রাজবাড়ী সদর উপজেলায় পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়ে গড়ে তোলা অবৈধ দুটি চারকোল কারখানার (পাটখড়ির ছাই থেকে কার্বন তৈরির কারখানা) ছাই ও কালো ধোঁয়ায় মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
আর এ পরিবেশ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর। শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও হাঁপানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়োবৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ। একই কারণে কমছে ফসলি জমির উৎপাদনও।
সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজবাড়ী সদর উপজেলার শহীদ ওহাবপুর ইউনিয়নের দর্পনারায়ণপুর গ্রামে দৌলতদিয়া-কুষ্টিয়া মহাসড়কের পাশে এবং খানখানাপুর ইউনিয়নের চর খানখানাপুর গ্রামে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে পৃথক দুটি চারকোল কারখানা। এসব কারখানায় পাটখড়ির ছাই থেকে তৈরি করা কার্বন চীনে রফতানি করা হয়।
জানা গেছে, এজেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা থেকে কিনে আনা হয় পাটখড়ি। এর পর সেগুলো বিশেষ চুল্লিতে লোড করে আগুন জ্বালানো হয়। ১০-১২ ঘণ্টা জ্বালানোর পর চুল্লির মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। চুল্লি জ্বালানোর সময় কারখানা থেকে প্রচুর ধোঁয়া নির্গত হয়। এই ধোঁয়াতেই মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষিত হয়।
দর্পনারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মজিবর শেখ জানান, কার্বন তৈরির কারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়ায় আশপাশের আকাশ কালো হয়ে যায়। ধোঁয়ার কারণে রাতে ঘরে থাকা যায় না। ঘরে থাকলেও চোখ জ্বলে। দূষিত ধোঁয়ার কারণে শিশু ও বয়োবৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা ও হাঁপানিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
একই গ্রামের মো. ইমরান হোসেন জানান, ধোঁয়ার সঙ্গে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পদার্থ থাকে। এসব পদার্থ বাতাসের সঙ্গে মিশে গাছপালায় লাগে। এতে এলাকার গাছপালায় কোনো ফল হয় না। আমের মৌসুমেও গাছে মুকুলের দেখা পাওয়া যায় না। রাতে ঘরে শুয়ে থাকলে সকালে কাশির সঙ্গে ছাই বের হয়।
মো. আলম শেখ জানান, এ কারখানার কারণে আশপাশের এলাকার ফসলি জমিরও উৎপাদন কমে গেছে। কৃষকরা জমিতে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করেও ফলন বাড়তে পারছেন না। তারা চান দ্রুত এই কারখানাটি এখান থেকে অপসারণ করা হোক।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. আব্দুর রহমান যুগান্তরকে জানান, বেশি পরিমাণ কার্বন নিঃসৃত হলে বাতাসের সঙ্গে কার্বন অনুগুলো মিশে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে। এছাড়া শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হাঁপানিসহ ফুসফুসে দীর্ঘমেয়াদী রোগ এবং বিভিন্ন প্রকার চর্ম রোগের আশঙ্কা থাকে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ফরিদপুর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (ডিডি) এএইচএম রাসেদ জানান, রাজবাড়ীর কোন চারকোল কারখানারই পরিবেশ অধিদফতারের ছাড়পত্র নেই। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব চারকোল কারখানার বিরুদ্ধে দ্রুতই অভিযান চালানো হবে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মার্জিয়া সুলতানা জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছি যে কারণে চারকোল কারখানার বিষয়টি তার জানা নেই। কেউ অভিযোগ দিলে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে দর্পনারায়ণপুর গ্রামের চারকোল কারখানায় গেলে কারখানার ম্যানেজার মো. নাইম কোন কথা বলতে রাজী হননি। তিনি ঢাকায় অবস্থানরত মালিকের মোবাইল নম্বর দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মালিক আতিকুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কারখানা পরিবেশবান্ধব। আমাদের পরিবেশ অধিদপপ্তরের ছাড়পত্রও রয়েছে। তবে সেটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। দ্রুত আমরা মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবেদন করব।’
অপরদিকে চর খানখানাপুর গ্রামের চারকোল কারখানায় গেলে সেখানে কর্মরত কেউ গেট খোলেননি। মালিক ইব্রাহীম সরদারের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।


