করোনা সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার থেকে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে সরেজমিন কোনো শাখা পরিদর্শন করা হচ্ছে না। ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো ব্যাংকিং সলিউশনের (সিবিএস) সফটওয়্যারের ভিত্তিতে এ পরিদর্শন কার্যক্রম চলবে।
তবে এভাবে কার্যক্রমের ফলে গত এক বছরে সংঘটিত ব্যাংকিং খাতের জাল-জালিয়াতির ঘটনাগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কেননা ব্যাংকিং খাতের জাল-জালিয়াতির ঘটনার প্রায় ৯৫ শতাংশই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উদ্ঘাটিত হয়। বাণিজ্যিকগুলো সব সময়ই এগুলো আড়াল করার চেষ্টা করে।
আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সরেজমিন পরিদর্শন কার্যক্রম চালাত। কিন্তু করোনার কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালে পরিদর্শন কার্যক্রমে শিথিলতা আনা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনার সময় প্রণোদনার ঋণেও নানা অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে কঠোর মনোভাব নিয়ে পরিদর্শন করে প্রকৃত ঘটনা জানা। বিশেষ পরিস্থিতিতে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান ধরে রাখার স্বার্থে যেখানে ছাড় দেওয়ার দরকার সেখানে দেওয়া হোক। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব বিষয়গুলো জানা দরকার।
তিনি আরও বলেন, ‘নীতি সহায়তায় ছাড়ের কারণে অনেক ব্যাংকই সুদ আদায় না করেই কাগুজে-কলমে আদায় করা সুদ আয় খাতে নিয়ে মুনাফা বাড়িয়েছে। সেগুলো আবার বিতরণও করবে। প্রকৃত আয় না করে টাকা বিতরণ করলে এক সময় ব্যাংকগুলো বসে পড়বে। এটা ভাবতে হবে।’
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি বছরই জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বার্ষিক পরিদর্শন কার্যক্রম শুরু করে। এতে পুরো বছরের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ঋণ বিতরণের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছে কিনা, গ্রাহকদের হিসাব পরিচালনা, সরকারি রাজস্ব আদায়সহ ব্যাংকের সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। এ পরিদর্শনেই ব্যাংকগুলোর নানা অনিয়ম উঠে আসে।
কিন্তু করোনা সংক্রমণ বাড়ায় এবার পরিদর্শন কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। পরিদর্শকরা এবার আপাতত সরেজমিন কোনো শাখায় যাবে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে পাঠানো কোর ব্যাংকিং সলিউশন (সিবিএস) সফটওয়্যারের মাধ্যমে পাঠানো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করে ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি, লাভ-লোকসানের হিসাব নিষ্পত্তি করা ও বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেওয়ার অনুমোদন দেবে। তবে শর্ত জুড়ে দেবে পরবর্তীকে কোনো অনিয়ম বা ঘাটতি ধরা পড়লে সেগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরামর্শ মতো সমাধান করতে হবে। পরিদর্শক দল প্রয়োজন মনে করলে পরবর্তীতে বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করতে পারবে।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, এবার করোনার কারণে ঋণ পরিশোধে যে ছাড় দেওয়া হয়েছিল তার মেয়াদ ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়। অর্থাৎ বিশেষ সুবিধার আওতায় ২০ জানুয়ারির মধ্যে ঋণ পরিশোধ করা গেছে। লেনদেনটি ২০ জানুয়ারি হলেও এটি ৩১ ডিসেম্বরের লেনদেন বলে গণ্য করা হবে। যে কারণে পরিদর্শন কার্যক্রম পিছিয়েছে। এছাড়া আইনের কারণে ব্যাংকগুলোর বার্ষিক সাধারণ সভা করতে হবে। এ জন্য মার্চের মধ্যেই কাজ শেষ করতে হবে।
সূত্র জানায়, বছরজুড়ে ব্যাংকগুলো যেসব লেনদেন করে তার প্রায় সবই কোর ব্যাংকিং সলিউশনের আওতায়। লেনদেনের এ সফটওয়্যারটিই পাঠিয়ে দেয় বাণিজ্যিক ব্যাংক। এগুলো পর্যালোচনা করা হয়। তবে কোনো অনিয়ম পেলে পরবর্তীতে শাখা পর্যায়ে তদন্ত করা হবে। এর মধ্যে ঋণগ্রহীতাদের ফাইল দেখা হয়। কোনো অনিয়ম থাকলে এগুলোতেই ধরা পরে। সফটওয়্যারভিত্তিক লেনদেনে তা ধরা সম্ভব নয়। করোনার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক ক্ষেত্রে নীতি সহায়তায় বড় ছাড় দিচ্ছে। এ কারণে এক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আটটি পরিদর্শন বিভাগ ও আটটি শাখা অফিস এ পরিদর্শন চালাবে। মঙ্গলবার থেকে প্রধান কার্যালয়ের ৪টি পরিদর্শন বিভাগ কাজ শুরু করে। প্রতিবারের মতো এবারও মোট ঋণের মধ্যে ৬০ শতাংশ রয়েছে এমন সব বড় শাখাগুলো তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হবে। এর মধ্যে বেশিরভাগ শাখাই ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা অঞ্চলে। কিছু শাখা অন্যান্য অঞ্চলে। এর মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্যের বেশিরভাগ শাখাই পরিদর্শনের আওতায় আসবে।
সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতে যেসব অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটে সেগুলোর ৯৫ শতাংশই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরেজমিন নিয়মিত ও বিশেষ তদন্তে উঠে আসে। ব্যাংকগুলো এসব ঘটনা আড়ালে রাখতে চায়। এমন কি খেলাপি ঋণের ঘটনাও আড়াল করে। ফলে এবারের তদন্তে বিশেষ ছাড় দেওয়ায় জাল-জালিয়াতির ঘটনা উঠে না আসার সম্ভাবনাই বেশি। কেননা ব্যাংকগুলো কোর ব্যাংকিং সলিউশনে এমনভাবে তথ্য পাঠাবে যাতে কোনো অসংগতি না থাকে।


