সম্প্রীতির আলোয় উদ্ভাসিত হোক প্রিয় বাংলাদেশ

0
369

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আবহমানকাল থেকে বাংলা ভূখণ্ডে নানা জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্ম মতের অনুসারীরা পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে মিলেমিশে একত্রে বসবাসের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য সংহত রেখেছে।

যার যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে এটাই ধর্মের শিক্ষা। মহাবিশ্বের স্রষ্টা ও মালিক এক। তার ধর্মও এক ও অভিন্ন। তার সব সৃষ্টির মাঝে মানুষ সর্বোৎকৃষ্ট। তার এ শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি যেন নিজেদের মাঝে সাম্য, একতা, মানবতা এবং সহমর্মিতা প্রকাশের মাধ্যমে সহাবস্থানে বসবাস করেন এ শিক্ষাই সৃষ্টিকর্তা দিয়েছেন।

ধর্মে এক ধর্মাবলম্বী অন্য ধর্মাবলম্বীকে সম্মান করার আদেশ বিদ্যমান। কোনো ধর্মই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বা জঙ্গিবাদের শিক্ষা দেয়নি। প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে। ধর্মপালন কিংবা বর্জন ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন-‘তুমি বল, তোমার প্রতিপালক প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য প্রেরিত, অতএব যার ইচ্ছা সে ইমান আনুক, আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সূরা কাহাফ : ৩০)।

অথচ আজ সারা বিশ্বে চলছে ধর্মের নামে অধর্মের কাজ। মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি, হানাহানি এবং যুদ্ধবিগ্রহ। এক ধর্মাবলম্বী অপর ধর্মাবলম্বীকে হত্যার প্রয়াস। এক জাতিগোষ্ঠী অপর জাতির ওপর আক্রমণ। সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার।

মানবতার কবি, অসাম্প্রদায়িক কবি কাজী নজরুল যিনি জাতি ধর্ম, বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে ছিলেন। তাই তো তিনি লিখেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,/যেখানে মিশেছে হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলিম, খ্রিষ্টান।’ তিনি লিখেছিলেন ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই নহে কিছু মহীয়ান/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,/সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’

আমাদের এই দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ, এখানে কোনোরূপ সন্ত্রাস ও জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত কোনো অপশক্তির স্থান নেই। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্মের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দৃষ্টান্তই আমরা লক্ষ করে আসছি।

আসলে কে কোন ধর্মের অনুসারী তা মূল বিষয় নয়, বিষয় হলো আমরা সবাই মানুষ। মানুষ হিসাবে আমরা সবাই এক জাতি। আমার ধর্মের সঙ্গে, আমার মতের সঙ্গে আরেকজন একমত নাও হতে পারে, তাই বলে কি তার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট করব?

মহানবী (সা.) মানুষকে ভালোবাসা দিয়ে ইসলাম প্রচার করেছেন। অথচ বিরোধী মক্কাবাসীরা তার (সা.) এবং তার (সা.) অনুসারীদের ওপর কতই না নির্মম অত্যাচার করেছে। এর প্রতিবাদে তিনি (সা.) যুদ্ধে জড়িত হননি।

অত্যাচারের সীমা যখন ছাড়িয়ে যায় তখন তিনি (সা.) মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে যান। তারপরও মক্কার সেই বিরোধীরা মদিনায় গিয়ে আক্রমণ করে। তখন তিনি (সা.) আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে নির্দেশিত হন-‘যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে তাদেরকে (আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করার) অনুমতি দেওয়া হলো। কারণ তাদের ওপর জুলুম করা হচ্ছে’ (সূরা হাজ : ৪০)।

ফলে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করা হয়। নিজেদের অস্তিত্বকে রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেন। তবে বিপক্ষে যুদ্ধে জড়িত নয় কিংবা বৃদ্ধ, নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়নি। এমনকি মক্কা বিজয়ের পর সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.) সব ধর্মের অনুসারীদের নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী ধর্ম কর্ম পালনের শিক্ষা দিয়েছেন। মহানবী (সা.) বলেন-জেনে রাখ, যে ব্যক্তি কোনো অঙ্গীকারাবদ্ধ অমুসলমানের ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, তার ওপর সাধ্যাতীত কোনো কিছু চাপিয়ে দেবে বা তার অনুমতি ছাড়া তার

কোনো বস্তু নিয়ে নেবে আমি পরকালে বিচার দিবসে তার বিপক্ষে অবস্থান করব (আবু দাউদ)। অমুসলমানদের উপাসনালয়ে হামলা ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। শুধু তা-ই নয় অমুসলমানরা যেগুলোর উপাসনা করে সেগুলোকেও গালমন্দ করতেও বারণ করা হয়েছে।

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-‘তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, যাদের তারা আল্লাহকে ছেড়ে উপাস্য রূপে ডাকে, নতুবা তারা অজ্ঞতার কারণে শত্রুতাবশত আল্লাহকে গালি দেবে (সূরা আনআম : ১০৯)।

ফলে ইসলাম সব ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এক সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টির ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে। কাজেই ধর্মীয় উন্মাদনায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপে মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্য কোনো স্থাপনা ভাঙা ও জ্বালিয়ে দেওয়া এবং নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ করা বা হত্যা করা কোনো ধর্মীয় কাজ নয়।

মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে সবাইকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! সাবধান, তোমরা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। কেন না তোমাদের পূর্বের জাতিগুলো ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে’ (ইবনে মাজা)। আমাদের দেশে প্রাচীনকাল থেকে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান এবং বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থানে বসবাস করে আসছে।

তাই এ দেশে যারা ধর্মকে পুঁজি করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা প্রতিহত করতে হবে। আমরা আশা করব এ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না। ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী সবার মাঝে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বন্ধন থাকবে অটুট-এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here