সোমবার ,১৫ জুন, ২০২৬
sbacbank
Home Blog Page 417

‘চীনের কাছে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা চাইছে রাশিয়া

চীনের কাছে সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় ধরনের সহায়তা চাইছে রাশিয়া। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি) এবং নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কো চাইছে বেইজিং ইউক্রেনে ব্যবহারের জন্য সামরিক উপকরণ সরবরাহ করুক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এফটি জানিয়েছে, রাশিয়া আগ্রাসনের শুরু থেকেই চীনা সরঞ্জামের জন্য অনুরোধ করে আসছে। তবে ওই কর্মকর্তারা রাশিয়া কী ধরনের সরঞ্জাম চাইছে তা উল্লেখ করতে অস্বীকার করেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, চীন সম্ভবত সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে— এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনেও মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে দাবি করা হয়েছে যে রাশিয়া নিষেধাজ্ঞার প্রভাব প্রশমিত করতে চীনের কাছে অর্থনৈতিক সহায়তাও চাইছে।

চীন এখন পর্যন্ত রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে নিজেকে নিরপেক্ষ হিসাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। দেশটি এখনও রুশ হামলার নিন্দা করেনি।

সোমবার মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান রোমে চীনা পররাষ্ট্র দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা ইয়াং জিচির সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

রবিবার এনবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় সুলিভান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এটা নিশ্চিত করবে যে চীন বা অন্য কেউ যেন রাশিয়ার অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে না পারে। সূত্র: বিবিসির।

মেলিওপোলে নতুন মেয়র নিয়োগ রাশিয়ার

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মেলিওপোলের মেয়রকে গুম করার অভিযোগ উঠেছিল রাশিয়ার বিরুদ্ধে। এবার আগের মেয়রের স্থলে নতুন মেয়রকে দায়িত্বে বসানোর কথা শোনা যাচ্ছে। আগের মেয়রকে গুমের একদিনের মাথায় নতুন মেয়রকে দায়িত্বে বসানোর খবর সামনে এলো।

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর দুদিনের মাথায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি দখলে নেয় রুশ সামরিক বাহিনী। শুক্রবার বিকালে শহরের মেয়র ইভান ফেদোরভকে রাশিয়ার সেনারা গুম করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। রোববার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, শুক্রবার বিকালে মেলিওপোল শহরের মেয়র ইভান ফেদোরভকে গুমের পর শনিবার স্থানীয় টিভি পর্দায় হাজির হন সিটি কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি গ্যালিনা ড্যানিলচেঙ্কো। এ সময় ‘নতুন বাস্তবতার অধীনে মৌলিক প্রক্রিয়া’ গড়ে তোলার বিষয়টি তার প্রধান কাজ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ড্যানিলচেঙ্কো বলেন, শহরের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তিনি ‘জনগণের ডেপুটিদের একটি কমিটি’ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে শহরের বাসিন্দাদের ‘চরমপন্থি কর্মকাণ্ডে’ অংশ না নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

ড্যানিলচেঙ্কোর ভাষায়, ‘সম্মানিত জনপ্রতিনিধিগণ, আমরা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়েছি। সর্বোপরি আমাদের কর্তব্য হচ্ছে— জনগণের কল্যাণের বিষয়টি নিশ্চিত করা।’

মেলিওপোল ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি শহর। এটি মারিওপোল এবং খেরশন শহরের লাগোয়া।

বাঁধা আয়ে অচল সংসার

করোনা শুরুর পর থেকে গত দুই বছরে মানুষের জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য ও সেবার দাম আকাশচুম্বী। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি, গণপরিবহণের ভাড়া বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে লাগামহীন। বেড়েছে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের মূল্যবৃদ্ধি মানুষকে অস্থির করে তুলেছে। এছাড়া কর আরোপের ফলে বেড়েছে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সেবার ব্যয়।

সে তুলনায় আয় বাড়েনি। উলটো কিছু ক্ষেত্রে আয় কমেছে। জীবনযাপনে মানুষকে আপস করতে হচ্ছে দৈনন্দিন চাহিদার সঙ্গে। সাধ, আহ্লাদ বা আবশ্যক এমন অনেক কিছু বাদ দিতে হচ্ছে। কারণ বাঁধা আয়ে সংসার প্রায় অচল, আর যেন চলছে না। চাহিদা মেটাতে আয়ও বাড়ানো যাচ্ছে না। অনেকের সঞ্চয়ে টান পড়েছে। আগের সঞ্চয় ভেঙে পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছে। এর প্রভাবে ব্যাংকে সঞ্চয় কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা ও জোগানে ভারসাম্যহীনতা, ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার লোভে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লাগামহীন ব্যয় বৃদ্ধিতে মানুষ যে কতটা কষ্টে আছে তা বোঝা যায়, টিসিবির ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখে। একটু কম দামে পণ্য কিনতে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। এই সারিতে এখন আর শুধু নিম্নবিত্তের মানুষ নেই। এতে যুক্ত হয়েছে মধ্য আয়ের মানুষেরাও। ফলে টিসিবিও চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের জোগান দিতে পারছে না।

জানা গেছে, সরকারিভাবে জীবনযাত্রার ব্যয়ের হিসাব করা হয় মূল্যস্ফীতির হার দিয়ে। ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের তুলনায় গত জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে প্রায় ৬ শতাংশ। বিবিএসের হিসাবে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতির হার পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (২০২১ সালের জানুয়ারির তুলনায় গত জানুয়ারি) ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। কিন্তু সানেমের হিসাবে এই হার ১২ শতাংশের বেশি। শহর এলাকায় সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন ১২ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং গ্রামে ১২ দশমিক ১০ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবে দেখা যায়, করোনার প্রভাব ও অন্যান্য কারণে গত দুই বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা বেড়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ। তাদের হিসাবে অন্যান্য খাতেও মানুষের আয় বেড়েছে। দেশে মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি খাতে, ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে। সরকারি খাতের কর্মীদের আয় সামান্য বাড়লে বেসরকারি খাতে বাড়েনি। বরং কমেছে। এর মধ্যে এসেছে মূল্যস্ফীতির আঘাত।

এদিকে বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার হিসাবে দেখা যায়, করোনার কারণে গত দুই বছরে মানুষের আয় কমেছে। এতে আড়াই কোটি লোক নতুন করে দারিদ্র্যের আওতায় নাম লিখিয়েছিল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ফলে কিছু মানুষ নতুন দারিদ্র্যের আওতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখনো ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) যৌথ জরিপে বলা হয়, করোনার দুই ধাপে মানুষের আয় কমেছে। যারা চাকরিচ্যুত হয়েছেন তারা সবাই আগের বেতনে চাকরিতে যেতে পারেননি। কম বেতনে গেছেন অনেকে। মানুষের খাদ্য বাজেটও কমেছে। ৩৭ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়েছে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বিবিএসের এক জরিপে বলা হয়, করোনার প্রভাবে দেশে পরিবারপ্রতি গড়ে ৪ হাজার টাকা করে আয় কমেছে। ফলে খাবার গ্রহণের হারও কমেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, হঠাৎ করে পণ্য বা সেবার মূল্য বেড়ে যাওয়ার নজির আছে ভূরি ভূরি। কিন্তু হঠাৎ করে আয় বাড়ানো যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে স্বল্প বা মধ্যম আয়ের মানুষকে প্রথমে ব্যয় কমাতে হয়। এতে চাহিদার অনেক কিছু কাটছাঁট হয়ে যায়। তাতে কাজ না হলে সঞ্চয় করা কমিয়ে দেয়। তাতেও সম্ভব না হলে আগের সঞ্চয় ভাঙতে শুরু করে। তিনটি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। চাহিদার মধ্যে খাদ্যে কাটছাঁট করলে পুষ্টির হার কমে যায়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে। ভোগ কমিয়ে ফেলায় কোম্পানিগুলো পণ্য বিক্রি করতে পারে না। ফলে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সঞ্চয় কমে গেলে অর্থের জোগান কমে যায়। এমনিতেই চাহিদার চেয়ে সঞ্চয় কম। এটি কমলে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে।

বিবিএসের হিসাবে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জীবনযাপনের জন্য ২৭৬ টাকা ১৬ পয়সা খরচ করে মানুষ যে পণ্য ও সেবা কিনেছে গত জানুয়ারিতে একই পণ্য কিনতে খরচ হয়েছে ৩০৭ টাকা ২ পয়সা। আলোচ্য সময়ে ওই সূচকে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৩০ টাকা ৮৬ পয়সা। বৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য উপকরণের দাম বেড়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

মিনিকেট বা নাজিরশাইল চালের দাম ২০২০ সালের জানুয়ারিতে প্রতি কেজি ছিল ৬২ টাকা। গত জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয়েছে ৬৯ টাকা। দুই বছরে বেড়েছে ৭ টাকা, বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। একই সময়ের ব্যবধানে পাইজাম চালের দাম ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৬৩ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৩ টাকা, বৃদ্ধির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। আটা ৪০ টাকা থেকে ৪২ টাকা হয়েছে। বৃদ্ধির হার সাড়ে ৫ শতাংশ। চিনি ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৮৫ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ২৫ টাকা, বৃদ্ধির হার ৪২ শতাংশ। ডিমের হালি ৩৪ টাকা থেকে বেড়ে ৩৮ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৪ টাকা, বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। সয়াবিন তেল ৯৮ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হয়েছে। বেড়েছে ৬২ টাকা, বৃদ্ধির হার ৬৩ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবে ওই হারে পণ্যমূল্য বাড়লেও বাস্তবের চিত্র ভিন্ন। বেড়েছে আরও বেশি। গত জানুয়ারিতেই সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে প্রতি লিটার দাঁড়িয়েছে ১৮০ টাকা । এখন ২০০ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

গত বছরের ৩ নভেম্বরে জ্বালানি তেলের (ডিজেল ও কেরোসিন) দাম ২৩ শতাংশ বাড়ানো হলে এর প্রভাবে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। গণপরিবহণের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়ানো হলেও বাস্তবে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ। এর সঙ্গে বেড়েছে পানি ও এলপি গ্যাসের দাম। ভর মৌসুমেও চাল ও পেঁয়াজের দাম বেড়েই চলেছে।

মানুষের জীবনযাত্রার বড় অংশই ব্যয় করে খাদ্যের জন্য। মধ্যম আয়ের পরিবার খাদ্যের জন্য ব্যয় করে ৫৮ শতাংশ, খাদ্য বহির্ভূত পণ্য ও সেবায় ৪২ শতাংশ। স্বল্প আয়ের পরিবার খাদ্যের জন্য ৬২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় ৩৫ শতাংশ। নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে ৭০ শতাংশ অর্থ। খাদ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় চালের। এর পরেই রয়েছে শাকসবজি, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল। এ কারণে এসব খাদ্য পণ্যের দাম বেশি বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেশি মাত্রায় বেড়ে যায়।

গত দুই বছরে সবচেয়ে বেশি খরচ বেড়েছে পরিবহণ খাতে। এ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার ২৭ শতাংশ। গৃহসামগ্রী খাতে ১২ শতাংশের বেশি, বাসাভাড়া ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৪ শতাংশ, কাপড় ও জুতা কিনতে প্রায় ১১ শতাংশ, চিকিৎসা খাতে প্রায় ৯ শতাংশ এবং বিবিধ খাতে বৃদ্ধির হার ২০ শতাংশ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি হিসাবের চেয়ে বেসরকারি হিসাবে সব খাতেই ব্যয় বেশি বেড়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে উচ্চ রক্তচাপের যে ওষুধ ৩০ ট্যাবলেট ২৮০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা ৩৬০ টাকা। পেটের গ্যাস নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত ওষুধের প্রতি ট্যাবলেট ছিল ৫ টাকা, এখন তা ৭ টাকা। এভাবে প্রায় সব ওষুধের ও চিকিৎসাসেবার মূল্য বেড়েছে। চাল, ডালসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দামও বেড়েছে সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।

এদিকে সরকারি হিসাবে আয় বেড়েছে। বেসরকারি হিসাবে গত দুই বছরে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয় কমেছে। নতুন কাজের সংস্থান হয়েছে খবুই কম। বরং চাকরিচ্যুতির হার বেড়েছে। এসব মিলে আয় বাড়ার চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়েছে। এতে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, কমেছে টাকার মান, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়েছে। এতে ভোগের হারও কমেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে জাতীয় উৎপাদনে। এতে সার্বিকভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমেছে।

বিবিএসের হিসাবে ২০১৯ সালের জানুয়ারির তুলনায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বেতন ভাতা বেড়েছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের জানুয়ারিতে বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। বিভাগওয়ারি হিসাবে গড়ে জানুয়ারিতে সবচেয়ে বেশি বেতন ভাতার সূচক বেড়েছে রংপুর বিভাগে ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ঢাকায় বেড়েছে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ, বরিশালে ৬ দশমিক ৫৭ শতাংশ, খুলনায় ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

বিবিএসের হিসাবের সঙ্গে অনেকেই একমত হতে পারছে না। করোনার কারণে বেতন না বেড়ে বরং কমেছে। শ্রম শক্তির প্রায় ৩ কোটি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। করোনার লকডাউনের সময় এরা নিয়মিত কাজ পায়নি। এদের আয় কমেছে। এর মধ্যে বস্তিবাসীদের আয় কমেছে ১৮ শতাংশ।

উন্নত দেশগুলোর মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ী প্রবণতা কম। কেননা তাদের জীবিকা নির্বাহে সরকার বড় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে সেটি নেই। যে কারণে ব্যক্তিকেই জীবিকার পথ খুঁজে নিতে হয়। এদেশের মানুষ মধ্যবিত্তের প্রায় সবাই দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করে একটি অংশ সঞ্চয় করে। প্রয়োজনে জীবনযাত্রার মানে কাটছাঁট করেও সঞ্চয়মুখী হয়। কিন্তু সেই সঞ্চয়ে এখন ভাটার টান পড়েছে। কমে যাচ্ছে ব্যাংকে সঞ্চয়।

গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে ব্যাংকে আমানত বেড়েছিল ৪৪ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বৃদ্ধির হার কমেছে ৫২ শতাংশ। এর মধ্যে স্বল্প ও মধ্য আয়ের একটি বড় অংশ ব্যাংকে বিভিন্ন কিস্তিভিত্তিক প্রকল্পে সঞ্চয় করেন। সেই মেয়াদি আমানত গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল ২৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের আলোচ্য সময়ে বৃদ্ধির হার কমেছে ৪৩ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে চলতি আমানতও। এ হিসাবে টাকা রেখে চলমান ব্যয় মেটানো হয়। বিশেষ করে ব্যক্তি ও কোম্পানিগুলো এ হিসাবে টাকা রাখে। এ আমানত গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে বেড়েছে ২২৮ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমেছে ১১৭ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষ খরচ মেটানোর জন্যও এখন ব্যাংকে টাকা রাখছে না। খরচ করে ফেলছে। যে কারণে এ টাকা কমছে। মানুষ প্রয়োজনে টাকা তুলে হাতে রাখে। সাধারণ সময়ে টাকা হাতে রাখার হার কম। অস্বাভাবিক সময়ে বেশি থাকে। এখন হাতে টাকা রাখার প্রবণতা বেড়েছে। মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখছে।

মধ্য আয়ের মানুষের সরকারি খাতের সঞ্চয়পত্র কেনার আগ্রহ বেশি। যে কারণে এ খাতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি বিনিয়োগ হয়। কিন্তু গত সাত মাসে এ খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করছে কম। গত অর্থবছরের জুলাই জানুয়ারিতে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ২৫ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে বিক্রি হয়েছে ১২ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে বিক্রি কমেছে প্রায় অর্ধেক।

যুদ্ধের অজুহাতে গমের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা

যুদ্ধরত দেশ রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে আমদানির চুক্তির পুরো লট গম চলে এসেছে দেশে। গম আমদানি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে শঙ্কা নেই। বেসরকারি পর্যায়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ লাখ মেট্রিক টন আমদানি হয়েছে।

পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে উৎপাদনের প্রায় ১২ লাখ টন চলতি মাসের শেষে কৃষকের ভান্ডারে যুক্ত হবে। এছাড়া গত মৌসুমে সরকারিভাবে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জন হয়েছে। কিন্তু এরপরও যুদ্ধের ডামাডোলের অজুহাতে বাজারে কতিপয় ব্যবসায়ী বাড়াচ্ছে গমের দাম। এতে গম ও মোটা চালের মূল্য প্রায় কাছাকাছি হয়ে গেছে। বাজারে এক কেজি মোটা চাল ৫০ টাকা এবং আটার কেজি ৪৫ টাকায় উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

সূত্র জানায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গম আমদানিকারক এবং গম থেকে আটা ও ময়দা উৎপাদনকারীদের ওপর নজরদারি করছে সরকারের এজেন্সিগুলো। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সম্প্রতি দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, গম পর্যাপ্ত আমদানি হয়েছে। এর মজুত নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববাজারে যে গমের মূল্য বেড়েছে, এর প্রভাব আগামী দুই মাস পর পড়বে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এর প্রভাব দ্রুত পড়ছে বাজারে। এ ধরনের তথ্য আমাদের কাছে আসছে। এজন্য আমি গোয়েন্দা সংস্থা ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়েছি।

বাজার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বিআইডিএস-এর সাবেক ডিজি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে আঘাত আসছে। আমরা যুদ্ধরত দেশগুলো থেকে গম, ভোজ্যতেল, ভুট্টা আমদানি করছি। এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে এটিও ঠিক, বিশ্ববাজারের কারণে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে যতটুকু বৃদ্ধির কথা, কতিপয় ব্যবসায়ী এর চেয়ে বেশি বৃদ্ধি করে থাকে। এজন্য সরকারকে পণ্যের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা উদ্যোগ নিতে হবে।

সম্প্রতি খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে গম নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয়, সরকার যে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, এর ৯৫ শতাংশ গম আবাদ করেছেন কৃষক। এছাড়া ২০২১ সালের মৌসুমে ১ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ হাজার ২১২ টন বেশি সংগ্রহ হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) সরকার টু সরকার (জি টু জি) পদ্ধতিতে রাশিয়া থেকে ৩ লাখ মেট্রিক টন, ইউক্রেন থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন এবং ভারত থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানির চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থবছরের সাড়ে ৭ মাসে রাশিয়া, ইউক্রেন থেকে ৩ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন গম আমদানি সম্পন্ন হয়েছে। এর বাইরে ৫২ হাজার ৫শ মেট্রিক টনের গমবাহী জাহাজ বাংলাদেশ বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে। অর্থাৎ রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে সরকারিভাবে আমদানির পুরোটাই চলে আসছে। ফলে এ বছর যুদ্ধরত দেশ দুটি থেকে গম আমদানি নিয়ে কোনো ধরনের সরকারি পর্যায়ে শঙ্কা নেই।

এছাড়া ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেসরকারিভাবে আমদানি করা হয়েছে ২১ লাখ ১৭ হাজার মেট্রিক টন। অবশ্য বেসরকারিভাবে বছরে প্রায় ৫৪ লাখ মেট্রিক টনের মতো আমদানি হয়।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে বার্ষিক গমের চাহিদা ৫৮ লাখ টন। প্রথম ছয় মাসে চাহিদা (জুলাই-ডিসেম্বর) ২৯ লাখ মেট্রিক টন। এই চাহিদা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি মিলে মোট আমদানি হয়েছে প্রায় ২৫ লাখ মেট্রিক টন।

চলতি মাসে শেষ এবং এপ্রিলের শুরুতে কৃষকের আবাদের প্রায় ১২ লাখ মেট্রিক টন যোগ হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের মৌসুমে (নভেম্বর-ডিসেম্বর) কৃষক ৩ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে গম আবাদ সম্পন্ন করেছে। এ বছর সরকারিভাবে গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন। ওই হিসাবে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার ৯৫ শতাংশই কৃষক আবাদ করেছে।

আমদানি, উৎপাদনের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই মুহূর্তে গমের সংকট নেই। কিন্তু যুদ্ধের দোহাই দিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী দাম বাড়াচ্ছে গমের। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পরপরই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে গত দশ দিনে প্রতি মনে (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে গমের দাম। এর জেরে বেড়ে গেছে আটা-ময়দা ও সুজির দাম।

এখন এক কেজি খোলা আটা ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা এবং আটার প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। একইভাবে খোলা ময়দার কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি পাউরুটির প্যাকেটসহ কিছু ব্র্যান্ডেড বেকারির আউটলেট ও খুচরা দোকানে অন্তত ১০ টাকা বেড়েছে। রাস্তার পাশের চা-স্টলে বিক্রি হওয়া পাউরুটি ও বিস্কুটের দামও বেড়েছে। এতে কর্মজীবী মানুষের খাবারের পেছনে খরচও বেড়ে গেছে। এছাড়া আটা ও ময়দা দিয়ে তৈরি চানাচুর, বিস্কুট, বেকারি পণ্যসহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে।

সূত্র জানায়, রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের কথা বলে গম আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে ব্যবসায়ীরা। তাদের মত হচ্ছে, এ মুহূর্তে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিবছর এই দুটি দেশ থেকে আমাদের মোট চাহিদার ৩৫ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানি করা হয়।

তবে চলমান যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের প্রধান বন্দরগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সরবরাহ ও শিপিং লিঙ্ক। যার ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে শিপমেন্ট। এছাড়া রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে জাহাজ ভাড়াও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি খাদ্যশস্য আমদানিকারকরাও বিকল্প সোর্সিং দেশের সন্ধান করছে। বিশেষ করে বিকল্প হিসাবে কানাডা এবং আর্জেন্টিনা থেকে গম বুকিং করছেন অনেক আমদানিকারক।

কেউ মজুতদারি করলে প্রশাসনকে জানাতে বললেন হানিফ

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, মানুষের মধ্যে একটা নেতিবাচক স্বভাব রয়েছে। কিছুসংখ্যক ব্যবসায়ী সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তারা অতিরিক্ত মুনাফার জন্য জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। যে কারণে আমাদের নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ কষ্টের শিকার হন। এ ব্যাপারে আমাদের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নজরদারি করতে হবে। কেউ মজুদদারি করলে, অযৌক্তিক নিত্যপণ্যের দাম বাড়ালে প্রশাসনকে জানাবেন। তারা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিবে। সরকারকে বিপদে ফেলবে, এমন কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।

রোববার দুপুরে সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাছনরাজা মিলনায়তনে আয়োজিত জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

হানিফ বলেন, দুই দুইটা বছর বাংলাদেশসহ সারাবিশ্ব করোনায় বিপর্যস্ত ছিল। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য ঠিকমত করতে পারে নাই। যে কারণে এখনও বিশ্ববাজার স্থিতিশীল অবস্থায় নেই। পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যে যুদ্ধ চলতে যুদ্ধের প্রভাবেও বিশ্ববাজার অস্থিতিশীল। এর ঢেউ লেগেছে আমাদের দেশে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাজার মনিটরিং শুরু হয়েছে। যারা মজুদ করে তেলের দাম বাড়িয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি আগামীতে ৫০ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবারকে ১০ টাকা কেজি দরে।

মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, আমাদের সামনে মাত্র দুইটি বছর রয়েছে। এই দুই বছরের মধ্যে সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে হবে । দলের অনেক নেতার মধ্যে আস্তা ও বিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে। সংগঠনের সব পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের মধ্য পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি করতে হবে। দলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে তবে এই প্রতিযোগিতা যেন দলকে বিব্রতের মধ্যে না ফেলে। জামাত শিবির এদেশে স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। জামাত বিএনপির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকতে পারে না। দলীয় নেতাকর্মীদের বেশি প্রাধান্য দিতে হবে।

একই সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, সুযোগসন্ধানীরা নিত্যপণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। এই সুযোগ গ্রহণকারী আর হুজুগ সৃষ্টিকারী সবাই একই দোষে দোষী। এদের সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে।

তিনি বলেন, এই বাংলাদেশে শেখ হাসিনা মাতৃত্ব ভাতা, বিধবাভাতা, বয়স্কভাতা দিচ্ছেন। ৩০ লাখ মানুষকে পাকাঘর বানিয়ে দিয়ে বসবাসের সুযোগ করে দিয়েছেন। সরকারের এইসব অর্জনকে ম্লান করতে নিত্যপণের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিককল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গরীব, মজুর সাধারণ মানুষের চিন্তা করেন। তিনি হাওর, পাহার, চর, উপকূল এলাকার মানুষের উন্নয়নে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন। আওয়ামীলীগের যোগ দেয়ার পর তার আনুগত্য মেনে কাজ করছি।

তিনি বলেন, আমরা একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছি। দেশ যখন উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তখন ষড়যন্ত্র থেমে নেই। দেশবিরোধী চক্র আমাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সুসংগঠিত করতে হবে। ঢাকায় বসে নয়, জেলায় থেকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করতে হবে। সবার আমলনামা নেত্রীর কাছে যায়। আগামীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে হলে দলের নেতাকর্মীদের প্রাধান্য দিতে হবে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে প্রতিনিধি সভায় বক্তব্য দেন- আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নূরুল ইসলাম নাহিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আজিজুস সামাদ ডন, সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, শামীমা আক্তার খানম, জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সভাপতি নুরুল হুদা মুকুট, পৌরসভার মেয়র নাদের বখত।

সভায় অন্যান্যের মাঝে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট আপ্তাব উদ্দিন, নোমান বখত পলিন, সৈয়দ আবুল কাশেম, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল, জেলা আওয়ামী লীগের, কোষাধ্যক্ষ ইশতিয়াক শামীম, আওয়ামী লীগ নেতা হায়দার চৌধুরী লিটন, সিরাজুর রহমান সিরাজ প্রমুখ।

এছাড়াও প্রতিনিধি সভায় জেলার সব উপজেলার সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের দলীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

১৪ দল নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক মঙ্গলবার

দীর্ঘদিন পর ১৪ দলীয় জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

জোটনেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন। রোববার রাতে আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক সায়েম খান যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠেয় গুরুত্বপূর্ণ এ বৈঠকে ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতারা ছাড়াও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত থাকবেন। ইতোমধ্যে জোট নেতাদের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে। বৈঠকে রাজনৈতিক, সামাজিক, নির্বাচন নানা বিষয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি রাজনীতির মাঠে বিরোধীদের আন্দোলন-সংগ্রাম মোকাবিলায় ১৪ দলীয় জোটের ভূমিকা কী হবে- সে বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে কর্মকৌশল চূড়ান্তসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হবে।

বৈঠকের বিষয়ে ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, আগামী মঙ্গলবার বেলা সাড়ে এগারোটায় জোট নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক হবে। আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

একই বিষয়ে আরকে শরিক দল ন্যাপের ইসমাইল হোসেন বলেন, প্রায় তিন বছর পর আমরা জোট নেত্রীর সঙ্গে মঙ্গলবার বৈঠকে বসবো। সেখানে রাজনৈতিক, সামাজিক, নির্বাচন নানা বিষয়ে কথা বলবো।

২০০৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ২৩ দফার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১৪ দলীয় জোট। ওই সময় থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোটগতভাবে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচনে অংশ নেয় জোটের শরিকরা। নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে শরিকদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। তবে সর্বশেষ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের মন্ত্রিসভায় শরিক দলের কাউকে রাখা হয়নি। এরপর থেকেই নানা কারণে জোট শরিকদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। জোটের বৈঠক, দলের (শরিক দলসমূহ) বিবৃতি-বক্তৃতা এমনকি জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যেও ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

যদিও ‘মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের আদর্শিক’ এই জোটের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের সব সময় দাবি ছিল- ১৪ দলের ঐক্য এখনও ‘অটুট’ আছে। যদিও এই সময়ে, বিশেষ করে করোনাকালীন মাঠের রাজনীতিতে তেমন কোনো কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি তাদের। তবে দিবস ভিক্তিক ভার্চুয়াল সভা করেছে নিয়মিত। তবে বেশ কিছুদিন হলে বাংলাদেশ জাসদসহ দু-একটি শরিক দলের নেতারা ভার্চয়াল সভায় অংশ নিচ্ছে না।

সর্বশেষ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে শুক্রবার ১৪ দলীয় জোটের ভার্চ্যুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায়ও জোট শরিকরা ১৪ দলীয় জোটকে সক্রিয় করার দাবি জানিয়েছিলেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে জোটনেত্রী শেখা হাসিনা বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন তারা।

জোট নেতাদের মতে, রাজনৈতিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা, বিরোধীদের আন্দোলন-সংগ্রাম ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে এখন থেকেই নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হবে। বর্তমান বাস্তবতা বা প্রেক্ষাপটে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টিও স্থান পাবে আলোচনায়। একইসঙ্গে আগামী দিনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রয়োজনে জোটনেত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শ ও মতামত কী- সে বিষয়েও অবহিত হবেন জোট নেতারা।

ইউক্রেনের সঙ্গে এলসি স্থগিত

রুশ সামরিক বাহিনী ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে ইউক্রেনের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর এলসির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। আর রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর সঙ্গে খোলা এলসির বিষয়ে ‘ধীরে চল নীতি’ অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে দুদেশের সঙ্গেই নতুন কোনো এলসি খোলা হচ্ছে না। যুদ্ধের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে ব্যাংকগুলো। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সার্বিক পরিস্থিতি বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হচ্ছে।

২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করে। এখন পর্যন্ত যুদ্ধের প্রায় ১৭ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যেই দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মূলত ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডা কর্তৃক রাশিয়ার ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে। এর মধ্যে ব্যাংক লেনদেনে ও রাশিয়ান পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞাই প্রধান। ইউক্রেনের সঙ্গে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রুশ বাহিনীর আক্রমণের কারণে ওই দেশের সার্বিক ব্যবস্থাপনা প্রায় ভেঙে পড়েছে। যে কারণে ব্যাংক, বন্দর কাজ করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো ইউক্রেনের সঙ্গে এলসির কার্যক্রম স্থগিত করেছে। ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশ গম, লৌহ, সিলভারসহ নানা খনিজ পদার্থ আমদানি করে। এগুলোর জন্য প্রায় সব এলসিই বেসরকারিভাবে করা হয়। এর মধ্যে সোনালী ও জনতা ব্যাংকের এলসিই বেশি। এছাড়া সরকারিভাবে কিছু গম আমদানি করা হয় ইউক্রেন থেকে। ২৪ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশি পণ্যবাহী কোনো জাহাজ ছেড়ে আসেনি। এদিকে বাংলাদেশ থেকেও ইউক্রেনগামী কোনো পণ্যবাহী জাহাজ ছেড়ে যায়নি। ইউক্রেনের সঙ্গে বাণিজ্য হয় মূলত সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে। দেশটির সঙ্গে সিঙ্গাপুরের জাহাজ চলাচলও বন্ধ রয়েছে। কেননা ইউক্রেনে রাশিয়ার অব্যাহত হামলার পর দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। ফলে ব্যাংকিং কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া বন্দরের কার্যক্রমও ঠিকমতো চলছে না। কাস্টমস বিভাগও কাজ করতে পারছে না। অনলাইন ব্যবস্থাপনাও অচল হয়ে পড়েছে। ফলে কনটেইনারের নাম্বার থেকে শনাক্ত করার কাজও বাধার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে ইউক্রেনে বাংলাদেশের জাহাজে রুশ বাহিনী কর্তৃক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এ জন্য আগে খোলা আমদানির এলসির মধ্যে যেসব পণ্য গত এক সপ্তাহ আগে জাহাজীকরণ করা সম্ভব হয়নি সেগুলো জাহাজীকরণ করতে নিষেধ করছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেও তারা এ ব্যাপারে যোগাযোগ করছেন। ইউক্রেনের ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে বেলজিয়াম ভিত্তিক অনলাইনে আর্থিক লেনদেনকারী সংস্থা সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ইন্টার ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশনের (সুইফট) কোন নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও নিরাপত্তার কারণে এখন লেনদেনও বন্ধ রয়েছে। ফলে ইউক্রেনে আমদানির বিল পরিশোধ যেমন বন্ধ, তেমনি রপ্তানির বিল দেশে আনাও বন্ধ রয়েছে। রেমিট্যান্সের অর্থ আসাও প্রায় বন্ধ।

ইউক্রেন থেকে রেমিট্যান্সের অর্থ দেশে আনতে ফেব্রুয়ারিতে জনতা ব্যাংক ওই দেশের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করেছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী রেমিটেন্সের অর্থ ওই ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আসার কথা। কিন্তু সেটি কার্যকর হওয়ার আগেই যদ্ধের কারণে সব স্থগিত হয়ে গেল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, রাশিয়া ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানি-বাণিজ্য খুবই কম। এর মধ্যে ইউক্রেনে বাংলাদেশ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি করেছিল ২০ কোটি টাকার পণ্য। গত অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ইউক্রেন থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছিল ৪০৬ কোটি টাকার পণ্য। গত অর্থবছরে আমদানি করেছে ২ হাজার ৭২২ কোটি টাকার পণ্য। এর আগের অর্থবছরে তা ছিল সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার পণ্য। তবে ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ছিল। এদেশ থেকে পোশাক রপ্তানি বাড়ছিল ইউক্রেনে। যে কারণে ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে কোনো ঘাটতি ছিল না। বরং উদ্বৃত্ত ছিল। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউক্রেনের বিনিয়োগ খুবই সামান্য অর্থাৎ ২ কোটি ৩১ লাখ ডলার বা ১৯৮ কোটি টাকা। ২০১০ সাল থেকে তারা বাংলাদেশে সীমিত বিনিয়োগ শুরু করে।

রাশিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়িত দেশের একমাত্র পারমাণবিক রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সাড়ে ৫ হাজার রুশকর্মীর পাশাপাশি দেড় হাজার ইউক্রেনের নাগরিক কর্মরত রয়েছে। এদের লেনদেন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে এসব অর্থ লেনদেন হতো। ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডা রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে সুইফটের মাধ্যমে কয়েকটি বড় ব্যাংকের লেনদেনও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ কারণে অর্থ আটকে যেতে পারে এ আশঙ্কায় সুইফটের মাধ্যমে কোনো লেনদেন হচ্ছে না। এমন কি যেসব ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়নি সেসব ব্যাংকের সঙ্গেও লেনদেন হচ্ছে না।

এদিকে রাশিয়া থেকে ঋণের অর্থ এখন জরুরি প্রয়োজনে না আসলে সরকারের অংশ থেকে প্রকল্পে অর্থের জোগান দেওয়া হচ্ছে। রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার সঙ্গে অর্থ লেনদেনে বিকল্প পথ বের করলেও সেগুলো আপাতত ব্যবহার করা হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বিষয়গুলো ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা ও ঝুঁকি না নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, ইউক্রেনের সঙ্গে বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মূলত যুদ্ধের কারণে তাদের দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। আর রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সুইফটে ও জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, আক্রমণ করছে রাশিয়া। রাশিয়াতে কোনো আক্রমণ নেই। আছে শুধু বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা। এ কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এগুলোকে বলা যায় অদৃশ্যমান বিধিনিষেধ। এই অদৃশ্য বিধিনিষেধের বেড়াজালে পড়ে রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা আটকে গেছে।

সূত্র জানায়, যুদ্ধের আশঙ্কার পর থেকে ইউক্রেনের মুদ্রা হ্রিবনিয়ার দরপতন হতে থাকে। যুদ্ধ লেগে যাওয়ার পর তা আরও কমে যায়। তবে ১০ মার্চ থেকে মুদ্রার মান আবার বাড়তে থাকে। যুদ্ধের আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রতি হ্রিবনিয়ার দাম ছিল ৩ টাকা ২ পয়সা। যুদ্ধ শুরু হলে ২৫ ফেব্রুয়ারি তা কমে প্রতি হ্রিবনিয়ার দাম দাঁড়ায় ২ টাকা ৮৬ পয়সা। ১০ মার্চ দাম বেড়ে আবার ২ টাকা ৯৩ পয়সায় উঠে। ওই দরেই এখন মুদ্রাটির লেনদেন হচ্ছে। আলোচ্য সময়ে মুদ্রার দরপতন হয়েছে প্রায় ৩ শতাংশ বা ৯ পয়সা।

এদিকে ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডা কর্তৃক রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশের। মূলত সুইফটের ওপর ও জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এ দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ গত অর্থবছরে রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে ৪৮ কোটি ডলারের পণ্য। রাশিয়ায় রপ্তানি করেছে ৫৪ কোটি ৭১ লাখ ডলারের পণ্য। এদিকে রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের আরও কিছুটা দরপতন হয়েছে। ডলারের বিপরীতে দরপতনের হার ৪৯ শতাংশে উঠেছে।

বিমানে অসুস্থ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সিএমএইচে ভর্তি

হঠাৎ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তুরস্ক থেকে বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর রোববার বিকালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (রাজনৈতিক) শফিউল আলম জুয়েল জানান, ঢাকার সিএমএইচ হাসপাতালে অবজারবেশনে আছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো বলেও জানিয়েছেন তিনি।

গত ৭ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে গিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন। এরপর তুরস্ক সফলে গিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।

‘ইউক্রেন ছাড়ার আশায় এখনও অনেক বাংলাদেশি’

বিশ্বের দরবারে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি আলোচনার প্রধান খোরাক হয়ে উঠেছে। দিন যতই গড়িয়ে যাচ্ছে ততই মানুষের বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর চাপ বেড়ে চলছে।

এই যুদ্ধে এক বাংলাদেশি নাবিকের মৃত্যুর মাধ্যমে তৈরি হয় উৎকন্ঠা আর আতংঙ্ক। সেই আতংঙ্কের ধাক্কা লাগে প্রবাসে অবস্থানরত প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকদের মননে। যে মনন হয়ে ওঠে অস্থির। কিন্ত যে সকল বাংলাদেশি নাগরিক ইউক্রেনে বসবাস করতেন তারা কেমন করে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে? কিভাবে নিরাপদ আশ্রয় খুজে পেলেন? এরকমই একজন বাংলাদেশি নাগরিক সদ্য ইউক্রেন যুদ্ধের পরিস্থিতি নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে স্পেনে এসে পৌছেছেন”
রাশিয়ার আক্রমনে ইউক্রেনের জনগণের পাশাপাশি ভিন্ন দেশের নাগরিকরাও প্রত্যক্ষ করেছে যুদ্ধের বিভীষিকাময় দিনগুলো। তাদের মধ্যে অনেক বাংলাদেশিদের মাঝে মো. শাহজাহান আহমদ খোকন ছিলেন।

তার বাড়ি সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায়। গত বছর ডিসেম্বর মাসে ইউক্রেনে পাড়ি জমান। সেখানে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার আগেই যুদ্ধ পরিস্থিতির শিকার হন।

তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে রাশিয়ার আক্রমনে ইউক্রেনের মাঠি কেপে উঠলে রাতেই কিয়েভ ছেড়ে পোল্যান্ড বর্ডারে যাত্রা করেন। প্রায় ২১ ঘন্টা যাত্রা করে আরো ২০ কিলোমিটার পায়ে হেটে পোল্যান্ডের সীমানায় পৌছেন। ইউক্রেন ত্যাগ করার সময় শুধু নিজের পড়নের কাপড় ছাড়া কিছুই সঙ্গে আনতে পারেননি।

নিজের পাসর্পোটটিও ফেলে আসতে হয়েছে। আর কিয়েভ রাজধানী ছেড়ে আসার সময় সেনা সদস্যের টহল ছিল। কিন্তু কেউ বাধা দেয়নি।

ইউক্রেনে প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশি নাগরিক জানান, পোল্যান্ড সীমান্ত চেকপোস্টে হাজার হাজার নিরাপদ আশ্রয় প্রার্থীর ভীড়। সেখানে ইমিগ্রেশন লাইনে কে কার আগে যাবে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। তবুও দুইদিন দুই রাত খোলা আকাশের নিচে ঠান্ডা হাওয়ার মাঝে দাঁড়িয়েছি। পরে ইমিগ্রেশন জটিলতা শেষ করে প্রায় চার দিন পোল্যান্ডের ইমিগ্রেশনের নিরাপত্তায় ছিলেন। তারা আমাদের বাংলাদেশিদের জন্য আউটপাস দেয়। এই কাগজটিই একটি আইডি কার্ডের মতো গুরুত্ব বহন করে। পোল্যান্ড বাংলাদেশ দূতাবাস আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছে। বর্তমানে তিনি পরিবারের সঙ্গে স্পেনে আশ্রয় নিয়েছেন।

রাসুলের (সা.) পরিকল্পনা পদ্ধতি যেমন ছিল

প্রসিদ্ধ এক হাদিসে আছে— ‘সাল্লু কামা রআইতুমিনি’— তোমরা এমনভাবে নামাজ পড়ো, যেভাবে আমাকে দেখেছো। (মুসনাদে আশ শাফি, হাদিস নং ৩১৯)

কুরআনে অন্য এক জায়গায় আছে— তোমাদের জন্য রাসুলের জীবনাদর্শে রয়েছে উত্তম নমুনা। (সুরা আহযাব, আয়াত ২১)

সমস্ত উলামায়ে কেরাম স্বীকার করেন এখানে ‘উসওয়াহ’ শব্দটি সামগ্রিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি পদেই রাসুল (সা.) আমাদের জন্য আদর্শ, আমাদের নমুনা। তো আল্লাহর রাসুল (সা.) যে বললেন (তোমরা এমনভাবে নামাজ পড়ো, যেভাবে আমাকে দেখেছো।) একথা আমাদের বুঝতে হবে এক্সটেন্ডেড সেন্সে। মানে শুধুমাত্র নামাজের ক্ষেত্রে নয়, জীবনের সর্বক্ষেত্রেই এই হাদিস প্রয়োগ করতে হবে।

তো আমি মনে করি ফলাফল লাভ করা যায় এমন প্রতিটি জায়গাতেই এই হাদিস ব্যবহার করা প্রয়োজন, যেন পরিকল্পনাকে নিয়মতান্ত্রিক করা যায়।

নিয়মতান্ত্রিক পরিকল্পনাকে আরবিতে বলা হয় تخطيط (তাখতিত)। তো ‘সাল্লু কামা রআইতুমিনি’-কে যখন আমরা সামগ্রিক অর্থে গ্রহণ করব, তখন এখানে خططوا كما رأيتموني أخطط (অর্থাৎ এমনভাবে পরিকল্পনা করো যেভাবে আমি পরিকল্পনা করি) এই বিষয়টিও শামিল হয়ে যায়।

আমার মনে যখন এই উপলব্ধি আসে, তখন আমি ভাবতে লাগলাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পরিকল্পনার বেসিক মূলনীতি কী ছিল? মানে মূলনীতি তো অনেক রকমের হতে পারে, কিন্তু একটা সর্বব্যাপী মূলনীতি নিশ্চয় আছে। তো আমি এ নিয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে চিন্তা করতে লাগলাম।

আমার মনে হলো আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বেসিক মূলনীতি ছিল— হাতের নাগালে যা আছে তা নিয়ে পরিকল্পনা করো, যা নেই তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নয়।

ইতিবাচক বিষয়ে সবসময় একটা নেতিবাচক বিষয় থাকে। সব ‘করা’র মধ্যে একটা ‘না করা’ থাকে। এক জিনিস ধরতে হলে আরেক জিনিস ছাড়তে হয়। তো আমি ভাবলাম এর ওপর একটা মূলনীতি দাঁড় করানো যেতে পারে— হাতের নাগালে যা আছে তা নিয়ে পরিকল্পনা করো, যা নেই তা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নয়। আমি খেয়াল করে দেখলাম রাসুল (সা.)-এর সারাজীবন এই মূলনীতির ওপর অতিবাহিত হয়েছে। সারাটা জীবন।

যেমন দেখুন, রাসুল (সা.) যখন মক্কা ত্যাগ করেন, যাকে আমরা হিজরত বলি, এর একটা পদ্ধতি এমনও হতে পারত— তিনি এলান করে বলছেন আমি মদিনা যাচ্ছি। কিন্তু তিনি এমনটি করেননি। হিজরতের রাতে তিনি খাদিজা (রা.)-এর ঘরে ছিলেন, তিনি চাইলে সামনের দরজা দিয়ে বের হতে পারতেন, কিন্তু বের হয়েছেন পিছনের দরজা দিয়ে। তিনি দিনেও বের হতে পারতেন, কিন্তু বের হয়েছেন রাতের আঁধারে। তিনি সোজা মদিনার দিকে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু উল্টো দিকে গিয়ে সওর গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে কয়েকদিন লুকিয়ে থেকে তারপর মদিনার দিকে রওনা দিয়েছিলেন।

প্রত্যেক পরিস্থিতেই তিনি দুটো সম্ভাবনা দেখেছিলেন, একটা ছিল হাতের নাগালে আরেকটা নাগালের বাইরে। কিন্তু তিনি হাতের নাগালে যা পেয়েছেন তা নিয়েই পরিকল্পনা করেছেন, যা পাননি তা নিয়ে করেননি। এটাই রাসুল (সা.)-এর কর্মপদ্ধতি, কুরআনে যা আমাদের অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।