গোড়াতেই গলদ!

0
138

অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি বাড়ছে। গত ৩ মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমসে অবৈধ পণ্য আটকের কয়েকটি ঘটনায় বিষয়টির প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ট্রেড লাইসেন্স, আয়কর সনদ (করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন), ব্যবসা নিবন্ধন নম্বর (বিআইএন), আমদানি সনদ (আইআরসি) নিয়ে পণ্য আমদানি করছে চোরাচালান সিন্ডিকেট। কিন্তু এ চক্রের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। এসব জালিয়াতির পেছনে প্রত্যক্ষভাবে লাইসেন্স প্রদানকারী সংস্থাগুলোর গাফিলতিকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, কয়েকটি সনদ দেওয়ার আগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরেজমিন পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এ সুযোগে অসাধু চক্র নিরীহ ও অন্য ব্যক্তির নামে নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে সনদ বানিয়ে নিচ্ছে। এজন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সনদ দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশের প্রচলিত সব আইন অনুযায়ী, বাণিজ্যিকভাবে পণ্য আমদানি করতে সরকারি একাধিক দপ্তরের সনদ প্রয়োজন হয়। শুরুতে ব্যবসার প্রকৃতি অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এটি নেওয়া লাগে। এরপর টিআইএন নিতে হয় সংশ্লিষ্ট আয়কর অফিস থেকে। একই প্রক্রিয়ায় বিআইএন নিতে ভ্যাট অফিসের আবেদন করতে হয়। ব্যবসাসংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠনের সদস্য পদ নেওয়ার পর আইআরসির জন্য আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে আবেদন করতে হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই আবেদনকারীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র সনদ দেওয়া বাধ্যতামূলক।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়ন পরিষদ বিধিবদ্ধ পদ্ধতি অনুসরণ করছে না। সব অনিয়মের উৎপত্তি এই লাইসেন্স থেকেই শুরু। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানে সরেজমিন তদন্তের পর লাইসেন্স ইস্যুর বিধান থাকলেও লাইসেন্স সুপারভাইজাররা সেটি যথাযথভাবে মানছে না। ফলে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান ট্রেড লাইসেন্সের মাধ্যমে ব্যবসা করার বৈধতা পাচ্ছে। এই ট্রেড লাইসেন্স দেখিয়ে পরে টিআইএন গ্রহণ করছে সংশ্লিষ্ট আয়কর অফিস থেকে। সেখানেও আবেদনকারীর প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ছাড়াই শুধু ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত নাম-ঠিকানার ভিত্তিতে টিআইএন ইস্যু করছে। একই অবস্থা ভ্যাটের ক্ষেত্রে। আবেদন জমার পর প্রাথমিক তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বিধান থাকলেও সেটি মানা হচ্ছে না। কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার মাধ্যমে বিআইএন পাওয়া যাচ্ছে হরহামেশাই।

এ বিষয়ে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্যবসাসংক্রান্ত লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে (ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, বিআইএন, আইআরসি) যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে যারা লাইসেন্স দিয়ে থাকে তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। চোরাকারবারির পক্ষে একা ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে লাইসেন্স নেওয়া সম্ভব নয়। এতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের যোগসাজশ অবশ্যই রয়েছে এবং সেটা অবশ্যই অবৈধ লেনদেনের বিনিময়ে। এ ধরনের ঘটনা যে দপ্তরে ধরা পড়ুন না কেন, ব্যবসাসংক্রান্ত লাইসেন্স প্রদানকারী কর্মকর্তাকে জবাবদিহিতার আওতায় না আনলে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হবে না। পাশাপাশি এক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশের স্বার্থে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি বন্ধে কাস্টমসকে সজাগ ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি ইতোমধ্যে যেসব ঘটনা উদঘাটন হয়েছে, সেগুলো সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে নিজেদেরও গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রেখে অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে হবে। এ ধরনের অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা না গেলে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব হবে না।

সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো চট্টগ্রাম কাস্টমসের এক চিঠিতে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, গত বছরের ডিসেম্বর বাপ্পু ও আরাফাত এন্টারপ্রাইজ নামের দুটি প্রতিষ্ঠান কাগজ ঘোষণায় সিগারেটের জাল ব্যান্ডরোল আমদানি করে। এছাড়া মারহাবা ফ্রেশ ফ্রুটস নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান আপেল ঘোষণায় আপেলের মধ্যে লুকিয়ে সিগারেট আমদানি করেছে। কিন্তু ৩টি প্রতিষ্ঠানের একটিরও সরেজমিন গিয়ে অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ শুল্ক ফাঁকির উদ্দেশ্যে জালজালিয়াতির মাধ্যমে নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, বিআইএন ও আইআরসি নিয়ে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

এসব চোরাচালানের ঘটনায় কাস্টমসের নিজস্ব অনুসন্ধানের বর্ণনা দিয়ে চিঠিতে আরও বলা হয়, আমদানিকারক ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বিআইএন নিয়েছেন। রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি ও সিএনজিচালকের নামে এসব প্রতিষ্ঠান কাগজপত্র বানিয়ে কোটি কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। এতে বোঝা যায়, বড় চোলাচালানি চক্র এ কাজে জড়িত। এরা হয়তো প্রলোভন দেখিয়ে নিরীহ লোকজনের নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন, বিআইএন, আইআরসি ও ব্যাংক হিসাব খুলে মিথ্যা ঘোষণা পণ্য আমদানি করে শুল্ক ফাঁকির অপচেষ্টা করছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সুপারিশ : অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য আমদানি রোধে চট্টগ্রাম কাস্টমস দুটি সুপারিশ করেছে। প্রথমত, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিআইএন বাতিল এবং আইআরসি-ইআরসি বাতিলের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, আর্থিক সামর্থ্যরে তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের তালিকা সব কাস্টম হাউজে পাঠানো হলে সেসব প্রতিষ্ঠানের বিআইএন নজরদারির আওতায় আনা যাবে। তবে তার আগে সব ভ্যাট কমিশনারেট, শুল্ক গোয়েন্দা ও ভ্যাট গোয়েন্দার মাধ্যমে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ঠিকানা অনুযায়ী সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে অস্তিত্বহীন ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি এবং আর্থিক সামর্থ্যরে তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করে তালিকা করতে হবে।

এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি) আব্দুল মান্নান শিকদার বলেন, অস্তিত্বহীন বাণিজ্যিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করতে ইতোমধ্যেই দেশের সব ভ্যাট কমিশনারেটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কাস্টমস কমিশনারদের সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানের কায়িক পরীক্ষা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এখন অনলাইন আবেদনের প্রেক্ষিতে বিআইএন দেওয়া হয়। তাই সব ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয় না। তবে জাল-জালিয়াতি বন্ধে সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সমঝোতা চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি কার্যকর হলে জালিয়াতি বহুলাংশে কমে আসবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here