‘একটা মানুষ মারতে কয়টা গুলি করা লাগে’

0
134

গুম-খুন হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারকে নিয়ে ইফতার করেছেন বিএনপি সিনিয়র নেতারা। শনিবার ইস্কাটনের লেডিস ক্লাবে এ ইফতার পার্টির আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী কৃষক দল। এতে ?সংগঠনটির পক্ষ থেকে গুম-খুনের শিকার নেতাকর্মীদের ৫০ পরিবারের সদস্যদের ঈদ উপহার দেওয়া হয়।

ইফতারের আগে সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে অশ্রুভেজা কণ্ঠে মুনিয়া আক্তার বলেন, ‘আচ্ছা, একটা মানুষকে মারতে কয়টা গুলি করা লাগে? তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী নুরুজ্জামান জনি খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু শুধু তার বুকেই ১৬টি গুলি করা হইছে। এরপর তার পায়ে, ঘাড়ে গুলি করা হইছে। আপনারাই বলেন, একটা মানুষ মারতে কয়টা গুলি করা লাগে?’

৭ বছর আগে নুরুজ্জামান জনিকে হত্যা করা হয়েছিল। বিচার না পাওয়ার কথা জানিয়ে তার স্ত্রী মুনিয়া আরও বলেন, ‘আমি তখন ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। আমার বাচ্চার বয়স এখন ৭ বছর চলছে। সে এখন ক্লাস ওয়ানে পড়ে। এখন আমার বাচ্চাকে বাবার নাম লিখতে লেট (মৃত) নুরুজ্জামান লিখতে হয়। বাচ্চা আমাকে প্রশ্ন করে, মামনি আমার ফ্রেন্ড আমাকে প্রশ্ন করেছে, ওর বাবার নামের আগে লেট নেই, আমার বাবার নামের আগে লেট কেন?’ মুনিয়া আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, এ দেশে বাবা-ভাইয়ের হত্যার বিচার হচ্ছে। আমরা কী বিচার পাব না?’

অনুষ্ঠানে কথা বলেন প্রায় ১০ বছর আগে এপ্রিলে গুম হওয়া বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসীনা রুশদীর। তিনি বলেন, এ ১০ বছরে আমরা বহুবার, বহু জায়গায়, বহু মাধ্যমে কথা বলেছি, বিষয়টি নিয়ে কথা বলাটা খুবই কষ্টের। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে আমার কোনো দাবি নেই। যারা নিজেরাই খুনের সঙ্গে জড়িত, তারা কখনোই এর বিচার করবে না। গুম কী জিনিস, তারা সেটা স্বীকার করে না। কারণ, এটা তাদের সৃষ্টি। প্রত্যাশা করি, আগামীতে আমরা নিশ্চয়ই এ গুম ও খুনের বিচার পাব।

অনুষ্ঠানে গুমের শিকার ছাত্রদল নেতা মাহফুজুর রহমানের (সোহেল) মেয়ে সাফা, নুরুল আলম নুরের মেয়ে উম্মে হাবিবা, সাজেদুল ইসলামের বোন আফরোজা ইসলামসহ অনেকে নিখোঁজ বাবা, ভাই ও সন্তানের জন্য আকুতি জানান। তারা সবাই গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান চান, ফিরে পেতে চান হারানো স্বজনদের।

ইফতার পার্টিতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ২০ দলীয় জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে গিয়ে গুমের শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারকে নিয়ে কৃষক দল ইফতার পার্টির আয়োজন করায় তাদের ধন্যবাদ জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধ।

এ অপরাধ আওয়ামী লীগ সরকার কয়েক বছর ধরে করছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে তারা রাজনৈতিক নেতাকর্মী, গণতন্ত্রের জন্য লড়াই-সংগ্রামকারীদের গুম করছে, খুন করছে, হত্যা করছে। মির্জা ফখরুল আরও বলেন, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী প্রায় ১০ বছর নিখোঁজ।

এ অনুষ্ঠানে আরও অনেকে আছেন, ছোট ছোট বাচ্চা ৮-১০ বছর ধরে তাদের বাবাকে খুঁজছে। এ রকম প্রায় ৬০০ পরিবার আছে। কিন্তু তারা প্রিয়জনকে পাচ্ছে না। এটা প্রমাণিত সত্য-তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল এবং তারা গুম হয়েছেন।

এ কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা র‌্যাবের ওপর এসেছে এবং অনেক কর্মকর্তার ওপরে এসেছে। তিনি আরও বলেন, আমরা যদি এ সরকারকে সরাতে না পারি, আওয়ামী লীগকে যদি সরাতে না পারি, তাহলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকবে না।

অত্যাচার-নির্যাতন, হত্যা-গুম-খুন সবকিছু বন্ধ করতে হলে প্রথম এ ভয়াবহ দানব সরকারকে সরিয়ে সত্যিকার অর্থে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটা আন্দোলন-গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে করতে হবে।

আসুন এ দোয়া করি, যে শিশু তার বাবাকে খুঁজছে, যে স্ত্রী তার স্বামীকে খুঁজছেন, যে মা তার সন্তানকে খুঁজছেন-আল্লাহ যেন পরিবারের মাঝে তাদের ফিরিয়ে দেন। আর এ ভয়াবহ দানব সরকারকে সরিয়ে দেশে যেন আমরা গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে পারি সে শক্তি যেন আমাদের দেন।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, একদিন তাদের (গুম-খুনের শিকার হওয়া ব্যক্তি) প্রতি করা অন্যায়ের বিচার হবে। এ সরকারের অবসান হবে। খুব বেশি দিন লাগবে না, যত অত্যাচার করেছে, একটার পর একটা ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা ধরা পড়ছে।

এটা আরও বেশি প্রকাশিত হবে। তিনি বলেন, এত বড় বড় প্রকল্প দেখায়, ব্রিজ দেখায়, ফ্লাইওভার দেখায়, পদ্মা ব্রিজ দেখায়, এখন দেখা যাচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে-এক বছর পর থেকে যে সুদ দিতে হবে, সেই সুদের টাকা পর্যন্ত নেই।

দেখা যাচ্ছে-প্রতিবছর বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ করার মতো টাকা দিনের পর দিন বেড়ে যাচ্ছে। সবদিক থেকে ধাওয়া খাওয়ার পর এমন পরিস্থিতিতে এ সরকার যাবে যে নিজের জায়গা থেকে একদম সামনে-পেছনে, ডানে-বাঁয়ে কোনো দিকে যাওয়ার সুযোগ পাবে না।’

কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুলের পরিচালনায় ইফতার অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, নিতাই রায় চৌধুরী, আমান উল্লাহ আমান, আবদুস সালাম, মশিউর রহমান, হাবিবুর রহমান হাবিব, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, শহিদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here