‘দু’তিন বছরে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে সম্মানজনক স্থানে উন্নীত হবে ঢাবি’

0
200

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মদিন আজ। ১০১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পেরিয়ে প্রৌঢ়ে পৌছানো উপমহাদেশের মধ্যে অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটি আজও স্বমহিমায় ভাস্বর। দেশসেরা এই বিদ্যাপীঠ বৃটিশ আমল থেকে বহু ঘটনার স্বাক্ষী। একটি জাতিরাষ্ট্র তৈরির নেতৃত্ব দেওয়ার মতো বিরল কৃতিত্বের অধিকারী এ প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের সব অর্জনের পেছনে গৌরবজনক ও অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছে।

বেশ কিছু ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনন্য। শিক্ষা-গবেষণার পাশাপাশি যেকোনো সময়-দু:সময়-সঙ্কটে জাতিকে দিশা দিয়ে আসছে এই বিদ্যাপীঠ। সারা দুনিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেটি কিনা একটি জাতিকে স্বাধীন দেশের পতাকা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করার নজির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেই। বাঙালির স্বাধীনতার রক্ষাকবচ তথা সবচেয়ে বড় অর্জন একাত্তরের মুক্তির সংগ্রামের আঁতুরঘর এই বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার ছাত্র-শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে। মুক্তির সংগ্রামে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এত সংখ্যক শিক্ষকের রক্ত দেওয়ার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আজও অম্লান।

বৃটিশ শাসনামলে ১৯২১ সালের ১ জুলাই শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বার উন্মুক্ত হয়। সে সময়কার ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত রমনা এলাকায় প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই অঞ্চলের মানুষগুলোর কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে ধারণ করে স্বগৌরবে শতাব্দী ধরে এগিয়ে চলেছে, তার এই পথচলা নিরন্তর। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনীতিসহ আমাদের সব অর্জনে সামনে থেকে পথ দেখানোর পাশাপাশি শিক্ষা-গবেষণায়ও রেখেছে অসামান্য অবদান। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, কালক্রমে সঠিক একাডেমিক পরিকল্পনার অভাব, বাজেট স্বল্পতা, আবাসন সঙ্কট, দলীয়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতি, প্রশ্নবিদ্ধ শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ না থাকাসহ নানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ তথা গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছে ঢাবি।
এরই চিত্র ফুটে উঠছে র‌্যাংকিংগুলোতে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তলানিতে। সারাবিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাং কিং নির্ণয় করা গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস)। এটি গত ১০ জুন ২০২৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিং প্রকাশ করেছে। এতে ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও স্থান হয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট)। টানা পঞ্চমবার কিউএস র্যা ঙ্কিংয়ে ৮০১ থেকে ১০০০তম অবস্থানে রয়েছে দেশসেরা এই বিশ্ববিদ্যালয়৷

‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যা ঙ্কিংস ২০২৩: টপ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিস’ শীর্ষক এই র্যা ঙ্কিংয়ে সেরা ৫০০-এর পরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয় না। এ কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে কত নম্বরে, তা উল্লেখ করেনি কিউএস। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১০০০তম—এর অর্থ হচ্ছে এটি র্যা ঙ্কিংয়ের সেরা ১০০০-এর শেষ ২০০-তে অবস্থান করছে।

এই র্যা ঙ্কিংয়ে এখন আটটি সূচকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান নিরূপণ করা হয়। প্রতিটি সূচকে ১০০ করে স্কোর থাকে। সব সূচকের যোগফলের গড়ের ভিত্তিতে সামগ্রিক স্কোর নির্ধারিত হয়।

র্যাং কিংয়ে গত ১০ বছরের মতো এবারও প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), দ্বিতীয় অবস্থানে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে আছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

র্যাং কিংয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ৪৪টি ও পাকিস্তানের ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে ভারতের নয়টি ও পাকিস্তানের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে বিশ্বসেরা ৪০০ এর মধ্যে। এবার ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সাইন্সের অবস্থান ১৫৫তম, গতবার যেটি ১৮৬তম ছিল। অথচ আমাদের সেরা প্রতিষ্ঠানটির নাম নেই র্যাং কিংয়ের ৮০০’র মধ্যেও।

বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিং বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক দশক আগেও বিশ্ব র্যাং কিংয়ে ঢাবি সন্তোষজনক অবস্থায় ছিল। ২০১২ সালে কিউএস’র তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল ৬০১ এর মধ্যে। ২০১৪ সালে তা পিছিয়ে ৭০১তম অবস্থানের পরে চলে যায়। ২০১৯ সালে তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান আরও পেছনের দিকে চলে যায়।

র্যাং কিংয়ে কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে এর সামগ্রিক সুলোক সন্ধানে জানা গেছে, যে ৮টি সূচকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান নিরূপণ করা হয়, সেগুলোর বেশিরভাগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরমেন্স খুবই নাজুক।

র্যাং কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিছিয়ে পড়ার কারণ ও এ থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামালের সঙ্গে।

যুগান্তরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি কীভাবে র্যাং কিংয়ে এগোনো যাবে সে বিষয়েও সুচিন্তিত মত দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, র্যাং কিংয়ে এগোনোর লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি যেসব পরিকল্পনা ও উদ্যোগ নিয়েছে এবং বাস্তবায়ন করছে তাতে আগামী দু’তিন বছরের মধ্যে বিশ্ব র্যাং কিংয়ে সম্মানজনক জায়গায় থাকবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সাক্ষাৎকারটি পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো—

কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডসের (কিউএস) বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিংয়ে বিশ্বসেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এবারও স্থান হয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে আপনার কাছে এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

অধ্যাপক মাকসুদ কামাল: র্যাং কিংয়ের মধ্য দিয়ে পৃথিবীব্যাপী যে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে তার প্রকৃত অবস্থা নির্ণয় হয়। বিশ্ব শিক্ষা মানচিত্রে কোনো একটি দেশের ক্রাইটেরিয়ার উপর ভিত্তি করে যে ইন্ডিকেটরগুলো আছে তার উপর ভিত্তি করে সার্ভে করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটা অবস্থান নির্ণয় করা হয়। কিউএস র্যাং কিং অথবা টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাং কিং দুটোতেই আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে আছে।
পৃথিবীতে রিসার্চ ইনটেনসিভ যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে সেগুলো বৈশ্বিক র্যাং কিংয়ে এগিয়ে আছে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রিসার্চ ইনটেনসিভ বিশ্ববিদ্যালয় না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণত আমরা সার্টিফিকেট প্রোভাইডিং ইউনিভার্সিটি হিসেবে গড়ে তোলেছি। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বের হয়ে স্বতন্ত্রভাবে কিছু একটা করবে সেভাব তাদের গড়ে না তোলে তাদেরকে চাকরি নেওয়ার জন্য তৈরি করেছি। চাকরির জন্য শিক্ষার্থীদের তৈরি করার মানেই হচ্ছে এখানে গবেষণা, উদ্ভাবন এবং স্বতন্ত্রভাবে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চার জন্য যে গুণাবলীগুলো দরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অবকাঠামো দরকার তথা একাডেমিক ও রিসার্চ অবকাঠামো দরকার—এ ধরনের শূন্যতা আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রয়েছে। এসবের অভাবে র্যাং কিংয়ের সূচকগুলোতে আমরা পিছিয়ে আছি।
যুগান্তর: বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিং করার ক্ষেত্রে কোন কোন সূচক মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়?

মাকসুদ কামাল: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো র্যাং কিংয়ের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সূচক রয়েছে। কিএস র্যাং কিংয়ে একাডেমিক সুনাম একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। জ্ঞানের আদান-প্রদানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজ দেশে ও বিশ্বব্যাপী কতটুকু পরিচিত। বিদেশের কোনো শিক্ষার্থী এখানে পড়তে আসে কিনা সেটি দেখা হয়। শিক্ষাটা মানসম্মত ও যুগোপযোগী কিনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিষয় পড়ানো হয় সেগুলো থেকে পাস করে নিজ দেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে কী পরিমাণ শিক্ষার্থী চাকরি পাচ্ছে সেটি দেখা হয়।
দু:খের বিষয় হচ্ছে-আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা আমরা নিজ দেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী গড়ে তুলতে পারি নাই। এ কারণে র্যাং কিংয়ে একাডেমিক সুনাম সূচকে যে নম্বর আছে তাতে আমাদের স্কোর অনেক কম হয়।
র্যাং কিংয়ের ক্ষেত্রে সূচকে এমপ্লয়ার রেপুটেশনটাো দেখা হয়। এতে ১০ নম্বর। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটা কতটা স্বচ্ছ, শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়া কতটা মানসম্মত, প্রতিযোগিতামূলক কিনা সেটি দেখা হয়।
যুগান্তর: ঢাবিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ?

মাকসুদ কামাল: শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আমরা কিছুটা এগিয়ে আছি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে দেশের সেরাদের সেরা শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। মেধাবীদের মধ্যে মেধাবী, একাডেমিক ফল যাদের ঈর্ষণীয়, যাদের গবেষণা করার মতো মনোভাব আছে তাদেরকে শিক্ষক হিসেবে এখন নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এই সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিছুটা এগিয়ে থাকলেও যেখানে আমরা পিছিয়ে সেটি হচ্ছে একাডেমিক রেপুটেশন। যেখানে নম্বর ৪০।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ক্লাস সাইজ অনেক বড়, যেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মিথস্ক্রিয়া প্রায়ই হয় না বলে অভিযোগ।
মাকসুদ কামাল: আমি আসছি সে বিষয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিংয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত। সাধারণত প্রতি ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকাটাকেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। যেসব বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক র্যাং কিংয়ে এগিয়ে তাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত কোথাও ৮: ১, ৭: ১। এমনও বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে ৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন ফ্যাকাল্টি রয়েছেন।
অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১ জন শিক্ষক রয়েছেন। এই ক্ষেত্রে আমরা নম্বর পাই না। র্যাং কিংয়ে পিছিয়ে পড়ার এটিও একটি কারণ।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) টিচিং লোড ক্যালকুলেশনের একটি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এই কাজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা ইউজিসিকে সব ধরনের সহায়তা করছি। টিচিং লোড ক্যালকুলেশন কমিটির আমি একজন সদস্য। কমিটি একটা নীতিমালা করছে। সেখানে একজন শিক্ষক একটিভ টিচিং আওয়ারের পাশাপাশি গবেষণায় কতটুকু সময় দেবেন, লেকচার তৈরিতে কতটুকু সময় দেবেন, লাইব্রেরিতে কতটুকু সময় দেবেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কনসালটেশনে কতটুকু সময় দেবেন এগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। ইউজিসি যে নীতিমালা করছে তাতে ১৪ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক পাওয়া যাবে। এটি বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকিংয়ের এই সূচকেও আমরা ভালো করব।

যুগান্তর: র্যাং কিংকে আর কোন সূচকে ঢাবি পিছিয়ে?

মাকসুদ কামাল: র্যাং কিংয়ের ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় দেখা হয় সেটি হচ্ছে-সাইটেশন পার ফ্যাকাল্টি। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক জার্নালে কোনো প্রবন্ধ যদি প্রকাশিত হয় সেই প্রবন্ধ যখন অন্যরা রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করে সেটাকে সাইটেশন বলা হয়। সাইটেশন সূচকের জন্য ২০ নম্বর বরাদ্দ।
আন্তর্জাতিক জার্নালে কোনো প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার আগে ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেনটিফায়ারের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করা হয়। আন্তর্জাতিক জার্নালের সেই প্রবন্ধগুলো অন্যরা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে এবং গবেষণায় আমরা পিছিয়ে আছি। গবেষণাকে উদ্বুদ্ধ করতে ও জনপ্রিয় করতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষকে সামনে রেখে একটি উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমাদের শিক্ষকরা ৫০০ গবেষণা পরিচালনা করছেন। সেখানে শিক্ষকদের বলে দেওয়া আছে প্রত্যেক শিক্ষক তার গবেষণা থেকে অন্তত একটি প্রকাশনা করবেন। সেই প্রকাশনা ইনডেক্স জার্নাল তথা যেগুলোর ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর রয়েছে তাতে প্রকাশ করতে হবে। এতে করে দেখা যাচ্ছে, আমাদের মানসম্মত ৫০০ প্রকাশনা হয়ে যাচ্ছে। এসব প্রকাশনা ও গবেষণা সম্পন্ন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিবিলিটি ও সাইটেশন বাড়বে। এতে র্যাং কিংয়েও দ্রুত উন্নতি করা যাবে।
আগে গবেষণা ও প্রকাশনাকে আমাদের এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন আমরা সেই উদ্যোগ নিয়েছি। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি জার্নালকে ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেনটিফায়ার দিয়ে যাচাই করেছি। লন্ডনের ক্রস রেপ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ একাডেমিক অব সাইন্সের বাংলাজলের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। বাংলাজলের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্রস রেপের মাধ্যমে ওই ১১টি জার্নালকে ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেনটিফায়ারের আওতায় এনেছি।
ইনডাস্ট্রি ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড একাডেমিয়ার কোলাবোরেশন ও কো-অপারেশরেনর একটা কাজ আমরা শুরু করেছি। ১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা একটা গবেষণা মেলা (রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন ফেয়ার) করতে যাচ্ছি, যেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম। এই মেলায় আমাদের জার্নালগুলো দেখাব। শিক্ষকদের যে গ্রাউন্ড ব্রেকিং পাবলিকেশনগুলো আছে, সেগুলো সেখানে দেখাব।
এভাবে র্যাং কিংয়ে ভালো করার ক্ষেত্রে আমাদের যেসব দুর্বলতা অতীতে ছিল সেগুলো কাটিয়ে উঠতে আমরা কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। তারই একটা অংশ হলো আমাদের রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন ফেয়ার।

ঢাবিতে আগে বিদেশ থেকে অনেকে পড়তে আসত। এখন তাদের চোখে পড়ে না। কারণ কী?

মাকসুদ কামাল: আমি সে বিষয়ে আসছি। র্যাং কিংয়ে আরেকটি বিষয় হচ্ছে—বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশের শিক্ষার্থী কতজন আছেন। অতীতে নেপাল, ভারত, মালয়েশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও আরব দেশ থেকে বহু শিক্ষার্থী আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসতেন। এখন এক্ষেত্রে অন্যরা এগিয়ে গেছে আমরা পিছিয়ে পড়েছি। এর কারণ হচ্ছে উপরোল্লিখিত সূচকগুলোতে পিছিয়ে পড়ার কারণে বিদেশের শিক্ষার্থীরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন না। এখানে ৫ নম্বর, যাতে কোনো নম্বর আমরা পাই না। এ ধরনের দূর্বলতার কারণে এবং জ্ঞান আহরণের যে পরিবেশ প্রয়োজন সেটির অবর্তমানে আমাদের এখানে বিদেশি শিক্ষার্থীরা আসছেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিংয়ে আরেকটি সূচক হচ্ছে—বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশের কতজন শিক্ষক আছেন। এখানে ৫ নম্বর। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিদেশি শিক্ষক নেই। আমরা উদ্যোগ নিয়েছি বাংলাদেশের যেসব নাগরিক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তারা যেন দেশে আসেন। তারা যেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন, গবেষণা করেন। ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাকাল্টি আনার উদ্যোগ অতীতে আমাদের ছিল না।

ঢাবি বিশ্ব র্যাং কিংয়ে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পেৌছতে কত সময় লাগবে বলে আপনি মনে করেন?

মাকসুদ কামাল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গত কয়েক বছর ধরে যে পরিকল্পনাগুলো করেছে এবং ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করছে এই বাস্তবায়নের ফল আপনারা নিকট ভবিষ্যতে দেখতে পারবেন। আমি বিশ্বাস করি আগামী দুই তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয় র্যাং কিংয়ে একটি সম্মানজনক জায়গায় নিজেকে উন্নীত করতে পারবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্বের সব বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক প্লান থাকে? ঢাবির নেই কেন?

মাকসুদ কামাল: শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েই সঠিক একাডেমিক প্লান নেই। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এখন পর্যন্ত সঠিক একাডেমিক পরিকল্পনা কী হবে সেটি উপস্থাপন করতে পারেননি। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এখন সেই পরিকল্পনাটা করতে যাচ্ছি। একাডেমিক প্লান তৈরি করার জন্য জ্যেষ্ঠ ও প্রথিতযশা শিক্ষকদের সমন্বয়ে একটি কমিটি করেছি। সেই কমিটি তিন মাসের মধ্যেই আমাদেরকে একটা পরিকল্পনা দেবে। সেই পরিকল্পনা মোতাবেক আমরা আগামী ৫ কিংবা ১০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কোন মানে উন্নীত করব সেই রোডম্যাপ ঠিক করব।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

মাকসুদ কামাল: আপনাকে এবং যুগান্তরকে অনেক ধন্যবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here