দুঃখজনক এই সংবাদটি পত্রিকায় আসে গত ১৭ সেপ্টেম্বর। কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় খুতবার আজান আস্তে হবে নাকি জোরে— এ নিয়ে মুসল্লিদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়, তা এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। সেই সংঘর্ষে এক মুসল্লি নিহত হন। কুড়াখাল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে জুমার নামাজের সময় এই ঘটনা ঘটে।
এই ঘটনা কেবল আমাদের ভেতরকার জুলুম ও দ্বন্দ্বের প্রকাশ নয়, বরং মসজিদের উদ্দেশ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। মসজিদে গমন ও জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়তে তো এইজন্য তাগিদ দেওয়া হয়নি যেন ভাইয়ের রক্তে হাত রঞ্জিত করতে পারি। মসজিদ মনের জিঘাংসা জাগিয়ে তোলার জায়গা নয়। মসজিদ আল্লাহর ঘর, এর পবিত্রতা রক্ষা করা যাবে কেবল এর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।
কুরআন ও আল্লাহর রাসুলের (সা.) জীবনাদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় আমরা ভুলে গেছি মসজিদের উদ্দেশ্য কেবল নামাজ নয়। আল্লাহর রাসুলের (সা.) সময়ে মসজিদ ছিল মুসলমানদের সবধরনের সামাজিক কার্যক্রমের কেন্দ্র— সেখানে সবরকমের শিক্ষা, ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ধারণা এবং আত্মিক উন্নয়নের কাজ আঞ্জাম দেওয়া হতো।
নারী-পুরুষ সবাই মসজিদে যেতেন, এখান থেকেই তারা পেতেন ইহজাগতিক ও পরজাগতিক কাজের দিকনির্দেশনা। মসজিদ ছিল এমন— সেখানে ধনী-গরিব কিংবা সাদা-কালোতে কোনো ভেদাভেদ ছিল না।
মসজিদ ছিল এক নবীর এক উম্মতের মিলনমেলা। সেখানে মানুষেরা নামাজের পর একসঙ্গে বসত, সুখ-দুঃখের গল্প বলত, হাসাহাসি করত, কখনো একে অপরের প্রয়োজনে এগিয়ে আসত।
মুসলিম শরিফের এক হাদিস থেকে আমরা একথার প্রমাণ পাই। জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) যে স্থানে ফজরের নামাজ আদায় করতেন, সূর্যোদয় না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই বসে থাকতেন। তারপর যখন সূর্য উদিত হতো, তখন তিনি নামাজে দাঁড়াতেন। আর লোকেরা সেখানে জাহিলি যুগের মতো কথাবার্তা বলত ও হাসাহাসি করত, আল্লাহর রাসুল (সেসব দেখে) মুচকি হাসতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৭০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন সংস্করণে : ১৩৯৯)
মসজিদের বিভিন্ন জায়গায় চক্র বানিয়ে সাহাবিরা আল্লাহর কালাম নিয়ে আলোচনা করতেন। কেউ-বা জিকির-ফিকির করতেন। আল্লাহর রাসুল সেসব দেখতেন, এবং উৎসাহ যোগাতেন। (সুনানু ইবন মাজাহ, ২/২২৯)
তিনি বলেন, ‘আমার এই মসজিদে যেই ব্যক্তি উত্তম এলেম শিখতে ও শেখানোর নিয়তে আসে, তার উদাহরণ আল্লাহর পথের মুজাহিদের মতো।’ (সুনানু ইবন মাজাহ, ৮/২২৭)
পরিবেশটাই ছিল এমন— ওখানে গেলে জেগে উঠত ভ্রাতৃত্ববোধ, জেগে উঠত জ্ঞান সাধনার স্পৃহা। কী দিন কী রাত, সবসময় এমন পরিবেশ ছিল, যেন জমিনের বুকে এক টুকরো জান্নাত। অথচ মুসলমান আজ সেই মসজিদকে পরিণত করছে রণক্ষেত্রে, ভাবুন একবার, আমরা ইসলামের মৌলিক অবস্থান থেকে কতদূর সরে গেছি।
মুসলমান মুসলমানে দ্বন্দ্বের বিষয় আজ নামাজ। অথচ এটাই হওয়া উচিৎ ছিল আমাদের ঐক্যের ভিত্তি, আমরা সবাই এক কাতারে নামাজ পড়ি, এখানে কোনো ভিন্নতা নাই।
হ্যাঁ, একথা সত্য হাদিসে বিভিন্নভাবে নামাজ পড়ার কথা পাওয়া যায়, সেটা একই কাজের আলাদা আলাদা পদ্ধতিকে সমর্থন করে, কিন্তু ভাইয়ে ভাইয়ে দ্বন্দ্বে জড়াতে তো বলে না।
ইমাম ও ফকিহরা নিজেরা কোনো নিয়ম তৈরি করেননি, সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে নামাজ পড়েছেন, তা-ই তাদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন।
নামাজের যত পদ্ধতি আছে, তার মধ্যে কিয়াম রুকু কিংবা সেজদায় কোনো মতবিরোধ নাই। মতবিরোধ হলো জোরে আমিন বলবে নাকি আস্তে, রাফয়ে ইয়াদাইন করবে নাকি করবে না, ইমামের পেছনে সুরা ফাতিহা পড়তে হবে নাকি হবে না, আত্তাহিইয়াতু পড়ার সময় কীভাবে আঙুল তুলবে এসব নিয়ে।
অথচ এর কোনোটাই নামাজের জন্য ফরজ না। আমাদের কোনো কোনো ভাই এই মতবিরোধকে এতটাই জটিল বানিয়ে ফেলেছে যে, কেউ যদি তার অনুসৃত পদ্ধতিতে নামাজ না পড়ে, তার সাথে এমন আচরণ করে যেন সে ধর্মই পরিবর্তন করে ফেলেছে।
এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রকৃতপক্ষে সব পদ্ধতির নামাজই আল্লাহর রাসুলের (সা.) নামাজ, মুহাদ্দিস ও ফকিহদের এ বিষয়ে কোনোরকমের মতবিরোধ নাই।
কোনো ইমাম কোনো পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন, পার্থক্য এতটুকুই। এবং খুতবার আজান আস্তে হবে না জোরে হবে এটাও ইসলামের কোনো মৌলিক প্রশ্ন নয়। উদ্দেশ্যকে বাদ দিয়ে কেবল মাধ্যম নিয়ে পড়ে থাকলে হবে না।
আল্লাহর রব্বুল আলামিন পৃথিবীতে আমাদেরকে খলিফা হিসাবে পাঠিয়েছেন, এবং কিছু দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই দায়িত্ব ভুলে যাওয়াই আমাদের সব দ্বন্দ্বের মূল কারণ।
কোরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন— ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর অনুগত হও এবং রাসুল ও তোমাদের মধ্যকার কর্তৃত্বের অধিকারীগণের অনুগত হও; যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ ঘটে, তাহলে সেই বিষয়কে আল্লাহ এবং রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও যদি তোমরা আল্লাহ এবং পরকালে ঈমান এনে থাক; এটাই উত্তম এবং শ্রেষ্ঠতর পরিসমাপ্তি।’ (সুরা নিসা, আয়াত ৫৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় মুসলমান মুসলমানে মতবিরোধ ঘটা স্বাভাবিক, এবং মতবিরোধ হলে কী করতে হবে আল্লাহ পাক তা-ও বাতলে দিয়েছেন— সেই বিষয়কে আল্লাহ এবং রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এর মানে আমাদের সম্পর্ক যতই ওঠানামা করুক, দিনশেষে আমরা সবাই এক আল্লাহর বান্দা, এক নবীর এক উম্মত— আমাদের সেই কথা মাথা রাখতে হবে।
সুতরাং মতবিরোধের মধ্যেও আমাদের উচিৎ একতা বজায় রাখা, আর এটাই আল্লাহ তায়ালা চান। কেননা এই আয়াতে যেমন মতবিরোধের কথা উল্লেখ করেছেন, অন্য আয়াতে আবার এক হওয়ার কথা বলেছেন, দুই সমন্বয় এই কথাই প্রমাণ করে।
অন্য আয়াতে তিনি ইরশাদ করেন, ‘এবং তোমরা সবাই আল্লাহর রশি শক্ত করে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিভক্ত হয়ো না। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর সেই অনুগ্রহ স্মরণ করো যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে, তখন তিনি তোমার হৃদয় প্রীতির বাঁধনে বেঁধে দিলেন এবং তোমরা তারই অপার অনুগ্রহে ভাই ভাই হয়ে গেলে। আর তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের কিনারায় ছিলে, তিনি তোমাদের তা থেকে রক্ষা করলেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যেন তোমরা হিদায়াত লাভ কর।’(সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৩)
খুবই স্পষ্ট দিকনির্দেশনা, তবু কি আমরা বুঝব না? আল্লাহ আমাদের শত মতবিরোধের মধ্যেও এক হওয়ার তাওফিক দান করুন।


