প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে সে দেশে বাংলাদেশের পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। ভারত সরকারকে এ ব্যাপারে অনুরোধ জানানোর জন্য একাধিক পক্ষের উদ্যোগ রয়েছে। অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক্কের কারণে ভারতে পাটপণ্য রপ্তানিতে কোন ধরনের সমস্যা হচ্ছে, সে ব্যাপারে বেসরকারি রপ্তানিকারকদের মতামত নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএমএ) পক্ষ থেকেও আলাদা করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, রপ্তানিকারকের কাছ থেকে প্রকৃত অবস্থাটা শুনতে চায় প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে আজ সোমবার তাঁদের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
উৎপাদন মূল্যের তুলনায় কম মূল্যে বাংলাদেশের পাটপণ্য ভারতে রপ্তানি হচ্ছে- সে দেশের উৎপাদকদের এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানিতে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমিডিস (ডিজিটিআর)। প্রতি টন পাটপণ্যে ১৯ থেকে ৩৫২ ডলার পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। পাঁচ বছর পর মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ভারত। এর অংশ হিসেবে ‘সানসেট রিভিউ নোটিফিকেশন’ বা চূড়ান্ত পর্যালোচনা নোটিশ জারি করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। গত ১১ থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত ঢাকায় এসে ভারতের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ট্যারিফ কমিশনের সহকারী প্রধান আবদুল লতিফ সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই সানসেট রিভিউ করছে ভারত।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি পাঠানো বিজেএমএর চিঠিতে জানানো হয়, মোট রপ্তানির অন্তত ৬০ শতাংশ যায় ভারতে। পাঁচ বছর আগে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করায় উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিপাকে পড়ে যান উদ্যোক্তারা। কোনো কোনো মিল উৎপাদন কমিয়ে আনে। টিকতে না পেরে কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। গত পাঁচ বছরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এ শুল্ক প্রত্যাহার করেনি ভারত। বরং পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে আরও পাঁচ বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটি।
এ পরিস্থিতিতে বিজেএমএ চায়, প্রধানমন্ত্রীর সফরে ভারত সরকারকে পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হোক। এ বাধা দূর হলে ভারতে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার পাটপণ্য রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া চিঠিতে বিজেএমএ বলেছে, অ্যান্টিডাম্পিংয়ের কারণে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লোকসানের কারণে চালু মিলগুলোও ঋণে জর্জরিত। অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারে প্রয়োজনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) আপিল করারও অনুরোধ জানানো হয় চিঠিতে।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তকে একতরফা বলে দাবি করে আসছে বাংলাদেশের মিলগুলো। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা কোন যুক্তিতে উৎপাদন মূল্যের চেয়ে কম দামে পাট রপ্তানি করতে যাবে। বিজেএমএর চেয়ারম্যান আবুল হোসেন গতকাল সমকালকে জানান, প্রমাণ ছাড়াই অন্যায়ভাবে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে রেখেছে তারা। প্রতিবেশী হিসেবে এটি অনাকাঙ্ক্ষিত সিদ্ধান্ত। ১২০টি দেশে তারা পাটপণ্য রপ্তানি করে। অথচ কোনো দেশ থেকে এ ধরনের অন্যায় সিদ্ধান্ত আসেনি।
বিজেএমএ মহাসচিব আব্দুল বারেক খান সমকালকে বলেন, সংশ্নিষ্ট খাতের বেশির ভাগ দেশীয় পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেই কেবল এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে কোনো দেশ। কিন্তু ভারত বাংলাদেশকে কোনো তথ্য বা ব্যাখ্যা না দিয়েই অন্যায়ভাবে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে রেখেছে।
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অন্যান্য খাতে রপ্তানি অনেক বাড়লেও ভারতের সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশের পাটপণ্য রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ১১৩ কোটি ডলারের পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে; যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩ শতাংশ কম।


