চাপা পড়েছে ওদের কথা

0
152

এত এত সাফল্য এবারের বইমেলার। মানুষের আগমনও অনেক, বিক্রিও ভালো। কিন্তু সব প্রকাশনার জন্য এ চিত্রটি একরকম নয়। মেলায় আসা অনেক প্রকাশনা সেই অর্থে ভালো ব্যবসা করতে পারছে না। ভালো বই থাকার পরও তারা পাঠকের আড়ালে পড়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন। বইয়ে সমৃদ্ধ হওয়ার পরও স্টলগুলো কেবল পাঠকের দৃষ্টির আড়ালে পড়ে যাওয়ায় এই হাল হয়েছে। খরচ তুলে আনতেই অনেক প্রকাশককে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আজ শুক্রবার, ছুটির দিন। মেলা চলবে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলায় থাকছে শিশুপ্রহর।

বৃহস্পতিবার আড্ডার ফাঁকে কথা হয় ইন্তামিন প্রকাশনীর প্রকাশক এএসএম ইউনূছ, ডাক প্রকাশনীর প্রকাশক ফেরদৌস আলম ও ছোটদের জ্ঞান বিজ্ঞান একাডেমির প্রকাশক শামীম আহমেদের সঙ্গে। তারা জানান, অনেক প্রকাশকই আছেন যারা এক বা দুই ইউনিটের স্টল নিয়েছেন; কিন্তু সেই অর্থে ব্যবসা করতে পারছেন না। তাদের মধ্যে মেলার পূর্বপাশে ‘ভাসানচর’ এলাকার প্রকাশনাগুলোই প্রধান। ইন্তামিন প্রকাশনীর প্রকাশক এএসএম ইউনুছ যুগান্তরকে বলেন, যেদিকে আমাদের স্টল পড়েছে, সেদিকে শুক্র ও শনিবার ছাড়া লোকসমাগম খুবই কম। অনেক সময় প্রতিদিনের খরচ ওঠাতেও কষ্ট হয়। শুক্র ও শনিবার যা একটু বিক্রি হয়, সেটাই ভরসা। সন্ধ্যার সময় অনেক সময় লোকজন এখানে এই ‘ভাসানচরে’ একেবারেই আসে না বলে পরিচিত কয়েকজন শিল্পীকে আনিয়ে গানবাজনা করি। তাতে যদি এলাকাটা একটু সরব থাকে।

বৃহস্পতিবার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেল আসলেই পাঠকের আনাগোনা কম। একই সারিতে আছে ভালো মানের বইয়ের প্রকাশনা হিসাবে খ্যাত ‘মূর্ধন্য’। অনেক মানসম্পন্ন বই থাকা সত্ত্বেও বিক্রি খুব কম। ওদিকে থাকা শতাধিক প্রকাশনার একই হাল। কয়েকজন প্রকাশক আক্ষেপ করে বললেন, গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা এদিকে আসেন না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান প্রাঙ্গণের মূল মাঠ ও তার আশপাশে যেখানে লোকসমাগম, সেখানেই মিডিয়াগুলোও সরব। এদিন বিকালে পুরো সোহরাওয়ার্র্দী উদ্যানে হেঁটে দেখা যায়, বিকাল থেকেই মানুষ আসতে শুরু করেছে। এমনকি সন্ধ্যায় মেলা ছিল জমজমাট। কিন্তু তার বেশির ভাগই মেলার পশ্চিমাংশ, মধ্যভাগ ও পূর্বদিকে নামাজের জায়গার আগ পর্যন্ত। ‘ভাসানচর’ হিসাবে পরিচিত পাওয়া পূর্বভাগে লোকসমাগম খুব কম।

বিকাশে বিরক্তি : অনেক পাঠক এবার বইমেলায় বিকাশ প্রতিনিধিদের তৎপরতায় বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। মেলায় বিকাশের স্টল প্রচুর, সেটা সমস্যা নয়। সমস্যা হলো একটু পরপরই বিকাশের প্রতিনিধিরা মেলায় অবস্থান নিয়েছেন এবং একটু যেতে না যেতেই তাদের দেখা মিলছে। তারা প্রতিনিয়ত মেলায় আগত পাঠকদের কাছে জানতে চাচ্ছেন যে, তাদের বিকাশ অ্যাকাউন্ট আছে কি না। ধানমন্ডি থেকে আসা কলেজছাত্রী ফাহমিদা জারিন যুগান্তরকে বলেন, বিকাশের প্রতিনিধিরা স্টলে থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করলে এই বিরক্তি আসত না। এই পর্যন্ত চারবার মেলায় এসেছি। যতবারই এসেছি, ততবারই কয়েক দফায় তাদের মুখোমুখি হয়েছি। এটা কোনো স্মার্ট ওয়ে হতে পারে না। যার প্রয়োজন হবে, সে এমনিতেই বিকাশের স্টলে গিয়ে জানতে চাইবে।

এদিন বিকালে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হোসেন আবদুল মান্নান লিখিত ‘একটুখানি চাকরি’ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। উপস্থিত ছিলেন প্রকাশক ওসমান গণি ও লেখক হোসেন আবদুল মান্নান।

মঞ্চের আয়োজন : বিকালে বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা সাহিত্যচর্চা শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আহমাদ মাযহার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জসিম মল্লিক এবং শামস আল মমীন। সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের আত্মশক্তির বিকাশ হলে সাহিত্যেও তার প্রতিফলন ঘটবে এবং আন্তর্জাতিক মহলেরও বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে। এজন্য সাহিত্যে নিজস্ব জীবনবোধের সমন্বয় ঘটাতে হবে, মানসম্পন্ন অনুবাদ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলা সাহিত্যের প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে হবে। এদিন লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন বিশ্বজিৎ ঘোষ এবং সঞ্জীব পুরোহিত।

বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী আবু নাসের মানিক, মাসুদ রানা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কাশফুল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এবং ‘আমরা কুঁড়ি’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী বদিয়ার রহমান, আঁখি আলম, ওয়াদুদুর রহমান রাহুল, আবুল বাশার আব্বাসী, ডালিয়া সুলতানা, মো. আরিফুর রহমান।

নতুন বই : বৃহস্পতিবার বইমেলায় নতুন বই এসেছে ৫৯টি। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে ইন্তামিন থেকে প্রকাশ হয়েছে মহাদেব সাহার কবিতার বই ‘চাই বিষ অমরতা’, সেলিনা হোসেনের গল্পগ্রন্থ ‘গল্পের খেলাঘর’, কথাপ্রকাশ থেকে ইমদাদুল হক মিলনের ‘ভূতুড়ে’, অবসর থেকে ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সম্পাদিত ‘জীবনানন্দ দাশের কবিতার পাণ্ডুলিপি চিত্র’। নবান্ন প্রকাশনী প্রকাশ করেছে মুহম্মদ নূরুল হুদার কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুমমৌসুম’, ড. নূরুন নবীর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারত’, শিহাব সরকারের আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘দিনগুলি যায় না তবু না ফুরায়’ ও সেলিনা হোসেনের প্রবন্ধ ‘এক জীবনে বাংলা একাডেমি’, অন্যধারা প্রকাশ করেছে সাইমন জাকারিয়ার ফোকলোর ‘বাংলাদেশের লোকশিল্পী তালিকা’, নালন্দা প্রকাশ করেছে সুধাংশু শেখর বিশ্বাসের ভ্রমণগ্রন্থ ‘সিঙ্গাপুরের সিংহ’, ঐতিহ্য প্রকাশ করেছে সৈয়দ শামসুল হকের ভাষা আন্দোলনবিষয়ক ‘বাহান্নের বিজয়গাথা’, জয়তী প্রকাশ করেছে ইকবাল খন্দকারের কিশোর থ্রিলার ‘টার্গেট কিলার’, একাত্তর প্রকাশনী প্রকাশ করেছে ড. আব্দুস সাত্তারের স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ ‘আমেরিকার শিক্ষা’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. প্রকাশ করেছে ফাল্গুনী তানিয়ার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের নারীযোদ্ধা : বঙ্গবন্ধুর অবদান’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here