শূন্যস্থান কখনো পূরণ হয় না

0
364

কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ। এ কান্না ছেলের মৃত্যুশোকের সঙ্গে একরকম আনন্দেরও। কারণ ছেলের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হলো।

বুধবার দুপুরে এমন দৃশ্য দেখা যায় পুরান ঢাকার নিু আদালত প্রাঙ্গণে। ওই সময় বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার পর আসামি ও তাদের স্বজনদের অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়।

অন্যদিকে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন মামলার বাদী আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ। তার চোখ দিয়ে ঝরছিল জল। তিনি দুই বছরের অধিক সময় আদালত প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়িয়েছেন। কুষ্টিয়া থেকে ভোরে ঢাকায় আসতেন-যেতেন মধ্যরাতে। খেয়ে না-খেয়ে ছেলে হত্যার বিচার চেয়েছেন। রায় শেষে আবরারের বাবার সঙ্গে কথা হয় যুগান্তরের।

পাশাপাশি তারই (বরকত উল্লাহ) মোবাইল ফোন দিয়ে গ্রামে (কুষ্টিয়ায়) অবস্থান করা আবরারের মায়ের সঙ্গেও কথা হয় ৫ মিনিট ৩ সেকেন্ড। দুজনই প্রায় একই সুরে বলছিলেন-‘রায় এসেছে, হয়তো সেটি কার্যকরও হবে। কিন্তু আমাদের বুকের ধন কি কখনো ফিরে আসবে। আমাদের শূন্যবুক, শূন্যস্থান কি কখনো পূরণ হবে?’

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর একটি কালোদিন-কালো অধ্যায়। ওইদিন বুয়েটের শেরে-বাংলা হলে মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ছেলের মৃত্যুশোক আজও মা-বাবাকে স্তব্ধ করে। বুধবার ভোরেই আদালতে বাবার সঙ্গে আবরার ছোট ভাই মনিরুল ইসলামও উপস্থিত ছিলেন।

দুপুর পৌনে ২টার দিকে আবরারের বাবা কান্না জড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘অনেক তো বলছি, প্রায় দু’বছর ধরে বলেই আসছি। বিচারের জন্য গ্রাম থেকে রাজধানীতে আসি ভোরে, আবার মধ্যরাতে গ্রামে ফিরি। আজ রায় হয়েছে। এ রায়ের জন্য খেয়ে না-খেয়ে কতবার যে আদালতে ঘুরেছি, এ হিসাব নেই। এখন আর কাঁদতে পারি না। বুকে ব্যথা হয়। শ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। অনেক কষ্ট করেই বড় ছেলে আবরারকে পড়িয়েছিলাম।’

সন্তানহারা বাবার আর্জি-‘খুনিরা আমার বুকের ধনকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। আমি জানি, আমার বাবা কত ভালো মানুষ ছিল। মাথা নিচু করে হাঁটতেন। এমন কোনো কাজ করতেন না, যার জন্য মানুষ তাকে মন্দ বলবে। পড়াশোনা শেষে দেশের বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। উচ্চ শিক্ষা করে দেশে ফিরে-দেশের উন্নয়ন করবে। কিন্তু কী নির্মম-আমার সেই ছেলেকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সে বার বার পানি খেতে চেয়েছিল, দেওয়া হয়নি।’ বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন এ বাবা। বললেন, ‘ আমি যখন পানি খাই, মনে হয় বাবা (আবরার) পানি চাচ্ছে…।’

আবরারের বাবার সঙ্গে এই প্রতিবেদক যখন কথা বলছিল, ওই সময় আদালত ভবনের নিচে, প্রিজন ভ্যান ঘিরে আসামি, আসামিদের স্বজনরা কান্না করছিল। আসামিরা শুধু চিৎকার করছিল। এমনটা দেখে আবরারের বাবা বলছিলেন, ‘আমার বাবা হয়তো কান্নাও করতে পারেনি। বুকের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। আজ তারা কাঁদছে, স্বজনরা কাঁদছে। আর আমরা দীর্ঘ দুই বছর ধরে কেঁদে যাচ্ছি। ফাঁসির রায় কার্যকর হলে তাদের অভিভাবকরাও বুঝবে, শূন্যবুক কীভাবে হাহাকার করে। সন্তান হারানোর ব্যথা কী। কেমন লাগে। আমি জানি, সন্তান হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে ক্ষতিপূরণ কিংবা আসামিদের ফাঁসির কোনো অঙ্কই যে মেলে না। যাদের ফাঁসি হবে, তাদের অভিভাবকরাও আমাদের মতো কাঁদবে-যন্ত্রণায় ভুগবে।’

আর যেন কোনো সন্তান খুন না হয়, খুনের দায়ে কারও ফাঁসি না হয়-এমন আকুতি জানিয়ে বরকত উল্লাহ বললেন, ‘এ রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। রায় কার্যকর হলেই আমার বাবা (আবরার) শান্তি পাবে। এমন বর্বর হত্যাকাণ্ড ঘটাতে কেউ সাহস পাবে না। রাজনৈতিক দল প্রধান-নেতাদের কাছে অনুরোধ, শিক্ষার্থীদের হত্যাকারী বানাবেন না। হিংস্র-বর্বর হতে সহযোগিতা করবেন না। হিংস্ররা মুহূর্তের মধ্যেই মানুষকে হত্যা করে। রাজনৈতিক শক্তি হত্যার জন্য হতে পারে না, উন্নয়ন-সভ্যতার জন্যই হতে হবে। নতুন করে সন্তান হারানোর তালিকায় আর যেন কোনো মা-বাবার নাম না ওঠে।’

দুপুর ২টা ৩ মিনিটে আবরারের মা রোকেয়া বেগমের (৫৭) সঙ্গে মোবাইল ফোনে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। কলটি রিসিভ করলেই কানে ভেসে আসে কান্না। নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলতেই বললেন, ‘আমার বাবাকে আমি ভুলি না, চোখের সামনে ভেসে আসে সব। এখন নিজেকে অপরাধীও মনে হয়, বাবাকে যদি ঢাকায় না পাঠাতাম হয়তো বেঁচে যেত। আমি নিজ হাতে বাবাকে বুয়েটে ভর্তি করিয়েছি। দিনের পর দিন বাবার সঙ্গে ঢাকায় ঘুরেছি। আমার আশা-আসামিদের ফাঁসি এবং যাবজ্জীবন দ্রুত কার্যকর হবে। আমি ভাবছি, যাদের ফাঁসি হবে, তাদের অভিভাবকদের কথা। কোনো বাবাই চায় না সন্তান সন্ত্রাসী হোক, কাউকে খুন করুক। কেউ না কেউ তাদের সন্ত্রাসী বানায়, খুন করতে সাহস দেয়। তারা কারা?’

রোকেয়া বেগম আরও জানান, আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেছি। ছেলেকে বুয়েটে ভর্তি করাতে ঢাকায় থাকতে হয়েছে। কিন্তু যে দিন আবরারের লাশ গ্রামের বাড়িতে এলো-সেই দিনের পর থেকে আর কোনো দিন ঢাকায় যাইনি। আবরারের বয়স যখন ১৩ দিন, তখন আমার বিসিএস পরীক্ষা ছিল। ছেলেকে কার কাছে রেখে যাব, তার বাবা ব্যাংকে চাকরি করতেন। সেই পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। কিছুদিন পর সিলেটে একটি ভালো চাকরি হয়।

কিন্তু ছেলের জন্য চাকরিতেও যোগদান করিনি। আমার বয়স যখন ৩ বছর ৭ মাস তখন আমরা বাবা মারা যান। বাবার মুখ আমি স্মরণ করতে পারিনি। যখন আবরার আমার কোল জুড়ে এলো, সেই দিন থেকেই মনে হয়েছে, আবার আমার বাবার কাছে ফিরে এসেছে। বাবা বলেই তাকে ডাকতাম। সেই বাবাকেও খুন করা হয়েছে, আমার বুক শূন্য করে দেওয়া হয়েছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন এ মা।

তিনি আরও বললেন, ‘আমার ছেলের হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা অমিত শাহ। সে হত্যাকাণ্ডের সময় ঘটনাস্থলে না থাকলেও মোবাইলের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সমস্ত পরিকল্পনা করেন।

এদিকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত আবরারের বাবা আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলায় হাঁটছিলেন। তার সঙ্গে তার ভাই, শ্যালক ও বোনের মেয়ে ছিলেন। চাচা মনিরুল ইসলাম বললেন, ‘আবরারকে সে স্কুলে নিয়ে যেতেন। কোলেপিঠে করে বড় করেছিলেন।’

মামা মোফাজ্জেল হোসেন বলল, ‘সে ছিল আমাদের আলোকরশ্মি। যেমন মেধাবী-তেমনি ভদ্র। সেই প্রিয় ভাগ্নেকেই নির্মমভাবে খুন করা হলো।’ ফুফুতো বোন আফরিদা তানজীনার ভাষ্য, ‘আবরার তার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। এক সঙ্গে খেলা করতেন। তাদের বোন নেই-আপন বোন হিসেবেই দেখতেন-মানতেন। সেই ভাইটাকে কেড়ে নিল সন্ত্রাসীরা।’

এদিকে আসামিদের বেশ কয়েকজন স্বজনদের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত এক আসামির বড় ভাই বললেন, তার ভাই সোজা-সাপ্টা মানুষ ছিল। বুয়েটে ভর্তির আগেও কোনো রাজনীতি করত না। রাজনীতির নামে কারা তাদের ক্ষমতাবান করে তোলে। কারা তাদের ব্যবহার করে। ফাঁসির আরেক আসামির বৃদ্ধ মা ছেলের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন।

নাম জানতে চাইলে, পাশে থাকা এক যুবক প্রতিনিধিকে ধাক্কা দেয়। প্রিজন ভ্যানে থাকা ওই আসামি চিৎকার দিয়ে বলছিলেন, তার কোনো অপরাধ নেই। সে অপরাধে সম্পৃক্ত নয়। যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত ইসতিয়াক হোসেনের মা কুলসুমা-আরা বেগম ছেলের জন্য কাঁদছিলেন। জানালেন, তার ছেলে ভালো মানুষ। কিন্তু ছেলে কেন ফাঁসল। কে তাদের হিংস্র করল।’ মিডিয়া কর্মীদের কাছে প্রশ্ন রাখেন এ মা…।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here