দশ বছরে যক্ষ্মায় মৃত্যু অর্ধেকে নেমেছে

0
194

দেশে গত এক দশকে টিউবার কোলোসিস (টিবি) তথা যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ সময় প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। ২০১০ সালে দেশে যক্ষ্মায় আনুমানিক মৃত্যু ছিল প্রতি লাখে ৫৪ জন, যা ২০২০ সালে এসে তা কমে প্রতিলাখে ২৭ জনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ১০ বছরে রোগটিতে মৃত্যু অর্ধেকে নেমেছে। চিকিৎসা কলেবর বাড়ায় সুস্থতার হার গত ১০ বছর ধরে ৯৫ শতাংশের বেশি আছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে রোগটি সম্পর্কে আরও বেশি জনসচেতনতা বাড়াতে সারা বিশ্বের মতো আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস-২০২২। এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘ইনভেস্ট টু অ্যান্ড টিবি, সেভস লাইফ অর্থাৎ বিনিয়োগ করি যক্ষ্মা নির্মূলে, জীবন বাঁচাই সবাই মিলে।’

দিবসটি উপলক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চেষ্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সভা ও বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। আজ আইসিডিআরবির তত্ত্বাবধানে স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীর উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদ ভবনে যক্ষ্মা নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া সিভিল সার্জনদের উদ্যোগে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সচেতনতামূলক র‌্যালি, লিফলেট বিতরণসহ নানা কর্মসূচি পালিত হবে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যুগান্তরকে বলছেন, যক্ষ্মা বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের যে ৩০টি দেশে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা সবেচেয়ে বেশি তারমধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সরকারের জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির দেওয়া তথ্য বলছে ২০২১ সালে যক্ষ্মার উপসর্গ আছে এমন প্রায় ২৮ লাখের বেশি মানুষের পরীক্ষা করা হয়েছে। এ সময় ৩ লাখ ৭ হাজার ৪৪৪ জন নতুন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এ হিসাবে দৈনিক ৮৪২ জনের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ২১ হাজার ৪৮১ জন, চট্টগ্রামে ৬০ হাজার ০২২ জন, ঢাকায় ৮০ হাজার ১৩৭ জন, খুলনায় ৩৯ হাজার ৭৯৬ জন, ময়মনসিংহে ১৯ হাজার ৪৭ জন, রাজশাহীতে ২৯ হাজার ৩৩৫ জন, রংপুরে ৩১ হাজার ৭০৮ জন ও সিলেটে ২৫ হাজার ৯১৮ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তবে যক্ষ্মা থেকে সুস্থতার হার ৯৫ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন রোগটিতে ১০৭ জনের মৃত্যু হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি পরিসংখ্যান বলছে, এ সংখ্যা আরও বেশি। দিনে ১৮৫ জন মারা যাচ্ছেন। সংস্থাটির ২০১৯ সালের এক জরিপ বলছে দেশে যক্ষ্মায় প্রতি বছর সাড়ে ৬৭ হাজার মানুষ মারা যান।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, যক্ষ্মা বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় প্রতিদিন ৪ হাজার ১০০ জনেরও বেশি মানুষ রোগটিতে প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রতিদিন প্রায় ২৮ হাজার মানুষ এই প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী যক্ষ্মা প্রতিরোধের চেষ্টায় ২০০০ সাল থেকে আনুমানিক ৬ কোটি ৬ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। তবে করোনা মহামারি যক্ষ্মা শেষ করার লড়াইয়ের কয়েক বছরের অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথমবারের মতো ২০২০ সালে যক্ষ্মায় মৃত্যু বেড়েছে। ২০২০ সালে সারা বিশ্বে ৯৯ লাখ মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে ১৫ লাখ রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন।

জানতে চাইলে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ইভালুয়েশন ও মনিটরিং ব্যবস্থাপক ডা. আহমেদুল হাসান সুমন যুগান্তরকে বলেন, যক্ষ্মা নির্ণয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জিন এক্সপার্ট মেশিন, এলইডি মাইক্রোস্কোপি, লিকুইড কালচার, এলপিএ, ডিজিটাল এক্সরে সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। সারা দেশে ৪৯০টি জিন এক্সপার্ট মেশিন (করোনাকালীন সময়ে ২৩০টি স্থাপন করা হয়েছে) রয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ১১৯টি মাইক্রোস্কোপ ও ১৭৮টি ডিজিটাল এক্সরে মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। এসব পদ্ধতিতে ড্রাগ সেনসিটিভ ও ড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট উভয় ধরনের যক্ষ্মার প্রায় ৮৩ শতাংশ রোগী শনাক্তকরণ সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও একটি ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি ও পাঁচটি রিজিওনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরির মাধ্যমে যক্ষ্মা রোগ শনাক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ৪৪টি সরকারি বক্ষব্যাধি ক্লিনিক, ৭টি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতল, সদর হাসপাতাল, জেনারেল হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আন্তবিভাগ, বহির্বিভাগ এবং এনজিও ক্লিনিকে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। রোগ নির্ণয় পরবর্তী প্রতিটি রোগীকে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সেবন নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি রোগীর সঙ্গে একজন ডটস্ প্রভাইডার নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে রোগী শনাক্তকরণের সঙ্গে সঙ্গে এ রোগে মৃত্যুহার কমে এসেছে। ২০০৫ সাল থেকে সুস্থতার হার ৯৫ শতাংশের বেশি এবং বর্তমানে ৯৫ দশমকি ২৮ শতাংশ, যা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। সাফল্যের কারণে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার (এমডিআর) হারও কমে এসেছে।

বাংলাদেশে ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসায় সাম্প্রতিক আবিষ্কৃত নতুন ওষুধ বেডাকুইলিন ও ডেলামানিড ব্যবহার করা হচ্ছে। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মার চিকিৎসায় (ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর লক্ষ্যে) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশক্রমে ইনজেকশনের পরিবর্তে মুুখে ওষুধ খাওয়ানোর নতুন গাইডলাইন বাস্তবায়ন করছে। ২০২১ সালে ২৫ হাজার শিশু ও ১২ হাজার প্রাপ্তবয়স্ককে যক্ষ্মা প্রতিরোধী থেরাপি দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে যক্ষ্মা চিকিৎসার প্রথম সারির ওষুধ বা ফার্স্ট লাইন ড্রাগ সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ক্রয় করছে। বাংলাদেশ ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা নির্মূল করার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সুপারেন্টেন্ড অফিসার, ডা. আবদুল্লাহ মেহেদি জানান, বাংলাদেশ যক্ষ্মা রোগে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের একটি। বিশ্বের মোট রোগীর প্রায় ৩ দশমিক ৬ ভাগ বাংলাদেশে। জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালে দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, একজন যক্ষ্মা রোগী থেকে কমপক্ষে ছয়জনে রোগটি ছড়াতে পারে। তাই কোথাও একজন রোগী পাওয়া গেলে তার সম্পৃক্ত কমপক্ষে ছয়জনকেই পরীক্ষা করাতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here