ছাত্রলীগের নির্যাতন আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা

0
217

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতন আতঙ্কে দিন কাটছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের শিক্ষার্থীদের। ছাত্রলীগের নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়া, সিনিয়রদের কথা না শোনাসহ ঠুনকো নানা অভিযোগে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।

এমন নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান শান্তর অনুসারী বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, মার্চে চারটি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। ৩ মার্চ গেস্টরুমে হলের বড় ভাইদের নাম বলতে না পারায় মীর সাদ নামে দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

১০ মার্চ ক্যাম্পাসে সিগারেট খাওয়ার শাস্তিস্বরূপ মিনি গেস্টরুমে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তালিবকে ধোঁয়া না ছেড়ে সিগারেট খেতে বাধ্য করা হয়। খেতে না চাইলে তাকে স্টাম্প দিয়ে পেটায় তৃতীয় বর্ষের কয়েক শিক্ষার্থী।

একই দিন ওয়াইফাই পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা ও সিনিয়রের রুমে সিটে পা তুলে বসাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মহিদুল ইসলাম মুকুলকে ছুরি নিয়ে শাসানো হয় এবং তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।

এছাড়া ৮ মার্চ প্রোগ্রামে উপস্থিত না থাকার অভিযোগে দ্বিতীয় বর্ষের ১০ থেকে ১২ শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের রুমে ৩০১ (ক) তালা দিয়ে রাখা হয়। ফলে ওই কক্ষের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন হলে ঘুরে ঘুরে রাত কাটান তারা।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, মেহেদী হাসান শান্ত হলের সভাপতি হওয়ার পর ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল বাদে অন্য এলাকার শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। তবে আবাসিক হলের সিট হারানোর ভয়ে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন এসব শিক্ষার্থী।

এদিকে এসব ঘটনায় জড়িত অধিকাংশ নির্যাতনকারী বঙ্গবন্ধু হলের সভাপতি মেহেদী হাসান শান্তর অনুসারী হিসাবে পরিচিত। মেহেদী হাসান শান্ত বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অভিযোগের বিষয়ে মেহেদী হাসান শান্ত যুগান্তরকে বলেন, আমাদের হলে কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটেনি।

একটা পক্ষ আমাদের হলের পরিবেশকে উত্তপ্ত করার জন্য এসব মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানোর চেষ্টা করছে। টার্গেট করে ‘বিশেষ এলাকার’ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি হল সভাপতি হওয়ার আগেই আমার সঙ্গে সাতটি এলাকার মানুষ রাজনীতি করত। সেখানে বিশেষ এলাকাকে টার্গেট করার তো প্রশ্নই আসে না।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. মো. আকরাম হোসেন শুক্রবার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের গেস্টরুমে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। এখানে আমরা কোনো ধরনের নির্যাতনের ঘটনা দেখিনি। আমরা চেষ্টা করছি কোনো প্রমাণ পাই কিনা। যাদের ব্যাপারে অভিযোগ এসেছে আমরা বিষয়গুলো আরও ভালো করে দেখব।

নির্যাতিত আবু তালিবের সংবাদ সম্মেলন : শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন নির্যাতনের শিকার বঙ্গবন্ধু হলের শিক্ষার্থী আবু তালিব। তিনি বলেন, ‘১০ মার্চ রাত ১২টার পর আমাকে মিনি গেস্টরুমে ডাকা হয়। সামান্য এক ভুলের কারণে তারা (ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা) আমাকে হাতে না ধরে মুখে সিগারেট খেতে বলে। আমি মুখে নিতে না চাইলে তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। পরে ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে আমার হাতে আঘাত করে।

আবু তালিব বলেন, গেস্টরুম রাত একটায় শেষ হওয়ার পর আমি কাপড়-চোপড় গুছিয়ে হল থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে বন্ধুরা আমার জিনিসপত্র রেখে দেয়। রাতে আমি হল থেকে বাইরে চলে যাই।

পরে রাত ৩টায় বন্ধুরা আমাকে হলে নিয়ে আসে। সকালে বন্ধুদের মাধ্যমে বাঁধন ও শান্ত (অভিযুক্ত) ঘুম থেকে তুলে আমাকে বাইরে নিয়ে যায়। রাতের ঘটনা যেন বাইরের কাউকে না বলি-এ নিয়ে তারা আমাকে সতর্ক করে।

এ পর্যন্ত ২৫ জন শিক্ষার্থী নির্যাতনের মুখে হল ছেড়েছে বলে দাবি করেন আবু তালিব। হল প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ঢাবির এ শিক্ষার্থী বলেন, ভর্তি হওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আমরা যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটি এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

আমাদের নিয়মিত নির্যাতন করে, কিন্তু হল প্রশাসন দেখেও না-দেখার ভান করে। প্রভোস্ট, হাউজ টিউটর নামে মাত্র প্রশাসন। বাস্তবে তারা পুতুল, ছাত্রলীগের হাতে জিম্মি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here