বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এসকে) সুর চৌধুরী ও তার স্ত্রী সুপর্ণা সুর চৌধুরী বিনিয়োগের তথ্য গোপন করে পৌনে দুই কোটি টাকা আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন।
কর ফাঁকি দিতে তারা মেয়ে নন্দিতা সুর চৌধুরীকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছেন। মেয়ের অ্যাকাউন্টে তারা বিশাল অঙ্কের লেনদেন করেছেন।
এ ছাড়া সুপর্ণার রয়েছে সাড়ে তিন কেজির বেশি স্বর্ণ। বিভিন্ন ব্যাংকে তার অ্যাকাউন্টে নগদ অর্থ ও অর্ধকোটি টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। এত বিপুল অঙ্কের সঞ্চয়পত্র কিনলেও তার পুরোটা তিনি আয়কর রিটার্নে না দেখিয়ে কর ফাঁকি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে এসকে সুর চৌধুরীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে দুই দিন যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
পুরো ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে এসএমএস করলেও তার উত্তর দেননি। এরপর মঙ্গলবার সকালে তার ধানমন্ডির বাসায় দেখা করতে গেলে তিনি দেখা করেননি।
মূল গেটে রিসিপশন থেকে পিএবিএক্সের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রতিবেদকের পরিচয় পাওয়ার পর তিনি বলেন, ‘এখানে কী? এখানে কোনো কথা বলা যাবে না।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এসকে সুর ও তার স্ত্রী সুপর্ণার কর ফাঁকির তদন্তে নামে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংক হিসাব তলব এবং ৭ জুলাই তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। সাত মাস অনুসন্ধানের পর সিআইসি তাদের বিপুল আয়কর ফাঁকির প্রমাণ পায়।
ইতোমধ্যে কর ফাঁকি সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসে পাঠিয়ে ফাঁকি দেওয়া কর আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, করঅঞ্চল-১৫ এর ৩২২ সার্কেলের করদাতা এসকে সুর এবং তার স্ত্রী সুপর্ণা করঅঞ্চল-৫ এর করদাতা। স্বামী-স্ত্রী উভয়েই আয়কর রিটার্নে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের তথ্য গোপন করেছেন।
আয়কর রিটার্নে তারা যে পরিমাণ বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন-ব্যাংক হিসাব তলবের পর সিআইসি তার চেয়ে বেশি বিনিয়োগের হদিস পেয়েছে।
সঞ্চয়পত্রে এসকে সুরের প্রায় এক কোটি ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে। সুপর্ণার ৫০ লাখ টাকার বিনিয়োগ পাওয়া গেছে।
এমনকি আয়কর ফাঁকি দিতে তারা মেয়ের নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রিন্সিপাল শাখায় অ্যাকাউন্ট খোলেন। সেই অ্যাকাউন্টে বিপুল অর্থের লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে সিআইসি।
সিআইসির হিসাব অনুসারে, ২০১৫-১৬ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত এসকে সুর চৌধুরী সুদসহ ৮৫ লাখ টাকার বেশি আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন। সুপর্ণা সুদসহ প্রায় ৯০ লাখ টাকার বেশি আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী মিলে বিনিয়োগের তথ্য গোপন করে এক কোটি ৭৫ লাখ টাকার বেশি আয়কর ফাঁকি দিয়েছেন।
এছাড়া সুপর্ণা শুধু সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগের তথ্যই গোপন করেননি, রিটার্নে অস্বাভাবিক স্বর্ণালংকারের মালিকানার তথ্য দেন যা পরে বিক্রি হিসাবে দেখানো হলেও কর পরিশোধ করেননি। রিটার্নে সুপর্ণা সাড়ে তিন কেজি স্বর্ণালংকারের তথ্য দেন। এরপর দুই করবর্ষে তিনি তিন কেজি স্বর্ণ বিক্রির তথ্য দেন, যা সিআইসির কাছে সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুপর্ণা পেশায় গৃহিণী। অতীত ও বর্তমানে কখনোই তিনি চাকরি বা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। অথচ আয়কর নথিতে তাকে বিবিধ মালের ব্যবসায়ী হিসাবে দেখানো হয়েছে।
মূলত বিশাল অঙ্কের সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকে বৈধতা দিতে এবং এ নিয়ে সরকারি কোনো সংস্থা যাতে প্রশ্ন তুলতে না পারে সেজন্যই ব্যবসায়ী হিসাবে দেখানো হয়েছে।
এ বিষয়ে এসকে সুর চৌধুরীর সংশ্লিষ্ট সার্কেলের সহকারী করকমিশনার আবু আনছার মো. বাকি বিল্লাহ বলেন, সিআইসির পাঠানো প্রতিবেদন সদর দপ্তরে (কর কমিশনারের কার্যালয়) আছে। এখনো হাতে পাইনি। পেলে সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কর আদায়ে কঠোর নির্দেশ : ফাঁকি দেওয়া কর আদায়ে ১৪৩ ও ১৬৫ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে সিআইসির পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশের ১৪৩ ধারায় বলা হয়েছে-করদাতার অর্থ বা পণ্য বা সম্পদ জমা রয়েছে-এমন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কর আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নোটিশ দিতে পারবেন। সাধারণত এ ধরনের নোটিশ যে ব্যাংকে করদাতার অ্যাকাউন্ট রয়েছে সেই ব্যাংকে পাঠানো হয়। নোটিশে ফাঁকি দেওয়া করের সমান অর্থ ব্যাংকে গচ্ছিত থাকলে অথবা পাওনার সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকে জমা হওয়ামাত্র অথবা খেলাপকারীর অর্থ বৈধভাবে ব্যাংকের অধিকারে আসামাত্র তা এনবিআরের কোষাগারে জমা করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া ১৬৫ ধারা অনুযায়ী-ইচ্ছাকৃতভাবে রিটার্নে অসত্য তথ্য দিলে অথবা হিসাব, বিবৃতি, সার্টিফিকেট বা মিথ্যা ঘোষণা দিলে সর্বনিু তিন মাস থেকে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। এক্ষেত্রে সাধারণত কর কর্মকর্তারা অর্থদণ্ড দিয়ে থাকেন।
উল্লেখ্য, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)। এ অনিয়মে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরীর সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে।
সিএমএম আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুল হক বলেন, এসকে সুর চৌধুরীকে ‘ম্যানেজ’ করে পিকে হালদার অর্থ লোপাট করেছেন।


