শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন চারুকলা ইনস্টিটিউটে শিক্ষক নিয়োগে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম থেকে চতুর্থ স্থান অধিকারীকে বাদ দিয়ে অন্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এমনকি অনুত্তীর্ণ আবেদনকারীকেও শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের স্বাক্ষর জাল করারও অভিযোগ ওঠে। ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের করা তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতারা বলছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীর নামে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি রুগ্ণ হয়ে পড়বে।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন চারুকলা ইনস্টিটিউটের পরিচালনা কমিটির প্রতিষ্ঠাকালীন কার্যকরী সদস্য হোসাইন মোহাম্মদ ফারুক যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন প্রকাশ্য জালিয়াতির ঘটনা আছে কিনা আমার জানা নেই। যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন তাদের বাদ দিয়ে অন্য সাবজেক্টের লোকদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইনস্টিটিউটের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে ৭টি সাবজেক্টে ১৩ জন উত্তীর্ণ হন, যার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন হোসাইন মোহাম্মদ ফারুক। কিন্তু নিয়োগের ক্ষেত্রে তালিকায় থাকা প্রথম চারজন বাদ দিয়ে অন্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হননি এমন আবেদনকারীকেও শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিয়ে এমপিওভুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানিও করা হচ্ছে।
ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুর রউফকে ২ থেকে ৫ জুন অনেকবার ফোন ও এসএমএস দিলেও সাড়া দেননি। ইনস্টিটিউটের সভাপতি ফকির আজমল হুদা যুগান্তরকে বলেন, ‘নিয়োগের বিনিময়ে টাকা চাওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। যারা উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেতে চাচ্ছেন তারা আমাদের ওপর হামলা করেছে। তাদের নামে মামলা করেছি।’ অধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষেত্রে হোসাইন ফারুকের সার্টিফিকেট ও লিখিত পরীক্ষায় ভালো নম্বর থাকার পরও ভাইভাতে কেন মাত্র ২ নম্বর দেওয়া হলো এমন প্রশ্নের উত্তরে কাগজ দেখে তথ্য দিতে হবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন : শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন চারুকলা ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসনের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের অভিযোগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের জন্য নাট্যকলা ও ছাপচিত্রের শিক্ষক নিয়োগ, যাদের ইন্টারভিউ কার্ড পাওয়ার কথা না তাদেরকেই নিয়োগ দেওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। অবৈধভাবে সভাপতির শ্যালিকা দিলুয়ারা বেগমসহ একাধিকজনকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছ। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ ঈশ্বরচন্দ্রকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে নিয়োগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিমের স্বাক্ষর জাল করার সত্যতা পেয়েছে ইউএনওর তদন্ত কমিটি।
ফকির আজমল হুদা বলেন, ‘আমরা নিয়ম অনুযায়ীই কাজ করেছি। কোনো জালিয়াতির ঘটনা ঘটেনি।’ তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম গত সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ইনস্টিটিউট নিয়ন্ত্রকদের কথামতো নিয়োগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় আমাকে হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্য হারুন-অর-রশিদও জানেন। এরপর আমার স্বাক্ষর জাল করার ঘটনা ঘটছে বলে শুনেছি।
তদন্তের সুপারিশ : এমপিওভুক্ত করা শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাডেমিক সনদসহ নিয়োগ বিজ্ঞাপন নিরীক্ষা করা। স্থগিত মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে অধ্যক্ষ নিয়োগ। চারুকলাবান্ধব কমিটি গঠন। অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিষয়ে হোসাইন মোহাম্মদ ফারুক, মাইদুল ইসলাম খান, সোহেল পারভেজ ও গ্রাফিক ডিজাইনে ইসরাত জাহানকে নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা গ্রহণ। মো. রুবেল মিয়া (নৈশপ্রহরী) ও শিরীন আক্তারের (ঝাড়ুদার) নিয়োগ ও এমপিওভুক্তিকরণ।


