ভাইরাল হওয়া ‘আসমানী’কে এসপির ঈদ উপহার

0
493

আশি-নব্বইয়ের দশকে পাঠ্যবইয়ে কবি জসিম উদ্দীনের লেখা ‘আসমানী’ কবিতার মতোই বৃদ্ধ মেনাজ গাজীর দুর্বিষহ জীবন। পরিত্যক্ত জলাশয়ের পাশে নড়বরে ঘরটির এক চালা টিনের ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে ঘরটি কাদামাটিতে একাকার।

জলের মধ্যে ঘরে মেঝেতে পলিথিন বিছিয়ে খালি গায়ে শুয়ে আছে বাপ-মেয়ে। দৃশ্য দেখে মনে হয়-বৃষ্টির জলের ফোটায় যেন নতুন জীবনের আবছা আলো খুঁজছে। সাজ সকালে বর্ষণের আদ্রতায় পুরনো চাদর জড়িয়ে আছে দুজনে। চোখে যেন ফুটে ওঠে সহস্র দারিদ্র জনগোষ্ঠীর সরলতা আর আকুতি।

সৃজনশীল সভ্যতার সমাজে এমন দৃশ্য পাওয়া যায় পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে ১০ মিনিটের পথ সদর উপজেলার বদরপুর ইউনিয়নের তেলীখালী গ্রামে। স্থানীয়রা এই বৃদ্ধকে আসমানী রূপে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি যেন বিংশশতাব্দীর আসমানী।

থরথর অসার অঙ্গের হাড়গুলো গুনতে কারও বেগ পেতে হবেনা। শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ভাবেও অক্ষম। মহাসড়কের পাশে বাঁশের ফ্রেমে টিন বিছিয়ে ৫ বছরের একমাত্র শিশুকন্যা কুলসুমকে নিয়ে বাস করেন ৮১ বছরের এই বৃদ্ধ। শরীরে জড়ানোর মতো পরের দেয়া একটি জামা আছে কুলসুমের। তাই জামাটি নতুন রাখতে খালি গায়েই কাটায় কুলসুম। কখনো ছেড়া কাপর জড়িয়ে থাকে।

বৃদ্ধ মেনাজ গাজীও তার মেয়ের মতো অন্যের দেয়া পাঞ্জাবিটাও কাপড়ের পোটলায় ভরে বাঁশের আরায় ঝুলিয়ে রাখেন, নতুন রাখতে। খালি গায়ে থাকার কারণ জানতে চাইলে মেনাজ গাজী বলেন, মানে একটা জামা দেছে, পুরান অইলে গায় দিমু কি। বাপের মত মেয়েরও একি কথা। কুড়িয়ে পাওয়া ছেড়া কাপর শরীরে জড়িয়ে কাটিয়ে দিন চলে যায় বাপ-মেয়ের। খাবার পেলে খায়, না পেলে জল খেয়ে দিন পার করে তারা!

সম্প্রতি বাপ-মেয়ের দুর্বিষহ জীবন ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ফেসবুকে এমন দৃশ্য দেখে হতবাক হয় পটুয়াখালী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। মঙ্গলবার সকালে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় গাড়ি পাঠিয়ে মেনাজ গাজী ও মেয়ে কুলসুমকে তার কার্যালয়ে আনা হয়। পরে তাকে চাল, ডাল, তেল, চিনি সেমাই, বিস্কুট এবং নগদ টাকা দেয়া হয়েছে।

ঈদ উপলক্ষে বাপ-মেয়ের পছন্দমত বস্ত্র কিনে দিয়ে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন-অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহাফুজুর রহমান ও ট্রাফিক ইন্সপেক্টর হেলাল উদ্দিন প্রমুখ।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ফেসবুকে বৃদ্ধ মেনাজ গাজী ও তার মেয়ে অবস্থা দেখে তাদের কার্যালয়ে আনা হয়। তাদেরকে ঈদ উপহারসহ চাল, ডাল, তেল, চিনি সেমাই, বিস্কুট এবং নগদ টাকা দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে আরও সাহায্য করা হবে। মেনাজ গাজীর সংকট মেটাতে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেয় তিনি।

এমন দুর্বিষহ বর্ণনা শুনে প্রধানমন্ত্রীর ঘর দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন সদর ইউএনও লতিফা জান্নাতি।

পটুয়াখালী-বরিশাল মহাসড়কের পটুয়াখালী থেকে লেবুখালী ফেরিঘাটের পথে তেলিখালী ব্রিজ অতিক্রম করে শরীফবাড়ি স্ট্যান্ডের পাশেই ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করেন তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কোনো রকম একটি টিনের চালা বিছিয়ে তাদের ঘর। কুলসুমের মা শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় তিনি অনেক আগেই স্বামী-সন্তান ফেলে পিত্রালয়ে থাকে। শিশু কুলসুম তার বাবার সঙ্গেই থেকে যায়। বাড়ির পাশের একটি পাঠশালায় ক্লাস ওয়ানে কুলসুম পড়ালেখা করলেও রয়েছে প্রতিবন্ধকতা। ভিক্ষাবৃত্তি করে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটে তাদের।

এর আগে সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সোহানা হোসেন মিকি ও দখিনা কবিয়ালের পক্ষ থেকে জাহাঙ্গীর হোসাইন মানিক তাদের সহায়তা করেন।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here