টাকা লেনদেনের ফোনালাপ ফাঁস

0
151

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের পাঁচটি অডিও ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। এতে একাধিক নিয়োগপ্রার্থীর সঙ্গে চবির একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথন উঠে এসেছে।

নিয়োগপ্রার্থীর সঙ্গে চবি উপাচার্যের সহকারী ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন এবং হিসাব নিয়ামক অফিসের কর্মচারী আহমেদ হোসেনসহ বেশ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার ঘটনা জানাজানি হলে উপাচার্যের সহকারী থেকে খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনকে সরিয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে বদলি করা হয়। অপর দিকে কর্মচারী আহমেদ হোসেনকে কারণ দর্র্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার চবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এসএম মনিরুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

প্রথম ফোনালাপ : চবি কর্মচারী-আপনি কি এখানে (চবিতে) ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের জন্য আবেদন করেছেন?

নিয়োগপ্রার্থী-আবেদন করেছি।

কর্মচারী-কোনো লবিং করেছেন কি?

নিয়োগপ্রার্থী-আপনি কে বলছেন, আপনার পরিচয়টা দিলে সুবিধা হয়।

কর্মচারী-আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টস থেকে বলছি। ১৪ তারিখ (১৪ নভেম্বর, ২০২১) আপনাদের (ইন্টারভিউ) মৌখিক পরীক্ষার তারিখ পড়েছে। এখানে আপনার নাম দেখে ফোন করেছি, লবিং করছেন কিনা, সেটা জানার জন্য।

নিয়োগপ্রার্থী-লবিং বলতে আমাদের চট্টগ্রাম আনোয়ারা থানার একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে একটা ডিও লেটার নিয়েছিলাম। যাই হোক আপনার নাম কী? বাড়ি কোথায় আপনার?

কর্মচারী-আমার নাম আহমদ হোসেন। বাড়ি এখানেই, হাটহাজারী।

নিয়োগপ্রার্থী-এখন কিভাবে কী করা যায়, আমাকে পরামর্শ দিন।

কর্মচারী-এখন তো আসলে লবিং ছাড়া কিছুই হবে না, এটা সবাই জানে।

নিয়োগপ্রার্থী-আমি আরবি বিভাগের এক ভাই এবং আমাদের চবির এক স্যারের সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছি। তারা ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। এখন বাস্তবতা কী, সেটা তো জানি না।

কর্মচারী-ঠিক আছে, এখানে চট্টগ্রামের দুজন আছে ক্যান্ডিডেট, এর মধ্যে আপনি একজন। যাই হোক, যদি প্রয়োজন মনে করেন অ্যাডভান্স দিতে পারবেন, ফোন দেবেন আরকি। আর যেহেতু আপনার পরিচিত মানুষ আছে, দেখেন কী করা যায়।

দ্বিতীয় ফোনালাপ : নিয়োগপ্রার্থী-আমাকে পদ্ধতিটা শিখিয়ে দিন, কার মাধ্যমে কী করতে হবে?

কর্মচারী-একটা জিনিস আপনিও বোঝেন, আমিও বুঝি, সবাই বোঝে। বর্তমান পরিস্থিতিতে লেনদেন ছাড়া কোনো কিছুই হয় না। এজন্য মন্ত্রীর সুপারিশ বলেন বা যার সুপারিশই বলেন, কোনো কিছুই কার্যকরি হবে না। কারণ সব জায়গায় টাকা লাগে। এখন কথা হলো আপনাকে যদি ম্যাডামের (চবি উপাচার্য) সঙ্গে বসিয়ে দিই, আর ম্যাডাম যদি রাজি হন-তাহলে আপনাকে অর্ধেক পেমেন্ট (টাকা) আগে দিয়ে ফেলতে হবে। আর বাকি অর্ধেক আপনি অ্যাপয়েনমেন্ট লেটার পাওয়ার পর দিবেন।

নিয়োগপ্রার্থী-কাকে দিতে হবে পেমেন্ট? ম্যাডাম কে?

কর্মচারী-ম্যাডামকে না, ম্যাডাম কী সরাসরি (টাকা) নেবে নাকি? তাছাড়া ম্যাডাম আবার মন্ত্রণালয়ে লাইনঘাট সব ম্যানেজ করবেন। যাই হোক, এটা আমি জানি বলেই আপনাকে জানালাম। এখন আপনার যদি সম্মতি থাকে তাহলে আমি আলাপ করে দেখতে পারি। ম্যাডাম যদি রাজি হন, তাহলে আপনি অর্ধেক পেমেন্ট করবেন এবং পেমেন্ট যে করছেন সেটার একটা চেক অথবা ডকুমেন্ট দিতে হবে। কিন্তু ম্যাডাম যদি ‘না’ বলেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রীও যদি ব্যক্তিগতভাবে সুপারিশ করেন কোনো কাজ হবে না। এটাই শেষ কথা। কারণ ম্যাডাম নিজেও তো আসছেন অনেক টাকা খরচ করে। তবে এ সব কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না। তাহলে আপনারও বিপদ, আমারও বিপদ। এখন আপনার যদি সম্মতি থাকে এবং ম্যাডাম যদি রাজি হন, তাহলে একটা কন্ট্রাক্ট করা যায়।

নিয়োগপ্রার্থী-বুঝতে পারলাম, অ্যামাউন্ট কত?

কর্মচারী-অ্যামাউন্ট হলো ১৬।

নিয়োগপ্রার্থী-তাহলে তো কঠিন অবস্থা।

কর্মচারী-তৃতীয় শ্রেণির একটা চাকরির জন্য এখন ১০-১২ লাখ টাকা লাগে। চতুর্থ শ্রেণির-যেমন মালি, প্রহরীর এসব চাকরির জন্য লাগে আট লাখ টাকা। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলো সর্বোচ্চ সম্মানী পদ। কাজেই এখানে ১৬ লাখের কম দিলে হবে না।

নিয়োগপ্রার্থী-কার মারফতে দিতে হবে টাকা?

কর্মচারী-সেটা পরে জানাব। আগে আপনার যদি সম্মতি থাকে, তাহলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। যেভাবেই হোক আমি সেটা নেওয়ার ব্যবস্থা করব।

নিয়োগপ্রার্থী-ঠিক আছে।

কর্মচারী-যেহেতু চট্টগ্রামের বাহিরের মানুষ বেশি (নিয়োগপ্রার্থীদের মধ্যে)। চট্টগ্রামের মধ্যে আছেন আপনারা দুজন। আর আমিও চাই যে চট্টগ্রামের একজনের হোক। চট্টগ্রামের মানুষ হিসাবে চট্টগ্রামের যারা তাদের পক্ষে থাকাটাই তো স্বাভাবিক। এজন্য চট্টগ্রামের দুজনকেই বলছি আমি এ বিষয়ে।

নিয়োগপ্রার্থী-চট্টগ্রামের মধ্যে তো ৪-৫ জন আবেদন করেছে। রেজাল্ট ভালো দুজনের আরকি।

কর্মচারী-ও রকম হলে তো আমরা জানতাম। শুধু আবেদন করলেই তো হবে না। রেজাল্টও তো ভালো হতে হবে।

নিয়োগপ্রার্থী-ঠিক আছে। আমি দেখি, যদিও আমার জন্য এ টাকা ম্যানেজ করা কষ্টকর হয়ে যাবে। আমি গরিবের ছেলে। পড়াশোনা করেছি কষ্ট করে।

কর্মচারী-যাই হোক চিন্তাভাবনা করে জানাবেন। আর রেজাল্টও লাগবে। যার কারণে দুইটাই (রেজাল্ট এবং টাকা) প্রয়োজন। এখন এটা আপনার সম্মতির ওপর। এটা চাইলে বাইরের কাউকেও বলতে পারতাম।

নিয়োগ প্রার্থী-জি, পারলে দেব, না পারলে সাধারণভাবে গিয়ে পরীক্ষা দেব আরকি। যদিও এত টাকা সংগ্রহ করা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে।

কর্মচারী-ঠিক আছে আপনি চিন্তাভাবনা করে দেখেন।

তৃতীয় ফোনালাপ (ঢাবি ও চবির ফারসি বিভাগের দুই ছাত্রের কথোপকথন) : চবি ছাত্র-আব্দুল করিম (ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সভাপতি) স্যারের রুমে ঢোকার আগে ওয়াক্কাসকে (আরও এক নিয়োগপ্রার্থী) বলে দিয়েছি যে, তোমাকে ভাইভাতে কী কী জিজ্ঞেস করেছে এটা বলবে না এবং ভিসি ম্যাডাম কী কী বলেছে, সেটাও বলবে না। কারণ সে পলিটিক্স বোঝে না। এ ছাড়া আমি আপনাকে ভাইভার সময় নিচে (প্রশাসনিক ভবনের) জানিয়েছিলাম না, যে কথাবার্তা বলছেন কিনা? এটা কেন বলছি জানেন?

ঢাবি ছাত্র-কেন বলছেন?

চবি ছাত্র-কারণ ভিসি ম্যাডামের ভাতিজা (আফজাল কামাল চৌধুরী শাওন) মান্নান ভাইকে (ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স বিভাগের ল্যাব সহকারী) বলছে-‘চট্টগ্রামের যে ছেলেগুলো আছে, তারা লবিং করেছে কিনা তিনি জানেন না।’

মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে আমার ২০ বছরের সম্পর্ক। তিনি আমাকে বলেছেন-‘চট্টগ্রামের কেউ আছে কি না? থাকলে ম্যানেজ করে দিতে পারতাম।’

তো আমি বলছি, চট্টগ্রামের একজন আছে আমাদের। আমি যোগাযোগ করে দেখি। সেজন্য আপনি কতটুকু লবিং করতে পারছেন বা পারেননি সেটা তো আমি জানি না। ওই নিউজটা আপনাকে দিলাম।

ঢাবি ছাত্র- জি, বুঝতে পেরেছি।

চতুর্থ ফোনালাপ : চবি ছাত্র-ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ সিদ্দিকী ওয়াক্কাসকে (মুহাম্মদ ওয়াক্কাস- ভাইভা বোর্ডের সুপারিশ পাওয়া নিয়োগপ্রার্থীদের একজন) ফোন দিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াক্কাস আমাকে কল দিয়ে বিষয়টি জানায়। আমি বললাম, ‘সিদ্দিকী স্যার তো আমাদের কাছের মানুষ, কী বলেছে স্যার? সে বলল, স্যার একটা মোবাইল নম্বর দিয়েছে তাকে। নম্বরটা ওর কাছ থেকে নিয়ে দেখলাম যে এটা রবীন স্যারের (ডেপুটি রেজিস্ট্রার খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন) নম্বর। পরে আমি ওয়াক্কাসকে রবীন স্যারের কাছে তাড়াতাড়ি যেতে বললাম। তা ছাড়া রবিন স্যার ভিসি ম্যামের কাছের মানুষ।

ঢাবি ছাত্র-আচ্ছা, তারপর?

চবি ছাত্র-ওয়াক্কাসকে আমি আগেই বলেছি, এখানে টাকা পয়সার যেহেতু একটা বিষয় আছে, টাকার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তুই যতটুকু দিতে পারবি, সেটা বলবি। রবীন স্যার কনফার্ম করে দেবে। পরে রবীন স্যার ওয়াক্কাসকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য বলেছে। আমি বিষয়টা ডিপার্টমেন্টের কোনো শিক্ষককেও বলতে নিষেধ করেছি। আপনিও এটা কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না।

ঢাবি ছাত্র-এখন ওয়াক্কাস কি পাঁচ লাখ টাকা দিতে পারবে?

জসিম উদ্দিন-না, ও বোধহয় পাঁচ লাখ দিতে পারবে না।

পঞ্চম ফোনালাপ (উপাচার্যের সহকারী ও নিয়োগপ্রার্থীর মধ্যে কথোপকথন) : খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন-ম্যাডামের (উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার) সঙ্গে দেখা হলে তোমার কথা বলব। ম্যাডাম যেভাবে বলে সেভাবে হবে।

নিয়োগপ্রার্থী-ঠিক আছে, আপনি একটু দয়া করে আমার বিষয়টা দেখবেন আরকি!

খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন-ঠিক আছে ইনশাআল্লাহ। চট্টগ্রামের দেখেই তো আমি টান দিলাম (তোমাকে)। কিন্তু প্রেক্ষাপট বা বাস্তবতা হলো এগুলোই হচ্ছে সব জায়গায়। আমি তোমার ভাবির (খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীনের স্ত্রী) জন্যও চেষ্টা করেছি। কিন্তু গতবার আমি শুধু এটা (টাকা) দেইনি বলেই হয়নি (চাকরি)। আমি এখানেই আছি, অথচ আমার স্ত্রী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছে। বর্তমানে সে (আমার স্ত্রী) সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে আছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে চুক্তি করিনি বলেই হয়নি এটা। অন্যথায় এতদিনে হয়ে যেত। সোজা কথা এটাই।

নিয়োগপ্রার্থী-আপনি যে কারণে ভিক্টিম হয়েছিলেন। আপনি যেহেতু এখন ম্যাডামের সঙ্গে আছেন, অন্য কেউ যেন এমন ভিক্টিম না হয়, আমি আপনার কাছে এটা আশা করব আরকি।

খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন-আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। তবে বাস্তবতা যেটা, সেটা আমি তোমাকে ইঙ্গিত করলাম।

নিয়োগপ্রার্থী-বুঝতে পেরেছি। আপনি যদি ম্যাডামের (উপাচার্য) সঙ্গে আমার সাক্ষাতের বিষয়টা নিশ্চিত করতে পারেন, তাহলে আমি বিষয়টা দেখব ইনশাআল্লাহ।

খালেদ মিছবাহুল মোকর রবীন-ঠিক আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চবির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এসএম মনিরুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, নিয়োগসংক্রান্ত কথোপকথনের কয়েকটি অডিও রেকর্ড আমাদের হাতে এসেছে। এ ব্যাপারে ৯ জানুয়ারি হাটহাজারী থানায় একটি জিডি করা হয়েছে। আমরা নিজেরাও বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। ইতোমধ্যে একজনকে বদলি ও অপর একজনকে শোকজ করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here