ঢাবি শিক্ষার্থী এলমার শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন

0
166

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী এলমা চৌধুরী মেঘলার (২৪) শরীরজুড়ে অঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে তার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।

এ ঘটনায় এলমার স্বামী ইফতেখার আবেদীনকে গ্রেফতারের পর তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এর আগে বনানী থানায় মেয়ের স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়িকে আসামি করে মামলা করেন এলমার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী। এদিকে শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এলমার শিক্ষক, সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা জড়িতদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন। সেখান থেকে মৃত্যুর জন্য দায়ীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার বিকাল ৪টার দিকে বনানীতে স্বামীর বাসায় মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী এলমা।

তবে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের দাবি, এলমা আত্মহত্যা করেছেন। শুরু থেকেই নিহতের পরিবার এ দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তারা বলছে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

জানতে চাইলে বনানী থানার ওসি নূরে আযম মিয়া বুধবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, মঙ্গলবার বিকাল চারটার দিকে এলমাকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে আমরা লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠাই। বুধবার তার লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ওসি বলেন, সুরতহালে ইলমার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার এলমার বাবা সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এরপরই এলমার স্বামী ইফতেখার আবেদীনকে গ্রেফতার করা হয়। মামলায় ইফতেখার ছাড়াও তার মা শিরিন আমিন ও ইফতেখারের পালক বাবা মো. আমিনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলে এলমার সঙ্গে ইফতেখারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর ইফতেখার ও তার মা-বাবা এলমাকে পড়ালেখা বন্ধ করে দিতে বলেন। এলমা পড়া বন্ধ করতে না চাওয়ায় ইফতেখার ও তার মা-বাবা মিলে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতেন।

একপর্যায়ে তার মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়। বিয়ের তিন মাস পর ইফতেখার কানাডায় চলে যান। ১২ ডিসেম্বর ইফতেখার দেশে ফিরে আসেন। মঙ্গলবার এলমার মায়ের মোবাইল ফোনে কল করে ইফতেখার জানান, এলমা গুরুতর অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।

ঢামেক মর্গে এলমার বাবা সাইফুল ইসলাম চৌধুরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের বলেন, আমার মেয়েকে তারা নির্যাতন করে হত্যা করেছে। মেয়ের শরীরের সব জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ইফতেখারের মা ও কথিত বাবা সবাই মিলে আমার মেয়েকে মেরে ফেলেছে। তিনি বলেন, আমার মেয়ে লেখাপড়ায় অনেক ভালো ছিল। ওর আশা ছিল বিসিএস দিয়ে শিক্ষক হবে।

তিনি বলেন, হঠাৎ ইফতেখারের সঙ্গে ফেসবুকে এলমার পরিচয়। আমরা প্রথমে রাজি ছিলাম না, পরে অনেক চাপাচাপির পর রাজি হই। সে নৃত্যকলায় পড়ত। ইফতেখার ভাবত এলমার চলাফেরা অনেক খারাপ। সে এলমার চুল কেটে ছোট করে হিজাব পরাতে শুরু করে। বিয়ের দিন থেকে ইফতেখার আমার মেয়েকে নির্যাতন করত। অত্যাচার থেকে বাঁচতে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় এলমা। আমরা জানতাম ইফতাখারের বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার। পরে জানি এটা তার আসল বাবা নয়। তার মা ওই সেনা অফিসারকে ২য় বিয়ে করেছেন। আমাদের কাছে তারা সবকিছু লুকিয়েছে। ইফতেখার ফ্রান্সে একটি বিয়ে করেছিল। সেই ঘরে একটা সন্তান আছে। পরে তাকে ডিভোর্স দিয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করেছে। এটা পরে জানতে পেরেছি।

সাইফুল চৌধুরী আরও বলেন, ১২ ডিসেম্বর ইফতেখার দেশে এসেছে সেটা আমরা জানতাম না। এলমার মোবাইলে সব সময় চেক করত সে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত কিনা। আমার মেয়ে আমাকে বলেছে সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা। কিন্তু কোথায় ঠিক হলো শেষ পর্যন্ত তারা আমার মেয়েকে নির্যাতন করে মেরেই ফেলল। তারা অনেক শক্তিশালী। আমরা তাদের সঙ্গে পারব কিনা জানি না।

স্বামী ইফতেখার রিমান্ডে : ইফতেখার আবেদীনকে গ্রেফতারের পর বুধবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর হত্যা মামলাটি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে ৭ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

বিচার দাবিতে ঢাবিতে শিক্ষক-সহপাঠীদের মানববন্ধন : এলমা চৌধুরীর মৃত্যুকে অস্বাভাবিক ও হত্যাকাণ্ড দাবি করে তার সহপাঠী ও শিক্ষকরা বুধবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানববন্ধন করেছেন। মাবববন্ধনে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং বিচার দাবি করেন তারা। পরিবারের পাশাপাশি সহপাঠীরা ও শিক্ষকরা এটিকে হত্যা দাবি করেছেন।

মানববন্ধনে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূঁইয়া, প্রক্টর অধ্যাপক একেএম গোলাম রব্বানী, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন, নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক রেজওয়ানা চৌধুরী, সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শামীম বানুসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক এবং এলমার সহপাঠীরা উপস্থিত ছিলেন।

অধ্যাপক রেজওয়ান চৌধুরী বলেন, আমাদের ছাত্রী, আমাদের মেয়ে এলমার এ মৃত্যু স্বাভাবিক হতে পারে না। স্বাভাবিক হলে শরীরে এত দাগ হবে কেন? হাসপাতালে যাওয়ার পর তার এই দৃশ্যটা দেখে আমি মানতে পারছি না। তার স্বামীকে দেখেও মনে হয়েছে অস্বাভাবিক এবং কথাবার্তা অসংলগ্ন। আমার বিভাগের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত বিচার দাবি করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here