বৈদেশিক এলসির দেনা ১০০৩২ কোটি টাকা

0
190

করোনার নেতিবাচক প্রভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবসাবাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বৈদেশিক ‘ব্যাক টু ব্যাক’ এলসির বকেয়া দেনা বেড়েই চলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এ খাতে আরও বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে এই খাতে দেনা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ২০২০ সালে ডিসেম্বরে দেনা ছিল ৫৭ কোটি ডলার বা স্থানীয় মুদ্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪ কোটি ডলারে বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ হাজার ৩২ কোটি টাকা। আলোচ্য এ বছরে শুধু একটি খাতেই দেনা বেড়েছে ৫৭ কোটি ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, এসব দেনা ছাড়াও করোনার কারণে যেসব বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করা হয়েছে, সেগুলোও রয়েছে। বর্তমান ডলার সংকটের কারণে বৈদেশিক ঋণ ও এলসির দেনার কিছু কিস্তি বৈদেশিক ব্যাংক বা গ্রাহকের সঙ্গে আলোচনা করে পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। আর যেসব কিস্তি পরিশোধ করার মতো, সেগুলো পরিশোধ করে দেওয়া হচ্ছে। যে কারণে বৈদেশিক ‘ব্যাক টু ব্যাক’ এলসির বকেয়া কিস্তির একটি অংশ ইতোমধ্যে পরিশোধিত হয়েছে। তবে গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আরও ৮ কোটি ডলারের এলসির দেনা নতুন করে বকেয়ার তালিকায় যুক্ত হয়েছে। তবে করোনার পর বকেয়া বৈদেশিক এলসির দেনা যেভাবে বাড়ছিল, সেই গতি কমে এসেছে। আগে প্রতি ত্রৈমাসিকে প্রায় ২০ কোটি ডলার করে বাড়ত। গত জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে বেড়েছে ৪ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরে বেড়েছে ১৫ কোটি ডলার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বকেয়া এলসির দেনা আরও কমে যেত, কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি আবার মন্দায় আক্রান্ত হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব কারণে সব দেশই সতর্ক অবস্থানে চলে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানির নতুন আদেশ কম আসছে। একই সঙ্গে বিদেশ থেকে আগের রপ্তানি আয়ও দেশে আসার প্রবণতা একটু কমেছে। যে কারণে বকেয়া এলসির দেনা পরিশোধের গতি একটু মন্থর হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, বকেয়া বৈদেশিক এলসির সবই রপ্তানি খাতের। রপ্তানির আদেশের বিপরীতে এসব এলসি খোলা হয়েছে। ফলে রপ্তানি আয় দেশে এলে আগে ব্যাংক ওই এলসির দেনা সমন্বয় করছে। কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় দেরিতে এলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, তা থেকে ওই দেনার কিস্তি পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এখন পর্যন্ত কোনো দেনাই শর্তের বাইরে গিয়ে অপরিশোধিত থাকেনি। তবে ওই বাড়তি দেনা রপ্তানি আয় না আসায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ সংকট দ্রুতই কেটে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। কারণ যুদ্ধের উত্তেজনা কমতে শুরু করেছে। করোনার আঘাতও এখন আর নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। তখন রপ্তানি আয়ও দেশে আসার হার বাড়বে। এলসির দেনাও পরিশোধিত হয়ে যাবে।

তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক এলসির পুরোটাই রপ্তানি খাতের এলসির বিপরীতে কাঁচামাল আমদানি করা হয়েছে। যে কারণে এ খাতে ঝুঁকি কম। দেনা বৃদ্ধির হারও কমতে শুরু করেছে।

বৈদেশিক ব্যাক টু ব্যাক এলসির গত বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, বৈদেশিক ব্যাক টু ব্যাক এলসির দেনা বাড়ার হার কমছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দেনা ছিল ৫৭ কোটি ডলার। গত বছরের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১ কোটি ৫৬ লাখ ডলার। ওই তিন মাসে বেিেছল ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ডলার বা ২৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। জুনে বকেয়া এলসির দেনা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪ কোটি ডলারে। মার্চের তুলনায় জুনে বেড়েছে ২২ কোটি ডলার বা ৩০ দশমিক ৪৫ শতাংশ। জুন পর্যন্ত বাড়ার পর সেপ্টেম্বর থেকে কমতে শুরু করেছে। গত সেপ্টেম্বরে এলসির বকেয়া দেনা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ডলারে। ওই সময়ে বাড়ে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। বৃদ্ধির হার ৪ শতাংশ। ডিসেম্বরে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪ কোটি ডলারে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর-এই তিন মাসে বেড়েছে ১৫ কোটি ১২ লাখ ডলার। বৃদ্ধির হার সাড়ে ৬ শতাংশ।

সূত্র জানায়, রপ্তানির বিপরীতে বৈদেশিক ব্যাক টু ব্যাক এলসি ছাড়াও স্থানীয় কিছু ব্যাক টু ব্যাক এলসির দেনা এখনো বকেয়া রয়েছে। এগুলো স্থানীয় টেক্সটাইল মিল বা অন্যান্য কারখানা থেকে ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে পণ্য কেনা হয়েছে। রপ্তানি আয় দেশে না আসায় ওইগুলোর দেনাও শোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, করোনার নেতিবাচক প্রভাব এখনো কাটেনি। এর মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে যুদ্ধের প্রভাব। এ কারণে রপ্তানি আয় কম আসছে। যেজন্য কিছু এলসির দেনা বকেয়া রয়েছে। রপ্তানি আয় এলেই আগে এগুলোর দেনা সমন্বয় করছে ব্যাংক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here