দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সঞ্চয়পত্রের সুদহার হ্রাস ও মূল্যস্ফীতির চরম কশাঘাতে পেরেশানে আছেন অবসরে যাওয়া সরকারি চাকরিজীবীরা। বিশেষ করে পেনশনের শতভাগ অর্থ উত্তোলনকারী অর্থাৎ পুরোনোরা রয়েছেন চরম দুর্ভোগে।
এদিকে শতভাগ পেনশন উত্তোলনের পর পুনঃপেনশন স্থাপনের সময়সীমা ১৫ বছর থেকে কমিয়ে ৮ বছর করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অবসর গ্রহণের ১৫ বছর পর এ সুবিধা নিতে পারেন একজন শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী। কিন্তু ওই সময় পেনশনভোগীর বেশির ভাগের বয়স দাঁড়ায় ৭৫ বছর।
তাই পেনশন পুনঃস্থাপন সুবিধা ভোগের আগেই অনেকে মারা গেছেন। কারণ দেশের মানুষের গড় আয়ু এই মুহূর্তে ৭২.৬ বছর। এসব তথ্য তুলে ধরে শতভাগ পেনশন সমর্পণ গ্রুপের পক্ষে থেকে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী গ্রুপের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মেডিকেল টেস্ট করার অর্থও নেই অবসরপ্রাপ্ত সরকারের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের। খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছি আমরা। প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন ১০ বছর পর একজন অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীর পেনশন পুনঃস্থাপন করবেন। সে নির্দেশ এখনো পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। আমরা শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের ৮ বছরের মাথায় পুনঃস্থাপনের দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছি।
তিনি আরও জানান, এই মুহূর্তে সব নিত্যপণ্যের দাম প্রায় অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাশাপাশি যারা অবসরে আছেন, তাদের অধিকাংশই পেনশনের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। সেটির মুনাফাও কমানো হয়েছে। সবমিলিয়ে একরকম জাঁতাকলের মধ্যে দিনযাপন করছি আমরা।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, অনেকে আগে যারা পেনশনে গেছেন, বর্তমানের তুলনায় তারা অনেক কম টাকা পেয়েছেন। সে বিবেচনায় সরকার তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে পারে। আর নতুনদের ক্ষেত্রে পেনশনের তিনভাগের একভাগ উত্তোলন করার বিধান আরোপ করলে শেষ জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে একজন অবসরপ্রাপ্তের। বর্তমানে ৫০ শতাংশ উত্তোলন করার বিধান আছে। এটি কমিয়ে ২৫ শতাংশ করতে হবে।
শতভাগ পেনশন সমর্পণ গ্রুপের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠিতে বলা হয়, সরকার ২০১৮ সালে শতভাগ পেনশন সমর্পণকারীদের ১৫ বছরের মাথায় পুনঃস্থাপনের প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা ছিল সময়োপযোগী ও অত্যন্ত মানবিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর সুবিধা পেতে হলে সংশ্লিষ্ট অবসরভোগীকে ৭৩ বা ৭৫ বছর বেঁচে থাকতে হবে, যা বস্তবে সম্ভব নয়। বর্তমান আমাদের গড় আয়ু ৭২.৬ বছর। চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ অনুষ্ঠানে ১০ বছরের মাথায় পেনশন পুনঃস্থাপনের ঘোষণা প্রদান করেন।
অর্থাৎ পুনঃপেনশনের আওতায় আসতে অবসর গ্রহণের পর ১০ বছর হতে হবে। সেখানে আরও বলা হয়, একজন সরকারি চাকরিজীবী শতভাগ সমর্পণ না করে মাসিক হারে পেনশন ভোগ করলে সমর্পিত পেনশনের আসল টাকা ৬.৪ বছরের মধ্যে সমন্বয় হয়। আর সুদসহ আসল টাকা ৮.১১ বছরের মাথায় সমন্বয় হয়ে যায়।
ওই চিঠিতে অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে বলা হয়, ‘আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ ৮ বছরে পেনশন পুনঃস্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছি। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো হয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যস্ফীতি। যে কারণে পেনশনভোগীদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিজীবীরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’
এ প্রসঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সরকারের অতিরিক্ত সচিব শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন থেকে উচ্চপর্যায়ে অবসরপ্রাপ্ত সব শ্রেণির সরকারি চাকরিজীবীকে আঘাত করেছে, এটি বাস্তব। আর নিচের শ্রেণির অবসর গ্রহণকারীদের অবস্থা আরও বেশি খারাপ। আমি নিজেরও দাবি-শতভাগ পেনশন যারা সমর্পণ করেছেন, তাদের ৮ বছরের মধ্যে পেনশন পুনঃস্থাপন করা হোক। এককালীন টাকা উত্তোলন করে যারা আসছেন, তাদের ৬ বছরের মধ্যে সেটি সমন্বয় হয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারের কোনো আর্থিক লোকসান হবে না।
উল্লেখ্য, বর্তমান নিয়মে একজন সরকারি চাকরিজীবী অবসর গ্রহণের সময় সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পেনশনের টাকা উত্তোলন করতে পারেন। বাকি ৫০ শতাংশ সরকারের কাছে জমা রেখে আর্থিক সুবিধা পান। চাইলে সংশ্লিষ্ট পেনশনভোগী শতভাগ টাকা তুলে নিতে পারবেন না। কিন্তু এই বিধান চালু করার আগে কয়েক লাখ সরকারি চাকরিজীবী পেনশনের পুরো টাকা তুলে নিয়ে গেছেন। পেনশনের টাকা নানাভাবে খরচ হয়ে যাওয়ায় শেষ বয়সে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাদের পেনশন থেকে আয় বন্ধ আছে। এতে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সম্প্রতি মূল্যস্ফীতি তাদের ক্রয়ক্ষমতাকে আরও নিচে নামিয়ে দিয়েছে। এছাড়া সরকার সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে অনেক পেনশনারের সঞ্চয়পত্র খাত থেকে মুনাফা আয়ের অঙ্ক কমেছে। এসব কারণেই মূলত পেনশনাররা আছেন পেরেশানে।


