ধার করে দিক প্রশাসন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here