বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল একটি জয় নিয়ে দেশে ফেরা। অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য ছিল বড় ব্যবধানে জিতে নেট রান রেটে দক্ষিণ আফ্রিকাকে টপকে সেমিতে ওঠার লড়াইয়ে এগিয়ে যাওয়া।
লক্ষ্য অর্জনে অস্ট্রেলিয়া পুরোপুরি সফল, বাংলাদেশ ব্যর্থ। বিভীষিকাময় হারে ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করে শেষ হলো বাংলাদেশের দুঃস্বপ্নের বিশ্বকাপ।
সুপার টুয়েলভে পাঁচ ম্যাচের পাঁচটিতেই হেরে মাহমুদউল্লাহরা আজ দেশে ফিরছেন খালি হাতেই। নিঃস্ব-রিক্ত হয়ে। আসরজুড়েই জঘন্য ব্যাটিং প্রদর্শনীতে নিজেদের সামর্থ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বাংলাদেশের ব্যাটাররা সবচেয়ে খারাপটা যেন তুলে রেখেছিলেন শেষ ম্যাচের জন্য। দুবাইয়ে কাল ব্যাটিং-সহায়ক উইকেটেও মাত্র ৭৩ রানে অলআউট হয়ে বাংলাদেশ হেরেছে আট উইকেটে।
৪০ ওভারের ম্যাচ শেষ ২১.২ ওভারেই! ১৫ ওভারে বাংলাদেশকে অলআউট করার পর ৭৪ রানের মামুলি লক্ষ্য ছুঁতে অস্ট্রেলিয়ার লাগে মাত্র ৬.২ ওভার। ডেভিড ওয়ার্নার ১৪ বলে ১৮ ও অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ ২০ বলে ৪০ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলে ফেরার পর তাসকিনের বলে বিশাল ছক্কায় জয়ের আনুষ্ঠানিকতা সারেন মিচেল মার্শ (পাঁচ বলে ১৬*)।
এই ম্যাচ থেকে যা চাওয়ার ছিল, বাংলাদেশকে ব্যাটে-বলে গুঁড়িয়ে এর প্রায় সবই পেয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ৮২ বল হাতে রেখে জেতায় তাদের রান রেট অনেক বেড়ে গেছে। চার ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার সমান ছয় পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়া।
১৯ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছেন অসি স্পিনার অ্যাডাম জাম্পা। বিশ্বকাপের আগে মিরপুরের স্পিন মঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় সারির দলের বিপক্ষে ৪-১ ব্যবধানে টি ২০ সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। দুবাইয়ের স্পোর্টিং উইকেটে মাহমুদউল্লাহদের নিয়ে ছেলেখেলা করে অস্ট্রেলিয়া যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ প্রস্তুতিতে কতটা গলদ ছিল।
বাংলাদেশের ক্ষতি যা করার, পাওয়ার প্লেতে করেন অসি পেসাররা। এ সময়ই বাংলাদেশ চার উইকেট হারায় মাত্র ৩৩ রানে। পরে জাম্পা এসে বাংলাদেশের ব্যাটিং অর্ডারে ছুরি চালান। সত্যি বলতে কী, এই ম্যাচে মাহমুদউল্লাহরা তাদের ব্যাটিং নিয়ে বেশিকিছু বলার অবকাশই রাখেননি। ২০২১-এ এসে ৭৩ রানে গুটিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। বাংলাদেশের ব্যাটাররা একেকজন বাইশ গজে এসেছেন নিজেদের ছায়া হয়ে। যেন মৃত্যুর পথের যাত্রী তারা।
ফিরেও গেছেন একইভাবে। জাম্পার অফ-স্টাম্পের বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে শরীফুল ফিঞ্চের গ্লাভসবন্দি হয়ে মিছিলের শেষভাগে যখন শামিল হন, তখনও ইনিংসের ৩০ বল বাকি। শরীফুলের উইকেট জাম্পার পঞ্চম, যা টি ২০ বিশ্বকাপে কোনো অসি বোলারের সেরা বোলিং ফিগার।
জাম্পার জন্যই যেন চোখের পলকে শেষ হয়ে গেল বাংলাদেশের ইনিংস। যেন দেশে ফেরার আগে শপিং করার জন্য ভীষণ তাড়া ছিল বাংলাদেশের ব্যাটারদের। দুবাইয়ে শপিংমলের অভাব নেই। সাততাড়াতাড়ি খেলা শেষ করে মুশফিকুররা কেনাকাটার জন্য ছুটবেন, সেজন্যই কি এই আত্মাহুতি?
বাংলাদেশের বিবর্ণ ব্যাটিংয়ের শুরু প্রথম ওভারেই। ইনিংসের তৃতীয় বলে বোল্ড লিটন দাস। মিচেল স্টার্কের ঘণ্টায় ১৪৪ কিলোমিটার বেগের ডেলিভারি বাংলাদেশি ওপেনারের লেগ স্টাম্প উড়িয়ে দেয়। এমন বীভৎস সূচনা থেকে কোনো শিক্ষাই নেননি সৌম্য সরকার। হ্যাজলউডের নিরীহ গোছের বল টেনে আনেন নিজের স্টাম্পে। দুবাইয়ের দুপুরেই বাংলাদেশ শিবিরে যেন সন্ধ্যা নামে। মুশফিকুর রহিম লেগ বিফোর হওয়ার পর রিভিউ নেওয়ারই প্রয়োজন বোধ করেননি। ম্যাক্সওয়েল তাকে সাজঘরের পথ দেখিয়ে দেন।
বাংলাদেশের যে তিনজন ব্যাটার দুই অঙ্কের রান করেছেন তাদের অন্যতম মোহাম্মদ নাঈম স্কয়ার লেগে কামিন্সকে ক্যাচ দেন হ্যাজলউডের বলে। বাংলাদেশ চতুর্থ উইকেট হারায় ৩২ রানে। আফিফ হোসেনকে তুলে নেন জাম্পা। স্লিপে ক্যাচ নেন ফিঞ্চ। মিরপুরের উইকেটে যে ওষুধ প্রয়োগ করে অসিদের ঘুম পাড়িয়েছিল, সেই একই ওধুধে এবার কাজ হলো উলটোভাবে।
দুই অঙ্কের রান করা আরেক বাংলাদেশি ব্যাটার শামীম হোসেন ধরা পড়েন উইকেটের পেছনে। কাট করতে গিয়ে ধরাশায়ী হন শামীম। ব্যাটের কানায় লেগে বল ওয়েডের গ্লাভসে। শিকারি সেই জাম্পা। পরের বলে আউট মেহেদী হাসান। তার গোল্ডেন ডাকে তৃতীয় উইকেট পেয়ে যান জাম্পা। অধিনায়ক হিসাবে মাহমুদউল্লাহর দায়িত্ব ছিল ঠান্ডামাথায় খেলে পুরো ২০ ওভার শেষ করা। তিনি সেই উদাহরণ তৈরি করতে ব্যর্থ। স্টার্কের বলে ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে। ১৮ বলে ১৬ রান তার সামান্য পুঁজি।
জাম্পা তার পরের ওভারের প্রথম বলে হ্যাটট্রিক পেয়ে যেতেন। যদি তাসকিনের ক্যাচ ওয়েড ফেলে না দিতেন। মোস্তাফিজকে নিজের চতুর্থ শিকার বানিয়ে সেই খেদ মেটান জাম্পা। আর শরীফুলকে ফিঞ্চের ক্যাচ বানিয়ে পূর্ণ করেন পাঁচ উইকেট। বাংলাদেশ এ নিয়ে টানা দ্বিতীয়বার ১০০’র কম রানে অলআউট হলো। আগের ম্যাচে ৮৪ রানে অলআউট হয়েছিল তারা দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে।


