আতঙ্ক এখনো তাড়া করছে রিমেলকে

0
186

ট্রাকচাপায় হিমেলের মৃত্যুর সেই দৃশ্য এখনো তাড়া করছে রায়হান প্রামাণিক রিমেলকে। ঘুমের ঘোরেও আঁতকে উঠছেন তিনি। বলেন সেই ভয়ংকর দৃশ্য ভোলার নয়।

গত মঙ্গলবার রাতে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্র মাহমুদ হাবিব হিমেলের মাথা দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়। ওই দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রায়হান প্রামাণিক রিমেল। তাৎক্ষণিকভাবে তার ডান পায়ে জরুরি অস্ত্রোপচার শেষে রিমেল শঙ্কামুক্ত হলেও আতঙ্কমুক্ত হতে পারছেন না।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, রিমেলের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। আরও কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হবে।

জানা যায়, দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন নিহত হিমেল। পেছনে বসা ছিলেন মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের চতুর্থবর্ষের শিক্ষার্থী রিমেল। তারা দু’জনই একসঙ্গে নাটক করতেন। চলাফেরাও করতেন একসঙ্গে। রিমেল বলেন, মোটরসাইকেলটি আমিই চালাচ্ছিলাম। পরে হিমেল বলেন, তুমি পেছনে বসো, আমি চালাই। হিমেলের ব্যাগটিও আমার কাছে ছিল।

ক্যান্টিনে রাতে কিছু খেয়ে ক্যাম্পাসে চক্কর দিয়ে মূল সড়কে যাই। সোহরাওয়ার্দী হলের দিক থেকে সামনের সড়ক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট বা কাজলা গেটের ব্যাংকের এটিম বুথের দিকে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বিপরীত দিক থেকে একসঙ্গে পাথর বোঝাই চারটি ট্রাক হবিবুর রহমান হলের দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসছিল পূর্বমুখী হয়ে।

রিমেল বলেন, সড়কটিতে আলো কম ছিল বলে সামনে থেকে আসা ট্রাকের তীব্র আলোতে আমরা কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না। ভয় পেয়ে আমরা আমাদের দিক থেকে সড়কের বাম পাশে খানিকটা সরে দাঁড়িয়ে যাই। ট্রাকের বাম পাশে অনেক জায়গা ছিল। ট্রাকচালক চাইলেই বাম দিকে চলে যেতে পারতেন।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি ট্রাক আমাদের মোটরসাইকেলের ওপর তুলে দেয়। হিমেলের মাথা থেকে দেহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দুর্ঘটনার সময় আমি জ্ঞান হারাইনি। আমি হিমেলকে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। এই মধ্যে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসেন ঘটনাস্থলে।

আমার ডান পায়ের জুতা কেটে নিচের অংশের মাংসপেশি বেরিয়ে গেছে। তিনি জানান, মুহূর্তেই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবেননি। ঘটনার তিন দিন পরও তিনি স্বাভাবিক হতে পারছেন না। আতঙ্ক এখনো তাকে তাড়া করে ফিরছে।

প্রশংসায় ভাসছেন রাবি উপাচার্য : রাবি প্রতিনিধি জানান, ট্রাকচাপায় হিমেলের মৃত্যুর পর ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে রাবি। ক্ষুব্ধ হয়ে নির্মাণকাজে নিয়োজিত পাঁচটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেন শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ফটকের সামনে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে রাতভর অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন।

হঠাৎ শিক্ষার্থীদের মাঝে হাজির হন রাবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপু। শিক্ষার্থীরা কয়েক দফা দাবি জানান। উপাচার্য সব দাবি শোনেন এবং আমলে নিয়ে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। শিক্ষার্থীরা প্রক্টরের গাফিলতির অভিযোগ তুলে অপসারণ দাবি করলে তিনি তা মেনে নেন এবং পরদিন নতুন প্রক্টর নিয়োগ দেন। রাত গড়িয়ে দিন শুরু হলে পুরো ক্যাম্পাসে বাতি লাগিয়ে দেন।

বুধবার সকাল পৌনে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে হিমেলের প্রথম জানাজা হয়। এতে হাজারো শিক্ষক শিক্ষার্থী অংশ নেন। এ সময় উপাচার্য বলেন, ‘সন্তান হারা বাবার পক্ষে এই মুহূর্তে কথা বলা খুব কঠিন। আমি হিমেলের মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নিচ্ছি। আজকের মধ্যেই হিমেলের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা দিচ্ছি। হিমেলের মায়ের সব ধরনের আর্থিক দায়িত্ব নেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা করা হবে। তিনি বক্তব্যে যা বলেছিলেন ইতোমধ্যেই সব বাস্তবায়ন করা হয়েছে। হিমেলের নানাবাড়িতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পাঁচ লাখ টাকার চেক তুলে দেওয়া হয় হিমেলের মায়ের হাতে। বুধবার বিকাল সাড়ে ৪টায় সাবাশ বাংলাদেশ চত্বরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনায় বসেন ভিসি।

সেখানে শিক্ষার্থীদের সব দাবি, সমস্যা ও চাহিদার কথা শোনেন। তারপর একে একে সব দাবি মেনে নিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মাঠে বসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন বর্তমান উপাচার্য। তিনি বলেন, হিমেলের পরিবারকে সহযোগিতা দেওয়ার ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীকে অবহিত করেছি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একটি বড় তহবিল দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উপাচার্যের নির্বাহী ক্ষমতা বলে প্রাথমিকভাবে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছি। হিমেলের পরিবারের খরচ বাবদ প্রতি মাসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩০-৪০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। রাবি শিক্ষার্থী আবুল হাসনাত পরশ যুগান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা খুবই জরুরি ছিল। সেটি বর্তমান উপাচার্য করেছেন। শিক্ষার্থীরা তাদের সব সমস্যা প্রাণ খুলে প্রকাশ করতে পেরেছেন।

রাবিতে হিমেল স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বালন : হিমেল স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোট। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ মিনার থেকে প্রদীপ নিয়ে শোভাযাত্রায় বের হন কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সদস্যরা। ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে শোভাযাত্রাটি শহিদ হবিবুর রহমান হলসংলগ্ন হিমেল মারা যাওয়া স্থানে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে তারা প্রদীপ রেখে শোক সমাবেশ করেন।

হিমেলের স্মরণে প্রদর্শনী : হিমেলের স্মরণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিল্পকর্ম প্রদশর্নীর আয়োজন করেছেন তার সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। শহিদ হবিবুর রহমান হলের সামনে বৃহস্পতিবার হিমেলের দুর্ঘটনাস্থলে এই আয়োজন করা হয়।

হিমেলের মৃত্যুতে সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা ভেঙে পড়েন। তার স্মৃতিকে স্মরণীয় করে রাখতে হিমেলের রেখে যাওয়া শিল্পকর্ম ও সহপাঠী সহকর্মীদের শিল্পকর্ম নিয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এটি দিনব্যাপী প্রদর্শিত হয়। হিমেল রাবির চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চতুর্থবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। থাকতেন শহিদ শামসুজ্জোহা হলের ২১২ নম্বর কক্ষে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here