গত মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে একটি আফ্রিকান বাঘ মারা যায়। বাঘটি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ছিল বলে জানিয়েছে চিকিৎসক। পার্কের অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে মারামারি ও ব্যাকটেরিয়াতে জেব্রার মৃত্যুর কথা জানালেও বাঘের মৃত্যুর কারণ ছিল অজানা।
অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে বাঘের মৃত্যু হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন ডা. এবিএম শহিদুল্লাহ। পিসিআর টেস্টে বাঘটির মৃত্যুর কারণ তীব্র ও গুরুতর সংক্রামক ওই রোগটিই বলে নিশ্চিত হন সাফারি পার্কের কর্মকর্তারা।
জেব্রা ও বাঘের মৃত্যু ঘটনা জানতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি ও ছয় সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়।
বৃহস্পতিবার বিকালে পিসিআর ল্যাবের বরাত দিয়ে বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ঢাকার কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালের সাবেক প্রধান ভেটেরিনারি অফিসার ও ঢাকা চিড়িয়াখানার সাবেক কিউরেটর ডা. এবিএম শহীদ উল্লাহ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে বাঘ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গত ১২ জানুয়ারি বাঘটির মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত পার্কের ভেতরই সম্পন্ন করা হয়। ময়নাতদন্তকালে আলামত দেখেই ওই চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে বাঘটি মৃত্যুর কারণ অ্যানথ্রাক্সে হয়েছে বলে পার্কের কর্মকর্তাদের সতর্ক হওয়ার জন্য বলেছিলেন।
বাঘের মৃত্যু প্রসঙ্গে সদ্য প্রত্যাহার হওয়া সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তবিবুর রহমান জানান, বাঘটির মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত করেছিলেন ডা. এবিএম শহীদ উল্লাহ। মৃত্যুর আলামত দেখে তিনি তখনই অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্তের বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। এরপর মৃত বাঘটির প্রথম রিপোর্টের ফলাফলে অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছিল। পরে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক পুনরায় টেস্টের জন্য বলেন। একইসঙ্গে আরটি—পিসিআর ল্যাবে পরীক্ষা করতেও পরামর্শ দেন। পরে দ্বিতীয় টেস্টেও বাঘটির মৃত্যুর কারণ অ্যানথ্রাক্স রোগই ধরা পড়ে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার পাওয়া পিসিআর ল্যাবের টেস্টেও অ্যানথ্রাক্সে শনাক্তের বিষয়টি ধরা পড়ে।
তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তকালেই দেখে অ্যানথ্রাক্স রোগে বাঘটির মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানানোর পরই তারা সর্বোচ্চ সতর্ক হয়ে যান। আর অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হয়ে বাঘের মৃত্যু হয়েছে ধরে নিয়েই তারা চামড়াসহ চিকিৎসকদের পরামর্শে মৃত বাঘটিকে গভীর গর্তে মাটিচাপা দিয়েছেন।
তথ্য গোপন রাখা সম্পর্কে তিনি বলেন, অফিসিয়ালভাবে ও পার্ক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাঘ মৃত্যুর বিষয়টি জানলেও গণমাধ্যমে বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল। অ্যানথ্রাক্স যাতে পার্কে না ছড়িয়ে পড়ে সেজন্যও তাৎক্ষণিক নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ওই সময় অ্যানথ্রাক্সে বাঘ মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে দর্শনার্থীসহ পার্ক সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াত।
যেভাবে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হতে পারে বাঘ
অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়া বিষয়ে ডা. এবিএম শহীদ উল্লাহ জানান, বিভিন্ন কারণে বিভিন্নভাবে বাঘটি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো খাদ্যে সংক্রমণের মাধ্যমে। বিদেশের পার্কগুলোতে বাঘকে ঘোড়া অথবা হরিণ খেতে দেওয়া হয়। সাফারি পার্কে বাঘকে গরু খেতে দেওয়া হয়। খাবারে ব্যবহার করা গরুটি যদি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে থাকে আর অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরুর মাংস যদি বাঘকে খাবার হিসেবে দেওয়া হয় তাহলে বাঘের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ছড়াতে পারে। শরীরের কাটাছেঁড়া অংশ দিয়ে, শ্বাস—প্রশ্বাসের মাধ্যমেও অ্যানথ্রাক্স ছড়াতে পারে। এছাড়াও সাফারি পার্কে বড় ধরনের মাছি পাওয়া যায়, ওই মাছির কামড়ে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার নজির থাকলেও বাঘটি অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার কারণটি এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
গৃহীত ব্যবস্থা
ডা. এবিএম শহীদ উল্লাহ বলেন, মৃত বাঘটিকে মাটিচাপা দেওয়ার ৭ থেকে ১০ দিন পর পাশাপাশি থাকা অন্যান্য প্রাণীদের অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এছাড়াও খাবারের সঙ্গে অ্যান্টিবায়েটিক দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, জেব্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা—নিরীক্ষা করছেন। টেস্টের চূড়ান্ত রেজাল্ট আসার পরই প্রকৃত মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। আপাতত যে পরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়া গেছে, সে মোতাবেক প্রাণীগুলোকে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।
তবে অন্য প্রাণী অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে ডা. এবিএম শহীদ উল্লাহ বলেন, মৃত বাঘটিকে অসুস্থ হওয়ার আগেই আলাদা কক্ষে আটকিয়ে রাখা হতো এবং অসুস্থ অবস্থায় নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেয়া হতো। তাই এতে কোন অন্য প্রাণীদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নাই।
বিনোদনপ্রেমীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। গত ২ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি পার্কের আফ্রিকান বেষ্টনীতে ১১টি জেব্রা ও ১২ জানুয়ারি একটি বাঘের মৃত্যু হয়।


