আবর্জনার ভিড়ে প্রতিভাবান লেখকরা পিছিয়ে পড়ছেন

0
200

একজন লেখক হিসাবে আমার কাছে একুশের বইমেলা সারা বছরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় জায়গা। আমি বছরের অন্য সময়টা এ মেলাটির জন্য অপেক্ষায় থাকি। মনে আছে, ১৯৮৪ সাল থেকে যখন মেলা ব্যাপকভাবে শুরু হলো, তখন থেকে এমন কোনো বইমেলা নেই যেখানে আমি উপস্থিত থাকিনি।

এমন কী বিদেশে থেকেছি কিন্তু বইমেলার সময় দেশে ফিরে এসেছি। একবার মেলার সময়টাতে জাপানে একটি সাহিত্য বিষয়ক আমন্ত্রণ পেলাম। সেটি আমি পিছিয়ে দিয়েছি শুধু বইমেলার জন্য। বইমেলার প্রতি আমার আকর্ষণটা এরকম।

কিন্তু করোনার কারণে ২০২০ সালে বলতে গেলে মেলা হয়নি। আর গত বছরও যেভাবে হয়েছে তাতে আমি বইমেলায় যেতে পারিনি। কিন্তু খুব দুঃখ হয়েছে, বইমেলা হলো কিন্তু যেতে পারলাম না! তখন অবস্থাও এমন ছিল, ঘর থেকেই বের হওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু এ বছর বইমেলার জন্য ব্যাপকভাবে অপেক্ষা করেছি। যদিও বইমেলা ১৫ দিন পিছিয়ে শুরু হয়েছে আর ওদিকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত বেড়েছে। সবমিলিয়ে এবারের আয়োজন বেশ চমৎকার।

যে কদিনই বইমেলায় গিয়েছি আমার মনটা ভরে গেছে। আরেকটি কথা আমি সবসময় বলি, বইমেলার কোনো খুঁত আসলে আমার চোখে পড়ে না। আমি সবসময় বইমেলাকে বইমেলার মতোই দেখি। ধুলো উড়ছে, ঠিকভাবে মাঠে ইট বিছানো নেই, এটা-সেটা হতেই পারে। এসব নিয়ে না ভেবে বই কিভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় পাঠক-লেখক-প্রকাশক মিলে এ ভাবনাটা জোরদারভাবে করলে ভালো হয়।

লক্ষ্য করেছি, আমাদের প্রকাশকরা সবাই কিন্তু অবস্থাসম্পন্ন নন। করোনার গত দুই বছরে অনেক ছোট প্রকাশক আছেন তারা একদম ‘বসে’ গেছেন। অনেকে এবার মেলায় বই প্রকাশ করতে পারেননি, স্টল নিয়ে মেলায় অংশ নিতে পারেননি। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ জানাতে চাই, প্রকাশকদের বিষয়ে একটু বিশেষভাবে তিনি যেন চিন্তা করেন।

যারা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য সরাসরি প্রণোদনা না দিলেও ৪ থেকে ৫শ কোটি টাকার ভালো ভালো বই যদি সব প্রকাশনা থেকে কেনা হয় এবং সেগুলো বিভিন্ন স্কুল, কলেজ বা সংস্থায় দেওয়া হয় তাহলে প্রকাশকরা খুব উপকৃত হবেন। আর প্রকাশকরা উপকৃত হলে লেখকরা উপকৃত হবেন। কারণ, তারা যদি বই বিক্রি করতে না পারেন তাহলে লেখকদের রয়্যালিটি কিভাবে দেবেন।

আরেকটি বিষয় আমি গত কয়েক বছর লক্ষ্য করছি, মেলায় চার হাজার পাঁচ হাজার করে বই প্রকাশ হয়। নতুন লেখকদের বিষয়ে বরাবরই আমার আগ্রহ। আমি দেখতে চাই তারা কে কী লিখছেন। কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন লেখালেখিতে। আমি খুব দুঃখ নিয়েই বলি-এত ভুলভাবে লেখা বই বেরুচ্ছে, বাক্য শুদ্ধ হয় না, বানান ভুল। লেখার কোনো ‘ছিরি-ছাদ’ নেই এরকম প্রচুর বই বের হচ্ছে। তার ফলে যেটা হচ্ছে, যারা প্রকৃত অর্থেই ভালো লেখক, নতুন প্রতিভাবান লেখক তারা আড়ালে পড়ে যাচ্ছেন। তাদের লেখাগুলো আমরা সেভাবে পাই না। অনেক আবর্জনার ভিড়ে তারা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এতে আমাদের সাহিত্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বই প্রকাশের বিষয়টি এখন খুব সহজ হয়ে গেছে। অনেকে নিজের পকেটের টাকা দিয়েও বই প্রকাশ করছেন এবং মেলায় নিয়ে আসছেন। এ ধরনের বইয়ে বাজার ভরে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত লেখকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, মেধাবী লেখকরা পিছিয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে যেটি করণীয় তা হলো, প্রত্যেক প্রকাশকের এ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নতুন লেখকদের বই অবশ্যই তারা ছাপবেন। সাহিত্য এক জায়গায় থাকবে না, চলমান প্রক্রিয়াতে এগিয়ে যাবে।

প্রকৃত ভালো লেখকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নতুনরাও লিখবেন। তাই যে কোনো পাণ্ডুলিপিকে বই আকারে প্রকাশ করা থেকে প্রকাশকদের সরে আসতে হবে। প্রত্যেক প্রকাশনার একটি সম্পাদনা পরিষদ এখন খুব জরুরি হয়ে পড়েছ। সম্পাদকরা যে বই মনোনীত করে দেবেন সেগুলোই ছাপা হওয়া উচিত। এ বিষয়টি আসলে প্রকাশক ছাড়া আর কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

অনুলিখন : হক ফারুক আহমেদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here