নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তুলনা হতে পারে না। নাসিক নির্বাচনে সরকারি দলের ভালো প্রার্থী আছেন, জয়ী হওয়ার ভালো সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল।
যে কারণে নির্বাচনে সরকার কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি। আর নির্বাচনে হারলেও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হতো না। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।
কিন্তু এই নির্বাচনের অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় নির্বাচনকে বিচার করা ঠিক হবে না। জাতীয় নির্বাচনের জন্য ওই সময়ের সরকার খুব গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে এখনই ভাবতে হবে।
শনিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘সদ্যসমাপ্ত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন : জনপ্রতিনিধি নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক একটি ভার্চুয়াল সংলাপে এসব কথা বলা হয়।
সিপিডির চেয়ারম্যান প্রফেসর রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন, আওয়ামী লীগের সংসদ-সদস্য আরোমা দত্ত, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, বিএনপির সংসদ-সদস্য রুমিন ফারহানা ও নাসিকের তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী।
স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এবং সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান।
মূল প্রবন্ধে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইসি, সরকার, দল ও প্রার্থী চাইলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। নারায়ণগঞ্জে এটি হয়েছে। খুলনা বা গাজীপুরের মতো নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন এখানে হয়নি। এখানে ইভিএমে জালিয়াতি হয়েছে বলে বিশ্বাস করি না।
তবে এটা যাচাইয়ের সুযোগ নেই। এটি একটি জঘন্য ইভিএম। ইসি যা তথ্য দেবে, তাই বিশ্বাস করতে হবে। এখনকার ইসি তো প্রশ্নবিদ্ধ। এখন পর্যন্ত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা উচিত হবে না-এটি জাতিকে আরও সংকটের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, জয়ী হওয়ার মতো নিজেদের প্রার্থী থাকায় নারায়ণগঞ্জে সরকার প্রভাব বিস্তার করেনি। সুষ্ঠু নির্বাচন করায় সরকারের কোনো ঝুঁকি ছিল না। আইভীর জয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল ছিল। হারলেও সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের বার্তা দেওয়া যাবে।
নারায়ণগঞ্জে সরকার সুষ্ঠু নির্বাচনের বার্তা দিলেও জনগণ তা বিশ্বাস করবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। এমন বার্তা ২০১৩ সালেও পাঁচ সিটি নির্বাচনে সরকার দিয়েছিল। কিন্তু পরের অভিজ্ঞতা খুব খারাপ। এসব কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করা মোটেই ঠিক হবে না। জাতীয় নির্বাচকে জাতীয়ভাবেই ভাবতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনও জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে এটি দেখা গেছে। তাই সব ক্ষেত্রেই সুষ্ঠু নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে সরকারের ভূমিকা আছে। সরকারের সঙ্গে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ইসিকে যৌথভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। এজন্য এখন থেকেই কাজ করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তেব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সব ধরনের অভিযোগ ভাসিয়ে নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে বিতর্কমুক্ত নির্বাচনের আয়োজন করা সম্ভব।
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো সেলিনা হায়াৎ আইভী জয়লাভ করেছেন তার ব্যক্তিগত ইমেজ ও দলীয় ইমেজের কারণে। আমাদের নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে, অনেক অভিযোগ আছে।
তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সব অভিযোগে ভাসিয়ে নিয়েছে। নারায়ণগঞ্জে নির্বাচন হয়েছে একটি আনন্দিত পরিবেশে, নিরাপদ ব্যবস্থাপনায়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রমাণ হয় দলীয় সরকারের অধীনেও সুষ্ঠু সুন্দর নির্বাচন হওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, অর্থ, পেশিশক্তি ও ধর্মের ব্যবহার না হলে নির্বাচন যে সুষ্ঠু হয়, নারায়ণগঞ্জে সেটাই প্রমাণ হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনকে ব্যতিক্রমের মধ্যে না রেখে সব নির্বাচন এমনই হওয়া উচিত। তাহলে নির্বাচনব্যবস্থা প্রশ্নের বাইরে থাকবে।
বিএনপির সংসদ-সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, ইভিএম নিয়ে অভিযোগ আরও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। কারণ সরকারদলীয় বিজয়ী মেয়রও ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে নারায়ণগঞ্জের অভিজ্ঞতা বলছে, জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ নেই।
কেননা এটি গ্রহণযোগ্যতা ইতোমধ্যে হারিয়েছে। ইভিএমে কারচুপি যাচাই করা যায় না। এখানে কী হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, দলীয় প্রার্থীর পরাজয়ের আশঙ্কা কম থাকায় জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকার সুষ্ঠু ভোট দেখিয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচনের তুলনা করা যায় না। ইসির চেয়েও সরকার গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু চাইলে নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, নারায়ণগঞ্জে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ একতরফা জয় পেলেও কাউন্সিলর পদে একতরফা জয় পায়নি।
বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির কারণে মেয়র পদে তাদের সবার ভোট পেয়েছেন আইভী। দুই মূল দলের মেয়র প্রার্থী শক্তিশালী হওয়ায় ভোট সুষ্ঠু হয়েছে। একক প্রভাব ছিল না।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, জয়ী হওয়ার মতো নিজেদের প্রার্থী থাকায় নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে সরকারের সহযোগিতা ছিল। কোনো পক্ষ থেকে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হয়নি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যদি সরকারের এমন ভূমিকা থাকে, তাহলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে নির্বাচন করতে পারবে ইসি।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, এবারের নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন খুবই ষড়যন্ত্রমূলক ছিল। আমাকে চতুর্মুখী ষড়যন্ত্রের মধ্যে কাজ করতে হয়েছে। ষড়যন্ত্রে পড়লেও জনগণের আস্থা আর ভালোবাসার কারণে সেখান থেকে বের হতে পেরেছি।
তিনি আরও বলেন, এবারের নির্বাচন কঠিন ছিল। তিনটি মেয়র নির্বাচন করেছি। তিন নির্বাচনের ফ্লেভার তিন রকম ছিল। কোনো নির্বাচনেই ষড়যন্ত্রের বাইরে ছিলাম না। সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে নির্বাচন করেছি। যদিও আমার দল আওয়ামী লীগ সরকারে ছিল, কিন্তু প্রতিবারই বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন হয়ে সাধারণ জনগণকে আস্থায় এনে নির্বাচনে জিততে হয়েছে।
আইভী আরও বলেন, ইভিএমের কারণে ভোট কম পড়েছে-এটা সত্য। এমন নয় যে ভোটাররা ভোট দিতে আসেননি। আমার অসংখ্য ভোটার ফেরত গেছেন।
উল্লেখ্য, গত ১৬ জানুয়ারি নৌকা প্রতীকে বিপুল ভোটে জয়ী হন আইভী।


