সোমবার ,১৫ জুন, ২০২৬
sbacbank
Home Blog Page 427

বাঁধা আয়ে অচল সংসার

করোনা শুরুর পর থেকে গত দুই বছরে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য ও সেবার দাম আকাশচুম্বী। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি, গণপরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে লাগামহীন। বেড়েছে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। এছাড়া কর আরোপের ফলে বেড়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবার ব্যয়। সে তুলনায় আয় বাড়েনি। উলটো কিছু ক্ষেত্রে আয় কমেছে। জীবনযাপনে মানুষকে আপস করতে হচ্ছে দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে। সাধ, আহ্লাদ বা আবশ্যক এমন অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে। কারণ বাঁধা আয়ে সংসার প্রায় অচল, আর যেন চলছে না। চাহিদা মেটাতে আয়ও বাড়ানো যাচ্ছে না। অনেকের সঞ্চয়ে টান পড়েছে। আগের সঞ্চয় ভেঙে পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে। এর প্রভাবে ব্যাংকে সঞ্চয় কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্যহীনতা, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধিতে মানুষ যে কতটা কষ্টে আছে তা বোঝা যায়, টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখে। একটু কম দামে পণ্য কিনতে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। এই সারিতে এখন আর শুধু নিম্নবিত্তের মানুষ নেই। এতে যুক্ত হয়েছে মধ্য আয়ের মানুষেরাও। ফলে টিসিবিও চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের জোগান দিতে পারছে না। জানা গেছে, সরকারিভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব করা হয় মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের তুলনায় গত জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। বিবিএসের হিসাবে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (২০২১ সালের জানুয়ারির তুলনায় গত জানুয়ারি) ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কিন্তু সানেমের হিসাবে এই হার ১২ শতাংশের বেশি। শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ। বিবিএসের হিসাবে দেখা যায়, করোনার প্রভাব ও অন্যান্য কারণে গত দুই বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা বেড়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। তাদের হিসাবে অন্যান্য খাতেও মানুষের আয় বেড়েছে। দেশে মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি খাতে, ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে। সরকারি খাতের কর্মীদের আয় সামান্য বাড়লে বেসরকারি খাতে বাড়েনি। বরং কমেছে। এর মধ্যে এসেছে মূল্যস্ফীতির আঘাত। এদিকে বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে দেখা যায়, করোনার কারণে গত দুই বছরে মানুষের আয় কমেছে। এতে আড়াই কোটি লোক নতুন করে দারিদ্র্যের আওতায় নাম লিখিয়েছিল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ফলে কিছু মানুষ নতুন দারিদ্র্যের আওতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখনো ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) যৌথ জরিপে বলা হয়, করোনার দুই ধাপে মানুষের আয় কমেছে। যারা চাকরিচ্যুত হয়েছেন তারা সবাই আগের বেতনে চাকরিতে যেতে পারেননি। কম বেতনে গেছেন অনেকে। মানুষের খাদ্য বাজেটও কমেছে। ৩৭ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিবিএসের এক জরিপে বলা হয়, করোনার প্রভাবে দেশে পরিবারপ্রতি গড়ে ৪ হাজার টাকা করে আয় কমেছে। ফলে খাবার গ্রহণের হারও কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, হঠাৎ করে পণ্য বা সেবার মূল্য বেড়ে যাওয়ার নজির আছে ভূরি ভূরি। কিন্তু হঠাৎ করে আয় বাড়ানো যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে স্বল্প বা মধ্যম আয়ের মানুষকে প্রথমে ব্যয় কমাতে হয়। এতে চাহিদার অনেক কিছু কাটছাঁট হয়ে যায়। তাতে কাজ না হলে সঞ্চয় করা কমিয়ে দেয়। তাতেও সম্ভব না হলে আগের সঞ্চয় ভাঙতে শুরু করে। তিনটি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চাহিদার মধ্যে খাদ্যে কাটছাঁট করলে পুষ্টির হার কমে যায়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। ভোগ কমিয়ে ফেলায় কোম্পানিগুলো পণ্য বিক্রি করতে পারে না। ফলে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সঞ্চয় কমে গেলে অর্থের জোগান কমে যায়। এমনিতেই চাহিদার চেয়ে সঞ্চয় কম। এটি কমলে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। বিবিএসের হিসাবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জীবনযাপনের জন্য ২৭৬ টাকা ১৬ পয়সা খরচ করে মানুষ যে পণ্য ও সেবা কিনেছে গত জানুয়ারিতে একই পণ্য কিনতে খরচ হয়েছে ৩০৭ টাকা ২ পয়সা। আলোচ্য সময়ে ওই সূচকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৩০ টাকা ৮৬ পয়সা। বৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য উপকরণের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ। মিনিকেট বা নাজিরশাইল চালের দাম ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রতি কেজি ছিল ৬২ টাকা। গত জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৬৯ টাকা। দুই বছরে বেড়েছে ৭ টাকা, বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে পাইজাম চালের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৩ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৩ টাকা, বৃদ্ধির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। আটা ৪০ টাকা থেকে ৪২ টাকা হয়েছে। বৃদ্ধির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। চিনি ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ২৫ টাকা, বৃদ্ধির হার ৪২ শতাংশ। ডিমের হালি ৩৪ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৪ টাকা, বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। সয়াবিন তেল ৯৮ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৬২ টাকা, বৃদ্ধির হার ৬৩ শতাংশ। বিবিএসের হিসাবে ওই হারে পণ্যমূল্য বাড়লেও বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। বেড়েছে আরও বেশি। গত জানুয়ারিতেই সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে প্রতি লিটার দাঁড়িয়েছে ১৮০ টাকা । এখন ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের ৩ নভেম্বরে জ্বালানি তেলের (ডিজেল ও কেরোসিন) দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানো হলে এর প্রভাবে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। গণপরিবহণের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানো হলেও বাস্তবে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ। এর সঙ্গে বেড়েছে পানি ও এলপি গ্যাসের দাম। ভর মৌসুমেও চাল ও পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে। মানুষের জীবনযাত্রার বড় অংশই ব্যয় করে খাদ্যের জন্য। মধ্যম আয়ের পরিবার খাদ্যের জন্য ব্যয় করে ৫৮ শতাংশ, খাদ্য বহির্ভূত পণ্য ও সেবায় ৪২ শতাংশ। স্বল্প আয়ের পরিবার খাদ্যের জন্য ৬২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় ৩৫ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে ৭০ শতাংশ অর্থ। খাদ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় চালের। এর পরেই রয়েছে শাকসবজি, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল। এ কারণে এসব খাদ্য পণ্যের দাম বেশি বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশি মাত্রায় বেড়ে যায়। গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে পরিবহণ খাতে। এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার ২৭ শতাংশ। গৃহসামগ্রী খাতে ১২ শতাংশের বেশি, বাসাভাড়া ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪ শতাংশ, কাপড় ও জুতা কিনতে প্রায় ১১ শতাংশ, চিকিৎসা খাতে প্রায় ৯ শতাংশ এবং বিবিধ খাতে বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি হিসাবের চেয়ে বেসরকারি হিসাবে সব খাতেই ব্যয় বেশি বেড়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে উচ্চ রক্তচাপের যে ওষুধ ৩০ ট্যাবলেট ২৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৩৬০ টাকা। পেটের গ্যাস নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধের প্রতি ট্যাবলেট ছিল ৫ টাকা, এখন তা ৭ টাকা। এভাবে প্রায় সব ওষুধের ও চিকিৎসাসেবার মূল্য বেড়েছে। চাল, ডালসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়েছে সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি। এদিকে সরকারি হিসাবে আয় বেড়েছে। বেসরকারি হিসাবে গত দুই বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় কমেছে। নতুন কাজের সংস্থান হয়েছে খবুই কম। বরং চাকরিচ্যুতির হার বেড়েছে। এসব মিলে আয় বাড়ার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়েছে। এতে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, কমেছে টাকার মান, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে। এতে ভোগের হারও কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জাতীয় উৎপাদনে। এতে সার্বিকভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমেছে। বিবিএসের হিসাবে ২০১৯ সালের জানুয়ারির তুলনায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বেতন ভাতা বেড়েছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের জানুয়ারিতে বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিভাগওয়ারি হিসাবে গড়ে জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি বেতন ভাতার সূচক বেড়েছে রংপুর বিভাগে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ঢাকায় বেড়েছে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ, বরিশালে ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ, খুলনায় ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। বিবিএসের হিসাবের সঙ্গে অনেকেই একমত হতে পারছে না। করোনার কারণে বেতন না বেড়ে বরং কমেছে। শ্রম শক্তির প্রায় ৩ কোটি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। করোনার লকডাউনের সময় এরা নিয়মিত কাজ পায়নি। এদের আয় কমেছে। এর মধ্যে বস্তিবাসীদের আয় কমেছে ১৮ শতাংশ। উন্নত দেশগুলোর মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ী প্রবণতা কম। কেননা তাদের জীবিকা নির্বাহে সরকার বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে সেটি নেই। যে কারণে ব্যক্তিকেই জীবিকার পথ খুঁজে নিতে হয়। এদেশের মানুষ মধ্যবিত্তের প্রায় সবাই দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করে একটি অংশ সঞ্চয় করে। প্রয়োজনে জীবনযাত্রার মানে কাটছাঁট করেও সঞ্চয়মুখী হয়। কিন্তু সেই সঞ্চয়ে এখন ভাটার টান পড়েছে। কমে যাচ্ছে ব্যাংকে সঞ্চয়। গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে ব্যাংকে আমানত বেড়েছিল ৪৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বৃদ্ধির হার কমেছে ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে স্বল্প ও মধ্য আয়ের একটি বড় অংশ ব্যাংকে বিভিন্ন কিস্তিভিত্তিক প্রকল্পে সঞ্চয় করেন। সেই মেয়াদি আমানত গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ২৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে বৃদ্ধির হার কমেছে ৪৩ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে চলতি আমানতও। এ হিসাবে টাকা রেখে চলমান ব্যয় মেটানো হয়। বিশেষ করে ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলো এ হিসাবে টাকা রাখে। এ আমানত গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে বেড়েছে ২২৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমেছে ১১৭ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষ খরচ মেটানোর জন্যও এখন ব্যাংকে টাকা রাখছে না। খরচ করে ফেলছে। যে কারণে এ টাকা কমছে। মানুষ প্রয়োজনে টাকা তুলে হাতে রাখে। সাধারণ সময়ে টাকা হাতে রাখার হার কম। অস্বাভাবিক সময়ে বেশি থাকে। এখন হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখছে। মধ্য আয়ের মানুষের সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্র কেনার আগ্রহ বেশি। যে কারণে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়। কিন্তু গত সাত মাসে এ খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করছে কম। গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ২৫ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে বিক্রি কমেছে প্রায় অর্ধেক।

উত্তপ্ত স্বর্ণের বাজার, ভরিতে বাড়ল যত

ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের জেরে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে স্বর্ণের আন্তর্জাতিক বাজারে। প্রতিদিনই দাম বাড়ছে হুহু করে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারে সঙ্গে দেশের বাজারেও স্বর্ণের দাম উত্তপ্ত।

২২, ২১ ও ১৮- এই তিন মানের (ক্যারেট) স্বর্ণের ভরিতে দাম বাড়ানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের স্বর্ণ ২২ ক্যারেটের ভরিতে ১ হাজার ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৭৯ হাজার ৩১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মঙ্গলবার পর্যন্ত এই মানের স্বর্ণের দাম ছিল ৭৮ হাজার ২৬৫ দশমিক ৪৪ টাকা।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) মঙ্গলবার মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এমএ হান্নান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। আগামীকাল (বুধবার) থেকে স্বর্ণের এই নতুন দাম কার্যকর হবে বলে জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২২ ক্যারেটের ভরির দাম পড়বে ৭৯ হাজার ৩১৫ দশমিক ২০ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৭৫ হাজার ৬৯৯ দশমিক ৩৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ভরি ৬৪ হাজার ৯৬৮ দশমিক ৪৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি ভরির দাম পড়বে ৫৪ হাজার ৬২ দশমিক ৬৪ টাকা।

নতুন দাম অনুযায়ী, বুধবার থেকে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি স্বর্ণ ৭৯ হাজার ৩১৫ টাকায় কিনতে হবে- যা মঙ্গলবার পর্যন্ত ছিল ৭৮ হাজার ২৬৫ দশমিক ৪৪ টাকা ভরি। সে হিসাবে ভরিতে দাম বেড়েছে ১ হাজার ৪৯ দশমিক ৭৬ টাকা।

২১ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম ধরা হয়েছে ৭৫ হাজার ৬৯৯ দশমিক ৩৬ টাকা, যা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে প্রতি ভরি ৭৪ হাজার ৭৬৬ দশমিক ২৪ টাকায়। নতুন ঘোষণায় স্বর্ণের ভরিতে দাম বেড়েছে ৯৩৩ দশমিক ১২ টাকা।

১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৪ হাজার ৯৬৮ দশমিক ৪৮ টাকা, যা মঙ্গলবার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে ৬৪ হাজার ১৫২ টাকায়। ভরিতে দাম বেড়েছে ৮১৬ দশমিক ৪৮ টাকা।

এ ছাড়া সনাতন পদ্ধতিতে প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ৫৪ হাজার ৬২ দশমিক ৬৪ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতি ভরি ৫৩ হাজার ৪২১ দশমিক ১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সে হিসাবে ভরিতে দাম বেড়েছে ৬৪১ দশমিক ৫২ টাকা।

যুদ্ধের অজুহাতে গমের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা

যুদ্ধরত দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে আমদানির চুক্তির পুরো লট গম চলে এসেছে দেশে। গম আমদানি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে শঙ্কা নেই। বেসরকারি পর্যায়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ লাখ মেট্রিক টন আমদানি হয়েছে।

পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে উৎপাদনের প্রায় ১২ লাখ টন চলতি মাসের শেষে কৃষকের ভান্ডারে যুক্ত হবে। এছাড়া গত মৌসুমে সরকারিভাবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জন হয়েছে। কিন্তু এরপরও যুদ্ধের ডামাডোলের অজুহাতে বাজারে কতিপয় ব্যবসায়ী বাড়াচ্ছে গমের দাম। এতে গম ও মোটা চালের মূল্য প্রায় কাছাকাছি হয়ে গেছে। বাজারে এক কেজি মোটা চাল ৫০ টাকা এবং আটার কেজি ৪৫ টাকায় উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গম আমদানিকারক এবং গম থেকে আটা ও ময়দা উৎপাদনকারীদের ওপর নজরদারি করছে সরকারের এজেন্সিগুলো। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সম্প্রতি দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, গম পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে। এর মজুত নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে যে গমের মূল্য বেড়েছে, এর প্রভাব আগামী দুই মাস পর পড়বে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এর প্রভাব দ্রুত পড়ছে বাজারে। এ ধরনের তথ্য আমাদের কাছে আসছে। এজন্য আমি গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছি।

বাজার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিআইডিএস-এর সাবেক ডিজি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে আঘাত আসছে। আমরা যুদ্ধরত দেশগুলো থেকে গম, ভোজ্যতেল, ভুট্টা আমদানি করছি। এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে এটিও ঠিক, বিশ্ববাজারের কারণে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে যতটুকু বৃদ্ধির কথা, কতিপয় ব্যবসায়ী এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি করে থাকে। এজন্য সরকারকে পণ্যের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা উদ্যোগ নিতে হবে।

সম্প্রতি খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে গম নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকার যে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, এর ৯৫ শতাংশ গম আবাদ করেছেন কৃষক। এছাড়া ২০২১ সালের মৌসুমে ১ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ হাজার ২১২ টন বেশি সংগ্রহ হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) সরকার টু সরকার (জি টু জি) পদ্ধতিতে রাশিয়া থেকে ৩ লাখ মেট্রিক টন, ইউক্রেন থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন এবং ভারত থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থবছরের সাড়ে ৭ মাসে রাশিয়া, ইউক্রেন থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি সম্পন্ন হয়েছে। এর বাইরে ৫২ হাজার ৫শ মেট্রিক টনের গমবাহী জাহাজ বাংলাদেশ বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে। অর্থাৎ রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে সরকারিভাবে আমদানির পুরোটাই চলে আসছে। ফলে এ বছর যুদ্ধরত দেশ দুটি থেকে গম আমদানি নিয়ে কোনো ধরনের সরকারি পর্যায়ে শঙ্কা নেই।

এছাড়া ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারিভাবে আমদানি করা হয়েছে ২১ লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন। অবশ্য বেসরকারিভাবে বছরে প্রায় ৫৪ লাখ মেট্রিক টনের মতো আমদানি হয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বার্ষিক গমের চাহিদা ৫৮ লাখ টন। প্রথম ছয় মাসে চাহিদা (জুলাই-ডিসেম্বর) ২৯ লাখ মেট্রিক টন। এই চাহিদা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট আমদানি হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন।

চলতি মাসে শেষ এবং এপ্রিলের শুরুতে কৃষকের আবাদের প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন যোগ হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের মৌসুমে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) কৃষক ৩ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে গম আবাদ সম্পন্ন করেছে। এ বছর সরকারিভাবে গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন। ওই হিসাবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার ৯৫ শতাংশই কৃষক আবাদ করেছে।

আমদানি, উৎপাদনের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই মুহূর্তে গমের সংকট নেই। কিন্তু যুদ্ধের দোহাই দিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী দাম বাড়াচ্ছে গমের। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পরপরই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে গত দশ দিনে প্রতি মনে (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে গমের দাম। এর জেরে বেড়ে গেছে আটা-ময়দা ও সুজির দাম।

এখন এক কেজি খোলা আটা ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা এবং আটার প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। একইভাবে খোলা ময়দার কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পাউরুটির প্যাকেটসহ কিছু ব্র্যান্ডেড বেকারির আউটলেট ও খুচরা দোকানে অন্তত ১০ টাকা বেড়েছে। রাস্তার পাশের চা-স্টলে বিক্রি হওয়া পাউরুটি ও বিস্কুটের দামও বেড়েছে। এতে কর্মজীবী মানুষের খাবারের পেছনে খরচও বেড়ে গেছে। এছাড়া আটা ও ময়দা দিয়ে তৈরি চানাচুর, বিস্কুট, বেকারি পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে।

সূত্র জানায়, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলে গম আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। তাদের মত হচ্ছে, এ মুহূর্তে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবছর এই দুটি দেশ থেকে আমাদের মোট চাহিদার ৩৫ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়।

তবে চলমান যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের প্রধান বন্দরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সরবরাহ ও শিপিং লিঙ্ক। যার ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে শিপমেন্ট। এছাড়া রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি খাদ্যশস্য আমদানিকারকরাও বিকল্প সোর্সিং দেশের সন্ধান করছে। বিশেষ করে বিকল্প হিসাবে কানাডা এবং আর্জেন্টিনা থেকে গম বুকিং করছেন অনেক আমদানিকারক।

এখনো সময় আছে, বিএনপিকে কাদের

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, একমাত্র বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। আর বিএনপি ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বার বার বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য মায়াকান্না করে।

মঙ্গলবার বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।

ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি নেতারা এখন তত্ত্বাবধায়কের কথা বলছে। অথচ বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচন আয়োজন করেছিল। তখন বিরোধী দল ও দেশের সর্বস্তরের মানুষ ওই নির্বাচন বর্জন করে। তারপরও খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক-রশিদদের দল ফ্রিডম পার্টিকে নিয়ে নির্বাচন করেছিল। ১৫০ জন নিরীহ দেশবাসীকে হত্যা করে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুককে বিরোধীদলীয় নেতা বানিয়ে সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু গণআন্দোলনের মুখে কয়েক দিনের মধ্যেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল খালেদা জিয়ার সে সরকার। তখন ক্ষমতা ছাড়ার পূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনে নিয়ে সংসদে মধ্যরাতে একক অধিবেশনে নিজেদের মতো করে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংযোজন করে বিএনপি।

বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বিএনপি নেতাদেরকে বুঝতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুটি এখন একটি ডেড ইস্যু এবং পাস্ট অ্যান্ড ক্লোজড চ্যাপ্টার। জল বহুদূর গড়িয়ে গেছে। তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে সেই একই জায়গায় হাবুডুবু খেতে থাকলে বিএনপিকে গভীর জলে ডুবে মরতে হবে। গণতন্ত্রের নৌকা বহুদূর এগিয়ে গেছে, তাতে উঠতে হলে অনেকটা পথ সাঁতরে পাড়ি দিতে হবে। এখনো সময় আছে, বিএনপিকে সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সঠিক ধারায় পথ চলার আহ্বান জানাচ্ছি।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পবিত্র সংবিধান হলো দেশের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের রক্ষা কবচ। সংবিধান অনুযায়ীই এদেশের সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সংবিধানসম্মতভাবে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে এবং যথা সময়েই আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু-শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে।

বিএনপি যদি তথাকথিত আন্দোলনের নামে এদেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং আবারো ২০১৩-১৪-১৫ ও ২০১৮ সালের মতো অগ্নিসন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সংঘটিত করতে চায় তাহলে তাদেরকে ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হতে হবে।জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে বলেও হুশিয়ারি দেন ওবায়দুল কাদের।

সরকারের ‘নিষ্ঠুর খেলা’ জনগণ আর বরদাস্ত করবে না: আসম রব

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, ‘চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আটাসহ সব নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য প্রতিদিন লাফিয়ে বাড়ছে। নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে অক্ষম হয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে চলছে হাহাকার।’

‘দেশের ৮০ ভাগ মানুষ দ্রব্যমূল্যের কষাঘাতে জর্জরিত। অথচ সরকার মানুষের বাঁচা-মরার সংকটের মুহূর্তে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। সরকারের মন্ত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য জনজীবনে সৃষ্ট ক্ষত আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।’

মঙ্গলবার বিকালে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর জেএসডি আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল পূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আসম রব এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘বিনা ভোটের সরকার জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। বরং কালোবাজারি, মজুদদার ও মুনাফাখোরদের দৌরাত্ম্যকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। জনদুর্ভোগের প্রতি দৃষ্টি না দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা সংহত করার কাজেই সরকার ব্যস্ত। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জনগণ সরকারের এই নিষ্ঠুর খেলা আর বরদাস্ত করবে না।’

রব আরও বলেন, যে কোনো ধরনের অরাজক পরিস্থিতি মোকাবিলা, জনজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ বিদ্যমান সংকট নিরসনে অবিলম্বে জাতীয় সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত মিছিল পূর্ব সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন- জেএসডি সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ছানোয়ার হোসেন তালুকদার, কার্যকরী সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ সিরাজ মিয়া, স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম তানিয়া রব, কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, অ্যাডভোকেট সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল, শ্রমিক নেতা মোশাররফ হোসেন, এসএম শামসুল আলম নিক্সন, মহানগর জেএসডি নেতা মাইনুর রহমান মাইনু, ছাত্রনেতা তৌফিকুজ্জামান পীরাচা প্রমুখ।

সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর জেএসডির সমন্বয়ক কামাল উদ্দিন পাটোয়ারী। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে

সারা দেশের আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। এছাড়া দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে পরবর্তী তিনদিনে আবহাওয়ার অবস্থা সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। খবর বাসসের।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, পশ্চিমা লঘুচাপের বাড়তি অংশ হিমালয়ের পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ এবং এর কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।

মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকায় উত্তর-পশ্চিম অথবা পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হয়।

এছাড়া তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। সিলেটে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

দুপুরে দেশে ফিরছেন বাংলার সমৃদ্ধির ২৮ নাবিক

ইউক্রেনে রকেট হামলার শিকার বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’র ২৮ নাবিক দেশে ফিরছেন। বুধবার দুপুর নাগাদ রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাদের পৌঁছার কথা রয়েছে।

রোমানিয়ায় নিযুক্ত ঢাকার রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে যুগান্তরকে জানান, এদিন রোমানিয়ার সময় রাত পৌনে ১০টায় এবং বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে দুটোয় ২৮ নাবিককে বুখারেস্ট থেকে তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে ইস্তাম্বুলে পাঠানো হবে। ইস্তাম্বুল হয়ে তারা ঢাকায় পৌঁছাবেন। একটি বিশেষ বিমানে এ নাবিকদের একসঙ্গে পাঠানো হচ্ছে।

জাহাজে আগুনের ঘটনায় নিহত থার্ড ইঞ্জিনিয়ার হাদিসুর রহমানের লাশ ইউক্রেনের একটি মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে। তার লাশ আজকে আসছে না।

২৮ নাবিকের মধ্যে রয়েছেন- বাংলার সমৃদ্ধি জাহাজের মাস্টার জিএম নুর ই আলম ও সহকারী মাস্টার মনসুরুল আমিন খান। বাকিরা হলেন সেলিম মিয়া, রমা কৃষ্ণ বিশ্বাস, রুকনুজ্জামান রাজিব, ফারিয়াতুল জান্নাত তুলি, ফয়সাল আহমেদ সেতু, মোহাম্মদ ওমর ফারুক তুহিন, সৈয়দ আসিফুল ইসলাম, রবিউল আউয়াল, সালমান সরওয়ার সামি, ফারজানা ইসলাম মৌ, শেখ সাদি, মাসুদুর রহমান, জামাল হোসাইন, মোহাম্মদ হানিফ, আমিনুর ইসলাম, মহিন উদ্দিন, হোসাইন মোহাম্মদ রাকিব, সাজ্জাদ ইবনে আলম, নাজমুল উদ্দিন, নজরুল ইসলাম, সরওয়ার হোসাইন, মাসুম বিল্লাহ, মোহাম্মদ হোসাইন, শফিকুর রহমান, আতিকুর রহমান ও মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন।

তুরস্ক থেকে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনের অলভিয়া বন্দরে জলসীমায় নোঙর করে ১৮০ মিটার দৈর্ঘ্যরে বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ বাংলার সমৃদ্ধি। গত ২ মার্চ বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ২৫ মিনিট ও ইউক্রেন সময় ৫টা ২৫ মিনিটে ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ জাহাজে রকেট হামলা হয়। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। মারা যান হাদিসুর রহমান।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে চান মোদি

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে কাজ করতে চান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি এ মন্তব্য করেন। নয়াদিল্লিতে সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দ্য স্টেটসম্যানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

বৈঠককালে নরেন্দ্র মোদি গত বছর তার বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করেন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানান।

তারেক আহমেদ সিদ্দিকী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শক্তিশালী করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করায় নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানান। এছাড়া কোভিড-১৯ মহামারিসহ সংকটের সময়ে বাংলাদেশের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

প্রধানমন্ত্রী মোদি সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। মোদি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জোরদার করতে শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

বাঁধা আয়ে অচল সংসার

করোনা শুরুর পর থেকে গত দুই বছরে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য ও সেবার দাম আকাশচুম্বী। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি, গণপরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে লাগামহীন। বেড়েছে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। এছাড়া কর আরোপের ফলে বেড়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবার ব্যয়।

সে তুলনায় আয় বাড়েনি। উলটো কিছু ক্ষেত্রে আয় কমেছে। জীবনযাপনে মানুষকে আপস করতে হচ্ছে দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে। সাধ, আহ্লাদ বা আবশ্যক এমন অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে। কারণ বাঁধা আয়ে সংসার প্রায় অচল, আর যেন চলছে না। চাহিদা মেটাতে আয়ও বাড়ানো যাচ্ছে না। অনেকের সঞ্চয়ে টান পড়েছে। আগের সঞ্চয় ভেঙে পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে। এর প্রভাবে ব্যাংকে সঞ্চয় কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্যহীনতা, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধিতে মানুষ যে কতটা কষ্টে আছে তা বোঝা যায়, টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখে। একটু কম দামে পণ্য কিনতে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। এই সারিতে এখন আর শুধু নিম্নবিত্তের মানুষ নেই। এতে যুক্ত হয়েছে মধ্য আয়ের মানুষেরাও। ফলে টিসিবিও চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের জোগান দিতে পারছে না।

জানা গেছে, সরকারিভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব করা হয় মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের তুলনায় গত জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। বিবিএসের হিসাবে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (২০২১ সালের জানুয়ারির তুলনায় গত জানুয়ারি) ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কিন্তু সানেমের হিসাবে এই হার ১২ শতাংশের বেশি। শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবে দেখা যায়, করোনার প্রভাব ও অন্যান্য কারণে গত দুই বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা বেড়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। তাদের হিসাবে অন্যান্য খাতেও মানুষের আয় বেড়েছে। দেশে মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি খাতে, ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে। সরকারি খাতের কর্মীদের আয় সামান্য বাড়লে বেসরকারি খাতে বাড়েনি। বরং কমেছে। এর মধ্যে এসেছে মূল্যস্ফীতির আঘাত।

এদিকে বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে দেখা যায়, করোনার কারণে গত দুই বছরে মানুষের আয় কমেছে। এতে আড়াই কোটি লোক নতুন করে দারিদ্র্যের আওতায় নাম লিখিয়েছিল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ফলে কিছু মানুষ নতুন দারিদ্র্যের আওতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখনো ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) যৌথ জরিপে বলা হয়, করোনার দুই ধাপে মানুষের আয় কমেছে। যারা চাকরিচ্যুত হয়েছেন তারা সবাই আগের বেতনে চাকরিতে যেতে পারেননি। কম বেতনে গেছেন অনেকে। মানুষের খাদ্য বাজেটও কমেছে। ৩৭ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিবিএসের এক জরিপে বলা হয়, করোনার প্রভাবে দেশে পরিবারপ্রতি গড়ে ৪ হাজার টাকা করে আয় কমেছে। ফলে খাবার গ্রহণের হারও কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, হঠাৎ করে পণ্য বা সেবার মূল্য বেড়ে যাওয়ার নজির আছে ভূরি ভূরি। কিন্তু হঠাৎ করে আয় বাড়ানো যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে স্বল্প বা মধ্যম আয়ের মানুষকে প্রথমে ব্যয় কমাতে হয়। এতে চাহিদার অনেক কিছু কাটছাঁট হয়ে যায়। তাতে কাজ না হলে সঞ্চয় করা কমিয়ে দেয়। তাতেও সম্ভব না হলে আগের সঞ্চয় ভাঙতে শুরু করে। তিনটি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চাহিদার মধ্যে খাদ্যে কাটছাঁট করলে পুষ্টির হার কমে যায়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। ভোগ কমিয়ে ফেলায় কোম্পানিগুলো পণ্য বিক্রি করতে পারে না। ফলে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সঞ্চয় কমে গেলে অর্থের জোগান কমে যায়। এমনিতেই চাহিদার চেয়ে সঞ্চয় কম। এটি কমলে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে।

বিবিএসের হিসাবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জীবনযাপনের জন্য ২৭৬ টাকা ১৬ পয়সা খরচ করে মানুষ যে পণ্য ও সেবা কিনেছে গত জানুয়ারিতে একই পণ্য কিনতে খরচ হয়েছে ৩০৭ টাকা ২ পয়সা। আলোচ্য সময়ে ওই সূচকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৩০ টাকা ৮৬ পয়সা। বৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য উপকরণের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

মিনিকেট বা নাজিরশাইল চালের দাম ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রতি কেজি ছিল ৬২ টাকা। গত জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৬৯ টাকা। দুই বছরে বেড়েছে ৭ টাকা, বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে পাইজাম চালের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৩ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৩ টাকা, বৃদ্ধির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। আটা ৪০ টাকা থেকে ৪২ টাকা হয়েছে। বৃদ্ধির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। চিনি ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ২৫ টাকা, বৃদ্ধির হার ৪২ শতাংশ। ডিমের হালি ৩৪ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৪ টাকা, বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। সয়াবিন তেল ৯৮ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৬২ টাকা, বৃদ্ধির হার ৬৩ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবে ওই হারে পণ্যমূল্য বাড়লেও বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। বেড়েছে আরও বেশি। গত জানুয়ারিতেই সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে প্রতি লিটার দাঁড়িয়েছে ১৮০ টাকা । এখন ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

গত বছরের ৩ নভেম্বরে জ্বালানি তেলের (ডিজেল ও কেরোসিন) দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানো হলে এর প্রভাবে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। গণপরিবহণের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানো হলেও বাস্তবে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ। এর সঙ্গে বেড়েছে পানি ও এলপি গ্যাসের দাম। ভর মৌসুমেও চাল ও পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে।

মানুষের জীবনযাত্রার বড় অংশই ব্যয় করে খাদ্যের জন্য। মধ্যম আয়ের পরিবার খাদ্যের জন্য ব্যয় করে ৫৮ শতাংশ, খাদ্য বহির্ভূত পণ্য ও সেবায় ৪২ শতাংশ। স্বল্প আয়ের পরিবার খাদ্যের জন্য ৬২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় ৩৫ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে ৭০ শতাংশ অর্থ। খাদ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় চালের। এর পরেই রয়েছে শাকসবজি, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল। এ কারণে এসব খাদ্য পণ্যের দাম বেশি বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশি মাত্রায় বেড়ে যায়।

গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে পরিবহণ খাতে। এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার ২৭ শতাংশ। গৃহসামগ্রী খাতে ১২ শতাংশের বেশি, বাসাভাড়া ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪ শতাংশ, কাপড় ও জুতা কিনতে প্রায় ১১ শতাংশ, চিকিৎসা খাতে প্রায় ৯ শতাংশ এবং বিবিধ খাতে বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি হিসাবের চেয়ে বেসরকারি হিসাবে সব খাতেই ব্যয় বেশি বেড়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে উচ্চ রক্তচাপের যে ওষুধ ৩০ ট্যাবলেট ২৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৩৬০ টাকা। পেটের গ্যাস নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধের প্রতি ট্যাবলেট ছিল ৫ টাকা, এখন তা ৭ টাকা। এভাবে প্রায় সব ওষুধের ও চিকিৎসাসেবার মূল্য বেড়েছে। চাল, ডালসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়েছে সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।

এদিকে সরকারি হিসাবে আয় বেড়েছে। বেসরকারি হিসাবে গত দুই বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় কমেছে। নতুন কাজের সংস্থান হয়েছে খবুই কম। বরং চাকরিচ্যুতির হার বেড়েছে। এসব মিলে আয় বাড়ার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়েছে। এতে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, কমেছে টাকার মান, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে। এতে ভোগের হারও কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জাতীয় উৎপাদনে। এতে সার্বিকভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমেছে।

বিবিএসের হিসাবে ২০১৯ সালের জানুয়ারির তুলনায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বেতন ভাতা বেড়েছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের জানুয়ারিতে বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিভাগওয়ারি হিসাবে গড়ে জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি বেতন ভাতার সূচক বেড়েছে রংপুর বিভাগে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ঢাকায় বেড়েছে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ, বরিশালে ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ, খুলনায় ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবের সঙ্গে অনেকেই একমত হতে পারছে না। করোনার কারণে বেতন না বেড়ে বরং কমেছে। শ্রম শক্তির প্রায় ৩ কোটি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। করোনার লকডাউনের সময় এরা নিয়মিত কাজ পায়নি। এদের আয় কমেছে। এর মধ্যে বস্তিবাসীদের আয় কমেছে ১৮ শতাংশ।

উন্নত দেশগুলোর মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ী প্রবণতা কম। কেননা তাদের জীবিকা নির্বাহে সরকার বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে সেটি নেই। যে কারণে ব্যক্তিকেই জীবিকার পথ খুঁজে নিতে হয়। এদেশের মানুষ মধ্যবিত্তের প্রায় সবাই দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করে একটি অংশ সঞ্চয় করে। প্রয়োজনে জীবনযাত্রার মানে কাটছাঁট করেও সঞ্চয়মুখী হয়। কিন্তু সেই সঞ্চয়ে এখন ভাটার টান পড়েছে। কমে যাচ্ছে ব্যাংকে সঞ্চয়।

গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে ব্যাংকে আমানত বেড়েছিল ৪৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বৃদ্ধির হার কমেছে ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে স্বল্প ও মধ্য আয়ের একটি বড় অংশ ব্যাংকে বিভিন্ন কিস্তিভিত্তিক প্রকল্পে সঞ্চয় করেন। সেই মেয়াদি আমানত গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ২৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে বৃদ্ধির হার কমেছে ৪৩ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে চলতি আমানতও। এ হিসাবে টাকা রেখে চলমান ব্যয় মেটানো হয়। বিশেষ করে ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলো এ হিসাবে টাকা রাখে। এ আমানত গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে বেড়েছে ২২৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমেছে ১১৭ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষ খরচ মেটানোর জন্যও এখন ব্যাংকে টাকা রাখছে না। খরচ করে ফেলছে। যে কারণে এ টাকা কমছে। মানুষ প্রয়োজনে টাকা তুলে হাতে রাখে। সাধারণ সময়ে টাকা হাতে রাখার হার কম। অস্বাভাবিক সময়ে বেশি থাকে। এখন হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখছে।

মধ্য আয়ের মানুষের সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্র কেনার আগ্রহ বেশি। যে কারণে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়। কিন্তু গত সাত মাসে এ খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করছে কম। গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ২৫ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে বিক্রি কমেছে প্রায় অর্ধেক।

টিকা দেবে না লিথুয়ানিয়া, আলু নেবে রাশিয়া

রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে জাতিসংঘে উত্থাপিত প্রস্তাবের পক্ষে ভোট না দেওয়ায় বাংলাদেশকে করোনার টিকা দেবে না লিথুয়ানিয়া। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য ওই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র রাসা জাকিলাইটিয়েন এ তথ্য জানান। মুখপাত্রের বিবৃতির বরাত দিয়ে লিথুয়ানিয়ান ন্যাশনাল রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশন এই তথ্য জানিয়েছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার নিন্দা ও যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে গত ২ মার্চ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উত্থাপিত প্রস্তাবে ভোটাভুটি হয়।

ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি বাংলাদেশ, ভারত, চীনসহ ৩৫ দেশ। তারা সবাই প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান না নিয়ে ‘অ্যাবস্টেইন’ (পক্ষে-বিপক্ষে কোনোটাই নয়) ভোট দিয়েছে। প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত ১৪১-৫ ভোটে গৃহীত হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ তার ইউরোপীয় মিত্ররা বাংলাদেশি কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের কাছে অসন্তোষ জানিয়েছে। এরই মধ্যে ভোটাভুটিকে কেন্দ্র করে লিথুয়ানিয়া বাংলাদেশে টিকা না পাঠানোর ঘোষণা দিল।
সরকারি লিথুয়ানিয়া রেডিও অ্যান্ড টেলিভিশনের (এলআরটি) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা জয়েছে, লিথুয়ানিয়া সরকার গত সপ্তাহের শুরুর দিকে বাংলাদেশে চার লাখ ৪৪ হাজার ৬০০ ডোজ ফাইজারের টিকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ রাশিয়ার প্রতি নিন্দা প্রস্তাব সমর্থন না করায় ৩ মার্চ লিথুয়ানিয়া বাংলাদেশে টিকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করে।

বাংলাদেশ কেন জাতিসংঘে ওই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়নি, তা ব্যাখ্যা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। গত রবিবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবের শব্দগুলো যদি আপনারা পড়েন সেখানে দেখবেন, সেগুলো যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানের মধ্যে পড়ে না। সেটি কাউকে দোষারোপটোষারোপ করার জন্য। ’

তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তির দেশ। আমরা শান্তি চাই। কোথাও কোনো জায়গায় যুদ্ধ হোক, আমরা তা পছন্দ করি না। আমরা বলেছি, এই দুর্ঘটনা (ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান) যেটি হচ্ছে সে জন্য আমরা অত্যন্ত গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সেই সঙ্গে আমরা আশা করব, জাতিসংঘের সনদ সবাই মেনে চলবে। ’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলেছি, বাংলাদেশ সব সময় আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে চায়। এই বিরোধও যেন শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়। ’

বাংলাদেশ থেকে আলু নেবে রাশিয়া : এদিকে লিথুয়ানিয়া যখন অসন্তুষ্ট, তখন ঢাকায় রাশিয়া দূতাবাস জানিয়েছে, রাশিয়া বাংলাদেশ থেকে আলু নেবে। বাংলাদেশ থেকে আলু আমদানিতে রাশিয়ায় যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা গত ৫ মার্চ প্রত্যাহার করা হয়েছে।

রাশিয়া দূতাবাস জানায়, রাশিয়া ও ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ‘ফাইটোস্যানিটারি’ প্রয়োজনীয়তা লঙ্ঘন প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঢাকায় রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মানটিটস্কি বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে বেশ কিছু বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির বিষয়ে আলোচনা করেছেন।