ক্যাম্পাস ছাড়লেও পিছু ছাড়েনি ভোগান্তি, ক্ষোভ

0
237

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন গোলাম মোস্তফা। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন ছাত্র ফেডারেশন শাখার সভাপতি ও বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্সবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে পড়াশোনা শেষ করে ক্যাম্পাস ছাড়লেও সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মামলার ভার বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। এতে ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে অর্থ ব্যয়, বিদেশ গমন, চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তিনি।

শুধু গোলাম মোস্তফাই নন, এই ঘটনায় অন্তত আরও ২৭ জনের নামে চার্জশিট হওয়ায় এখনও এই মামলার ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। পড়াশোনা শেষ করে ক্যাম্পাস ছাড়লেও এখনও নিয়মিত রাজশাহীতে এসে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে তাদের। আর এ কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স বন্ধের দাবিতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী আন্দোলন শুরু করে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে হামলা চালায় পুলিশ-ছাত্রলীগ। এতে সাংবাদিকসহ শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এর পরদিনই নগরীর মতিহার থানায় পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চারটি মামলা দায়ের করে। মামলায় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীসহ ১৯০ জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৬০০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এর মধ্যে বেআইনি সমাবেশ, মারামারি, সরকারি কাজে বাধাদান ও ভাঙচুরের অভিযোগে ২০০ জনকে আসামি করে এবং বিস্ফোরক আইনে আরও ২০০ জনকে আসামি করে দুটি মামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

একই অভিযোগে ৯০ জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা ৩০০ জনকে আসামি করে আরও দুটি মামলা করে মতিহার থানা পুলিশ। এর মধ্যে বিস্ফোরক আইনের মামলা থেকে সবাই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তবে বেআইনি সমাবেশ ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়ায় এখনো ভুগতে হচ্ছে অভিযুক্তদের।

পুলিশের দেওয়া চার্জশিটে উল্লিখিত আসামিরা হলেন- গোলাম মোস্তফা, আহসান হাবিব রকি, উৎসব মোসাদ্দেক, ফারুক ইমন, সরেন, আসাদ, প্রদিপ মার্ডি, আবু সুফিয়ান বকশি, বাসার, দেবাষিষ রায়, সুজন, সজল, সাজু, সিহাব, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ১৭ জন সংগঠক ও সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সর্বমোট ২৭ জন।

তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও আন্দোলনের সংগঠক উৎসব মোসাদ্দেক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেভাবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দমন করা হয়েছে, তাতে এই সময়কাল নিপীড়নের সাক্ষী হয়ে থাকবে। এরকম ক্রমাগত নিপীড়ন অব্যহত থাকলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সম্ভব হতো না। তবে কোনো কিছু দিয়েই ছাত্র আন্দোলন দমানো যাবে না।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাবেক সভাপতি ও তৎকালীন আন্দোলনের সংগঠক প্রদীপ মার্ডি বলেন, ‘ভিত্তিহীন একটি অভিযোগে আমাদের দীর্ঘ সাত বছর ধরে কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে। কর্মময় জীবনে এসে নিয়মিত সময় করে হাজিরা দেওয়ার চেয়ে কষ্টকর কোনো বিষয় হতে পারে না।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন বলেন, ‘২০১৪ সালে খুবই যৌক্তিক দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা নিজেদের শাসক ও শিক্ষার্থীদের প্রজা ভাবেন; যে তারা যা বলবে, শিক্ষার্থীরা তাই শুনবেন। এটির প্রতিফল হিসেবে তৎকালীন আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এই মামলা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাইলেই উঠিয়ে নিতে পারে। আর মতিহার থানার মামলাও চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পন্ন করতে পারেন।’

মামলার আসামিপক্ষের রাজশাহী জর্জ কোর্টে আইনজীবী এস এম জ্যোতিউল ইসলাম সফি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলে আইনি প্রক্রিয়ায় সাক্ষী দিয়ে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারে। দীর্ঘদিন পর মামলাটি পুলিশ ফাইল থেকে বিচার ফাইলে গিয়েছে। এখন দ্রুতই এটি শেষ হবে বলে আশা করছি। ’

বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সরওয়ার জাহান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা উঠিয়ে নিতে পারে। আগের কিছু ঘটনায় সেটির নজিরও আছে। আর বর্তমানে ওই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় বাদী হয়ে করা মামলাটি এখন চলমান নেই। আর মামলা নিষ্পত্তির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই যেতে হবে।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here