শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি ও শিমুলিয়া বাংলাবাজার এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ঈদযাত্রী নিরাপদে পারাপার করার ব্যবস্থা করাই অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে যাতায়াতের অন্যতম মাওয়া ও পাটুরিয়া অঞ্চলের এসব রুটে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি ও শিমুলিয়া বাংলাবাজার রুটে ফেরি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। মাঝিরকান্দিতে মাত্র একটি ফেরিঘাট রয়েছে। নেই পার্কিং ইয়ার্ড। ঈদের আগে সেখানে আরেকটি ফেরিঘাট ও পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা না হলে যাত্রী ও গাড়ি পারাপারে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে এমন আশঙ্কা করে বিআইডব্লিউটিএকে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে বিআইডব্লিউটিসি।
অপরদিকে আরিচা ফেরিঘাটের পার্কিং ইয়ার্ড ইজারা দেওয়া হয়েছে গরু বিক্রির হাট হিসাবে। শিমুলিয়ার দুটি ফেরি রুটে বড় গাড়ি পারাপার বন্ধের জেরে পাটুরিয়ায় গাড়ির চাপ বাড়তে শুরু করেছে। এছাড়া এসব রুটে চলাচলকারী সানকেন (নিমজ্জিত) ডেক বিশিষ্ট ছোট আকারের লঞ্চে যাত্রী নিয়ন্ত্রণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো। যদিও সম্প্রতি এক সভায় এসব লঞ্চ ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে তা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিউটিসি ও নৌ পরিবহণ অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের পাঁচ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
ওই সব কর্মকর্তা জানান, করোনা মহামারির রেশ কেটে যাওয়ায় এবার ঈদে এসব নৌরুটে যাত্রীর ঢল নামবে-এমনই ধারণা করছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের সামাল দিতে নৌবন্দরগুলোতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একাধিক টিম রাখা হবে। ঈদের আগেই শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে রাতেও ফেরি চলাচল শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে লঞ্চের পাশাপাশি ফেরিতে যাত্রী বহনেরও চিন্তা করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ সভা ডেকেছে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়। নৌপরিবহণ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
নৌপথে যাত্রীদের নিরাপদ পারাপারের চ্যালেঞ্জ জানতে চাইলে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, বর্ষা মৌসুমে ঈদ হলেও নদীতে প্রবাহ বাড়েনি। এটি কিছুটা হলেও স্বস্তির। তবে আশঙ্কার কথা হচ্ছে, ঈদযাত্রীরা অপরিকল্পিতভাবে বাড়ি রওয়ানা হলে তা বিড়ম্বনা ও ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এ কারণে আমরা ঈদের আগেই বেশকিছু নির্দেশনা দিতে যাচ্ছি। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে যাত্রীদের অনুরোধ জানাচ্ছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ঈদযাত্রা নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করব।
নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের আজকের বৈঠকের কার্যপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বৈঠকে যাত্রীদের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও বিদ্যমান সমস্যার বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব রাখা হয়নি। তবে যাত্রীসেবা নিশ্চিতে ১৩টি, যাত্রী নিরাপত্তায় ১৪টি, নৌরুট ব্যবস্থাপনায় ৬টি, নৌযান পুনর্বিন্যাসে ৩টি, কো-অর্ডিনেশনে ৭টি ও বিবিধ ৪টি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। কার্যপত্রে ঈগের আগে ৪ দিন ও পরে ৫ দিন লঞ্চে মোটরসাইকেল ও মালামাল পরিবহণ বন্ধ রাখা, ঈদের আগ মুহূর্তে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দিনে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল বন্ধ, নৌপথে চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বন্ধে পদক্ষেপ এবং নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রীবহন বন্ধের কথা বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কার্যপত্র ছাড়াও কর্মকর্তাদের আলোচনায় অনেক বিষয়ে উঠে আসবে। তখন সেগুলো নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ফেরিঘাটের সমস্যার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক যুগান্তরকে বলেন, ঘাট সমস্যা নিয়ে বিআইডব্লিউটিসির একাধিক চিঠি পেয়েছি। এসব বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত রয়েছে। মাঝিরকান্দিতে আরেকটি ফেরিঘাট ও একটি পার্কিং ইয়ার্ড করার বিষয়টি জমি পাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সেতু বিভাগ জমি দিলেই আমি ঘাট তৈরি করে দেব। আরিচার পার্কিং ইয়ার্ডে গরুর হাট বসানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ওই জায়গা অব্যবহৃত থাকায় জেলা প্রশাসন সেখানে বাজার ইজারা দিয়েছে। প্রয়োজন হলে সেটি আমাদের আওতায় নিয়ে আসব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি এবং শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে দেশের বরিশাল ও খুলনা বিভাগ এবং ফরিদপুর অঞ্চলের ২১ জেলার যাত্রীরা যাতায়াত করেন। পদ্মা সেতুতে বারবার ফেরির ধাক্কার কারণে শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে ফেরি চলাচল দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বর্তমানে সেটি চালু হলেও শুধু দিনে সীমিত আকারে চলছে। শনিবার এ রুটে মাত্র দুটি ফেরি চলাচল করেছে। অপরদিকে শিমুলিয়া-মাঝিরকান্দি রুটে তিনটি ফেরি চলাচল করছে।
তবে সমস্যা হচ্ছে মাঝিরকান্দিতে ফেরি ভেড়ার জন্য একটি ঘাট রয়েছে। মূল সড়কের সঙ্গে এ ঘাটের সংযোগ সড়কটি খুবই সরু। সেখানে গাড়ি পার্কিং করার মতো কোনো ইয়ার্ড নেই। নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদের আগে এ দুটি রুটে ফেরি বাড়িয়ে ১০টিতে উন্নীত করা হবে। শিমুলিয়া-বাংলাবাজার রুটে সারা রাত ফেরি চলাচল করতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এ রুটের তিনটি ফেরি বেগম রোকেয়া, ফরিদপুর ও ক্যামেলিয়া মেরামতের জন্য ডকইয়ার্ডে রয়েছে। তবে ঈদে এ দুটি রুটে বড় আকারের বাস পারাপার করবে না। শুধু ছোট গাড়ি পার হবে। অপরদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া এবং পাটুরিয়া-কাজিরহাট রুটে বর্তমানে ১৮টি ফেরি চলাচল করছে। ঈদে সেই সংখ্যা ২০টিতে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। লঞ্চের ওপর যাত্রী চাপ কমাতে এবারও ফেরিতে যাত্রী পরিবহণ করা হবে।


