করোনা মহামারি মানবসমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তছনছ করেছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এখনো নানাভাবে করোনা তার ক্ষতচিহ্ন রেখে যাচ্ছে। আর সেসব কথাই উঠে এসেছে সাহিত্যের নানা শাখার লেখায়। লেখকরা উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা এমনকি কৌতুকেও তুলে এনেছেন আড়াই বছর ধরে চলা করোনা মহামারিকে।
গত বছর বইমেলায় করোনা মহামারি নিয়ে কিছু বই প্রকাশ হলেও তা সেই অর্থে আলোয় আসতে পারেনি। কারণ বইমেলাই পড়ে গিয়েছিল মহামারির বাস্তবতায়। নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ হয় মেলা। এবারের বইমেলা সেদিক থেকে অনেক ভালো অবস্থায় থাকার কারণে করোনা ও করোনা মহামারিবিষয়ক লেখা বইগুলো সবার সামনে আসছে। অনেক পাঠক সেগুলো আগ্রহ ভরে কিনছেনও।
বৃহস্পতিবার বইমেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে করোনা ও কারোনাকালবিষয়ক বেশকিছু বইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়। গত বছর সময় প্রকাশন থেকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের রচিত ‘করোনাকালে’ শিরোনামে বই প্রকাশ করেন। এই বইয়ে করোনকালের বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক নানা বিষয় উঠে এসেছে। বইটি এবারও পাওয়া যাচ্ছে।
আগামী থেকে এবারের বইমেলায় অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী রচিত ‘করোনাভাইরাসের সঙ্গে মাদক ও তামাকের সম্পর্ক’ বই প্রকাশ হয়েছে। প্রথমা থেকে প্রকাশ হয়েছে ‘কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস : যা জানা দরকার’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ বই। ড. মাইকেল মোসলি রচিত বইটি ভাষান্তর করেছেন আবুল বাসার। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের দুইটি বইয়ে এবার উঠে এসেছে করোনা ও করোনাকাল। শিশুদের জন্য তার গুড্ডুবুড়া সিরিজের ‘গুড্ডুবুড়ার করোনার প্রতিরোধক আবিষ্কার’ প্রকাশ হয়েছে একই প্রকাশনী থেকে। পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশ হয়েছে লেখকের ‘করোনাকালের কৌতুক’ শিরোনামের আরেকটি বই। প্রথমা থেকে এসেছে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রচিত ‘যুদ্ধোত্তর কাল থেকে করোনাকাল : বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বই।
বাংলানামা থেকে প্রকাশ হয়েছে ওয়াদুদ খানের ‘করুণাহীন করোনার দিন’ শিরোনামে উপন্যাস। প্রকাশনাটির দাবি, করোনাভাইরাসের প্রেক্ষাপটে লেখা বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস এটি। অবসর থেকে প্রকাশ হয়েছে খসরু পারভেজ সম্পাদিত ‘করোনাকালের কবিতা: আরও এক বিপন্ন বিস্ময়’ শিরোনামে কবিতার বই। একই প্রকাশনা থেকে বের হয়েছে আবু মো. দেলোয়ার হোসন রচিত ‘করোনাকালীন ভাবনায় সেকাল-একাল’ বইটি। ঐতিহ্য নিয়ে এসেছে স্লাভোয় জিজেক রচিত ‘প্যানডেমিক ২ : ক্রনিকলস অব অ্যা টাইম লস্ট’ বই। বইটি অনুবাদ করেছেন ড. মাসুদ আলম। গত বছর ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের লেখা ‘করোনা কাহিনী’ বইটি এবারের বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে ভোরের কাগজ প্রকাশনের স্টলে। এদিকে বৃহস্পতিবারের বইমেলা ছিল গত কয়েক দিনের মতোই জমজমাট। সন্ধ্যার পর প্রচুর মানুষের সমাগম, আড্ডা আর বই কেনার মধ্য দিয়েই মেতে ছিলেন সবাই।
মঞ্চের আয়োজন : এদিন বিকাল গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের সংবিধান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফউজুল আজিম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাহিদা বেগম এবং কুতুব আজাদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক খুরশীদা বেগম।
প্রাবন্ধিক বলেন, বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য ছিল এ দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। কিশোর বয়সে একটি সেবা সংগঠনের মাধ্যমে দেশসেবার যে ব্রতের সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন-আন্দোলন, সংগ্রাম, জেল-জুলুম, দাঙ্গা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি নানা রকম সংকটপূর্ণ জীবন অতিক্রম করে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। তার সফল প্রতিফলন ঘটেছে ১৯৭২ সালে গৃহীত ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’র সংবিধানে। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সংবিধান বাঙালি জাতির আত্মজীবনী আর সেই আত্মজীবনীর রূপকার আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
এদিন লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন রাশেদ রউফ এবং মজিদ মাহমুদ। অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মাহবুব সাদিক, নুরুন্নাহার শিরীন এবং চঞ্চল শাহরিয়ার। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ফয়জুল আলম পাপ্পু, মীর মাসরুর জামান রনি এবং সুপ্রভা সেবতি। সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘মৈত্রী শিশুদল’র পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা, সালাউদ্দিন আহমেদ, এমএম উম্মে রুমা ট্রফি, মো. মেজবাহ রানা এবং একেএম শহীদ কবীর পলাশ।
ভাষাশহিদ মুক্তমঞ্চের অনুষ্ঠান : বিকালে এই মঞ্চে শুরু হয় কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ। স্বরচিত কবিতাপাঠে অংশ নেন ২৫ জন কবি। পরে প্রদর্শিত হয় নাসির উদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’।
বইমেলায় শিশুপ্রহর আজ : শুক্রবার মেলার প্রথম শিশুপ্রহর। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে এই শিশুপ্রহর।
নতুন বই : বৃহস্পতিবার মেলায় নতুন বই এসেছে ১০৬টি। উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে অন্বেষা প্রকাশন এনেছে জিল্লুর রহমানের উপন্যাস ‘ঘোর’, কথাপ্রকাশ এনেছে আনিসুল হকের কিশোর গল্প ‘ছোটদের বকুলমালা ভূত এবং হাসির গল্প’ ও সালেক খোকনের ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী বিষয়ক বই ‘সমতলের বারো জাতি’, চিরদিন প্রকাশনী এনেছে এসএম জাকির হোসেনের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই ‘একাত্তরে বিদেশি সুহৃদ-দুঃসময়ের সারথি’, বাংলা একাডেমি এনেছে মুস্তাফা মজিদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিচয়’, সময় প্রকাশন এনেছে শওকত ওসমানের প্রবন্ধ ‘সমুদ্র নদী সম্পর্কিত’, অন্যপ্রকাশ এনেছে সাদাত হোসাইনের উপন্যাস ‘প্রিয়তম অসুখ সে’, বিদ্যাপ্রকাশ এনেছে জাকিয়া খানের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক বই ‘যুদ্ধদিনের স্মৃতি’, পুথিনিলয় এনেছে যতীন সরকারের প্রবন্ধ ‘প্রাকৃতজনের জীবন দর্শন’।


