দেশব্যাপী ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোতেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। অথচ গ্যাস ছাড়া ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট চলার কোনো উপায় নেই।
কিন্তু দেশে গ্যাসের মজুত দিন দিন কমে আসছে। ফলে ক্যাপটিভ পাওয়ার নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কায় আছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।
কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় ইতোমধ্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। জাতীয় গ্রিড থেকেও গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে রেশনিংয়ের ভিত্তিতে।
সবমিলিয়ে এখন বিদ্যুৎ সেক্টরে প্রায় ২শ থেকে ২৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস কম দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় ভুগছে দেশের শিল্পকারখানায় সরবরাহের জন্য স্থাপিত ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, যদি ক্যাপটিভে বড় ধরনের জ্বালানি সংকট দেখা দেয় তাহলে গোটা শিল্প খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘শিল্পকারখানাগুলোকে যতটা সম্ভব লোডশেডিংয়ের আওতামুক্ত রাখা হচ্ছে।
পাশাপাশি এ সেক্টরে গ্যাসের জোগানও স্বাভাবিক রাখার চিন্তা আছে সরকারের।’ তিনি বলেন, ‘শিল্প খাতকে এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
শিল্প খাত যাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পায়, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সরকার জ্বালানি তেলসহ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নানা ধরনের পরিকল্পনা করেছে।’
জানা গেছে, শিল্প খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের সংস্থান করে ক্যাপটিভ বা নিজস্ব উৎপাদনের ভিত্তিতে। খরচ বেশি হওয়ার পাশাপাশি সঞ্চালন ব্যবস্থার দুর্বলতা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন না শিল্পোদ্যোক্তাদের অনেকে।
শিল্প খাতে ক্যাপটিভে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ মোটামুটি কম। অর্থাৎ জাতীয় গ্রিড থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনতে যে ব্যয় হয় তার প্রায় অর্ধেক টাকা দিয়ে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব ক্যাপটিভ প্ল্যান্টে।
কিন্তু এখন এ ক্যাপটিভ খাতেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। শিল্প মালিকরা বলেছেন, ক্যাপটিভে গ্যাস সরবরাহ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তাদের মতে ক্যাপটিভে যদি গ্যাস সংকট দেখা দেয় তাহলে এসব কেন্দ্রগুলো চালানোর বিকল্প জ্বালানি নেই। অর্থাৎ জরুরি অবস্থায় অতি ব্যয়বহুল জ্বালানি ডিজেল ব্যবহারের সুযোগও নেই। ভুক্তভোগী শিল্প মালিকরা মনে করেন, সরকারের সহায়তা ছাড়া সম্ভাব্য এ সংকট মোকাবিলার আর কোনো পথও খোলা নেই উদ্যোক্তাদের সামনে। এ অবস্থায় ক্যাপটিভে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) একজন সিনিয়র নেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা ক্যাপটিভ চালাই গ্যাসে। চাপ না থাকলে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু জ্বালানি ছাড়া আমরা এক সেকেন্ডও ফ্যাক্টরি চালাতে পারব না। এখন কোথাও যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে উৎপাদন শতভাগ বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ ক্যাপটিভে গ্যাসের বিকল্প কিছু নেই। ক্যাপটিভ সক্ষমতা বস্ত্র শিল্পেই সর্বোচ্চ। আমরা এখন শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। যদি গ্যাস না থাকে, তাহলে আমরা সবাই বসে যাব। পরিস্থিতি খুবই খারাপ হবে। সরকার বলছে, যেসব এলাকায় শিল্প আছে সেগুলোকে লোডশেডিংয়ের বাইরে রাখা হবে বা সেখানে হলেও কম হবে। এটা খুবই ভালো সিদ্ধান্ত।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহসভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বেশকিছু দিন ধরে শিল্পে গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। ঈদের আগে সংকট তীব্র আকার ধারণ করলেও সেই সংকট এখনো আছে। কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় ক্যাপটিভ চালাতে সমস্যা হচ্ছে। এ নিয়ে আমরা ইতোমধ্যে বৈঠক করেছি। আরও দু-একদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর বিষয়টি নিয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশের বেশি আসছে ক্যাপটিভ কেন্দ্রগুলো থেকে। সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১২ অর্থবছরে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১৭ দশমিক ৮৪ শতাংশই ছিল ক্যাপটিভের। পরের অর্থবছরে তা নেমে আসে ১৬ শতাংশে। ২০১৯-২০ শেষেও ক্যাপটিভ থেকে উৎপাদন হয়েছে মোট বিদ্যুতের ১১ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২০-২১ শেষে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্যাপটিভের অবদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ শতাংশে।
মোট উৎপাদনে অংশ কমতে থাকলেও ক্যাপটিভ খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে। ২০১৬ সালে ক্যাপটিভ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এসব কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় ২ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট। ২০২০-২১ শেষে তা দাঁড়িয়েছে তিন হাজার মেগাওয়াটে।
সূত্র জানায়, দেশে ক্যাপটিভ বিদু্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করেন মূলত তৈরি পোশাকের কাঁচামাল সুতা-কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্র শিল্প মালিকরা। তারা বলছেন, ক্যাপটিভনির্ভর শিল্প পরিচালনাকারীদের জন্য বাস্তবতা হলো তাদের জ্বালানি উৎস একটিই গ্যাস। এখন যে দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, তা সমন্বয় করা হচ্ছে। সামনের দিনগুলোয় শিল্পোৎপাদনে গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাব প্রকট হয়ে উঠবে। কিন্তু খুব কম উদ্যোক্তারাই দুই ধরনের জ্বালানি উৎস ব্যবহার করেন। কাজেই ক্যাপটিভ ব্যবহারকারীদের জন্য গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে উৎপাদন বন্ধ থাকবে। দু-তিন মাস ধরে এক ধরনের অঘোষিত রেশনিং হচ্ছিল। এখন তা হচ্ছে ঘোষণা দিয়ে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে কীভাবে চলবে, সে বিষয়ে সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট রূপরেখা থাকা প্রয়োজন।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, দেশে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি শিল্পকারখানায় ক্যাপটিভ বিদ্যুতের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এগুলোয় দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। গত বছরও অপচয়ের কারণ দেখিয়ে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে আনতে চাইছিল সরকার। সেজন্য ক্যাপটিভে সরবরাহকৃত গ্যাসের দামও বাড়ানো হয়। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আগের অনেক হিসাব-নিকাশই বদলে গেছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের মালিকরা বলছেন, ‘আমরা খুবই শঙ্কিত। কেননা, এলএনজি আমদানি এখন সুরক্ষিত নয়। আর এটা যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে শিল্পেও গ্যাস-বিদ্যুতের রেশনিং করতে হবে। এর ফলে উদ্যোক্তাদের কোনো পরিকল্পনা কাজে লাগার সুযোগ নেই।’


