নীরব ঘাতক প্রতিরোধে খাবার

0
323

ডায়েটিশিয়ান অ্যান্ড ইন-চার্জ, পারসোনা হেলথ

ধানমণ্ডি, ঢাকা।

নারীদের যেসব ধরনের ক্যান্সার হয় তার মধ্যে স্তন ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিভিন্ন ক্যান্সারে প্রায় ২ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়। এ সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর বিশ্বজুয়ে নারীর স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হারও বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজারের বেশি মানুষ ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এদের মধ্যে ৯৮ শতাংশের বেশি নারী, তবে খুব অল্প সংখ্যক পুরুষও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। এদের মাঝে প্রায় ৭০ ভাগ নারী চিকিৎসার অভাবে স্তন ক্যান্সারে মারা যান। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ রোগ নির্ণয় ও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব উপযুক্ত চিকিৎসায় স্তন ক্যান্সার নিরাময়ের সম্ভাবনা প্রায় ১০০ ভাগ। ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, জেনেটিক পরিবর্তনের কারণ, বংশগত কারণ, অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যাওয়া, বেশি বয়সে সন্তান ধারণ, সন্তানদের দুধপান না করানো, বন্ধ্যাত্বসহ আরও কিছু কারণে নারীদের স্তন ক্যান্সার হয়ে থাকে। এ ছাড়া জীবন-যাপনের ধারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য। অধিক চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, বেশি পরিমাণ প্রসেস খাবার খাওয়া, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস অ্যালকোহল গ্রহণ, ধূমপান ও শরীরচর্চার অভাব এ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই খাদ্য তালিকায় স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধক খাবার যুক্ত করলে এই নীরব ঘাতকব্যাধি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

শস্যজাতীয় খাবার

গোটা শস্যদানা, যেমন লাল চাল, ওটস, বার্লি বা কর্নে আছে প্রচুর আঁশ ও ম্যাগনেসিয়াম। এগুলোও ক্যানসার প্রতিরোধ করে। এ ছাড়া এগুলোতে থাকে ভিটামিন বি. কমপ্লেক্স, কার্বোহাইড্রেট ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট-যা গ্রহণের ফলে স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ হয় ও শরীরে বিপুল শক্তি পাওয়া যায়।

হলুদ, সবুজ ও কমলা রঙের শাকসবজি

প্রচুর পরিমাণে আঁশযুক্ত খাবার খেলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমে। যা পরিপাক ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে, বর্জ্য নিঃসরণ ও কোষ্ঠ পরিষ্কারে ভূমিকা রাখে। এতে থাকে ফাইটোকেমিক্যাল ক্যারোটিনয়েডস। যেমন বিট, গাজর, মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টি আলু, পালংশাক, টমেটো ইত্যাদি।

মাশরুম

মাশরুমে রয়েছে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির দুটি বিশেষ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান এরগোথিয়োনেইন এবং সেলেনিয়াম। এ হরমোনগুলো ক্যান্সার এবং কার্ডিওভাস্কুলার রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

অ্যালিয়ামযুক্ত সবজি

ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপাদান ‘অ্যালিয়াম উচ্চমাত্রায় থাকে রসুনে, পেঁয়াজে এবং লিকে। এগুলোতে থাকা অ্যালায়াল সালফার এবং অন্যান্য উপাদান টিউমার কোষের বৃদ্ধি প্রতিরোধ করতে, কোলোরেক্টাল ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

ক্রুসিফেরাস জাতীয় সবজি

ব্রকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি ইত্যাদিতে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এ ছাড়া এসব সবজিতে গ্লুকোসিনোলেট নামের যৌগও থাকে। এগুলো ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক। বাঁধাকপিতে থাকা প্ল্যান্ট কম্পাউন্ড স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। ব্রকলিতে উচ্চমাত্রায় সালফোরোফেন ও ইন্ডোলেস উপাদান, যা ক্যান্সারের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। সালফোরোফেন শরীরে নিজস্ব ক্যান্সার প্রতিরোধী এনজাইম উদ্দীপ্ত করতে সাহায্য করে। এতে ব্রেস্ট ও প্রোস্টেট ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি রোধ হয়।

হার্বস

হলুদ, মরিচ, আদা, কালোজিরা, অরিগেনো, পার্সলে পাতা এগুলোতে থাকে ভিটামিন, ফ্যাটি এসিড এবং পলিফেনল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। মরিচে থাকা ফাইটোকেমিক্যাল, হলুদে কারকিউমিন, আদাতে থাকা উচ্চ ফাইবারযুক্ত অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট স্তন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার উপাদান।

টক ও বেরি ফল

বেরি জাতীয় ফল (ব্লুবেরি, স্ট্রবেরি, ব্ল্যাক বেরি, রাস্পবেরি) নিয়মিত খেলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। এতে থাকা ভিটামিন সি, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান-ফ্লাভোনয়েড ও অ্যান্টোসায়ানিনস ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ও বিস্তার প্রতিহত করতে এবং এটি সিস্ট ধ্বংস করতে সক্ষম।

রঙিন ফল

স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে ডালিম বিশেষভাবে সহায়তা করে। এ ছাড়া আপেল, পিচ, অ্যাভোকাডো, নাসপাতিতে থাকা পলিফেনল এবং এলাইডিক অ্যাসিড নামের উচ্চমানের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। যা ক্যান্সারের বৃদ্ধি প্রতিরোধে সাহায্য করে।

সামুদ্রিক মাছ

সামুদ্রিক মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড যা ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন সামুদ্রিক মাছ খেলে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। ওমেগা-থ্রি এবং ভিটামিন বি-টুয়েলভ, ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ যা শরীরের পুষ্টি সরবারহ করে এবং কোষের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।

অলিভ অয়েল

অলিভ অয়েলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট আছে। এটি ব্রেস্ট টিউমারের বৃদ্ধি রোধ করে ও স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।

ভিটামিন ডি

গবেষণায় ভিটামিন ডি-এর অভাবের সঙ্গে স্তন ক্যানসারের একটি সম্পর্ক থাকতে পারে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সূর্যের আলো থেকে ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। এ ছাড়া ডিমের কুসুম, হেরিং মাছ, সার্ডিন মাছ, স্যামন, ভিটামিন ডি ফরটিফায়েড কমলার রস, টক দইয়ে এ ভিটামিন থাকে।

গ্রিনটি, ব্ল্যাক কফি

এগুলোতে ক্যাটেচিন নামক উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে যা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।

প্রোবায়োটিকযুক্ত ফার্মেন্টেড ফুড

বাসার তৈরি টকদইতে অতি উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, প্রোবায়োটিক আছে এবং এটি সহজেই হজমে সাহায্য করে যা স্তন ক্যান্সারের জন্য উপকারী।

ডিম

ডিমের প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম দেহের জন্য অনেক উপকারী। এতে ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ যুক্ত ফ্যাটি এসিড আছে যা স্তন ক্যান্সার প্রতিরোধে ডিমের অনেক বড় ভূমিকা আছে। মিষ্টি ও চিনিযুক্ত খাবার, উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার, ট্রান্স ফ্যাট, অ্যালকোহল, ফাস্ট ফুড ও লাল মাংস যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। যারা নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস করেন তাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কম। তাই নিজেদের খাদ্য তালিকায় উপরোক্ত খাবারগুলো রাখলে ও সুস্থ জীবন ব্যবস্থা মেনে চলতে পারলে স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here