নড়বড়ে নৌপথের অগ্নিনিরাপত্তা

0
166

আগুন নেভাতে ব্যবহার হয় পানি। সেই পানিতেই কিনা ঘটছে অগ্নিকাণ্ড। পুড়ছে জলযান, মারা যাচ্ছেন মানুষ। অথচ পানির অন্যতম বড় উৎস নদীতে থেকেও আগুন নেভাতে পানির ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ডাকলেই পাওয়া যাচ্ছে না ফায়ার সার্ভিসকে। কারণ দেশের ছয় হাজার কিলোমিটার নৌপথে মাত্র ১৩টি নদী ফায়ার স্টেশন। পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে সেগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে। ফলে পানিতে আগুন লাগলে স্থলের ফায়ার স্টেশনগুলোর কর্মীদের ডাকতে হচ্ছে।

এতে লেগে যাচ্ছে দীর্ঘ সময়। এর মধ্যে বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া জলযানগুলোর নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও রয়েছে। গেল ৩১ বছরে দেশে ৬৪১টি অভ্যন্তরীণ নৌযান দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও অনেক। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তিন হাজার ৮৮১ জন, আহত হয়েছেন ৭০৫ এবং নিখোঁজ হয়েছেন ৫০৪ জন।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নদী আছে কমবেশি ৪০৫টি। মোট নৌপথ ২৪ হাজার কিলোমিটার।

এর মধ্যে নৌপরিবহণযোগ্য নৌপথের পরিমাণ প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার। এটা বর্ষাকালের হিসাব। শুষ্ক মৌসুমে তা তিন হাজার ৮০০ কিলোমিটারে নেমে আসে।

২০২১ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বিস্তীর্ণ এই নৌপথে অন্তত ১৪ ধরনের ১৪ হাজার ৮০৫টি নৌযান চলছে। এসব নৌযানের মধ্যে রয়েছে-যাত্রীবাহী, মালবাহী, তেলবাহী, বালিবাহী, ড্রেজার, বার্জ, টাগ, স্পিডবোট, ফেরি, ওয়ার্ক বোট ও পরিদর্শন বোট।

এর বাইরেও অনিবন্ধিত অনেক জলযান চলছে নৌপথে। বিশাল এই নৌপথের জন্য মাত্র ১৩টি রিভার ফায়ার স্টেশন রয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে সরকার ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ বাস্তবায়নের চিন্তা করছে।

তখন নৌ-অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। কারণ এ ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত নয়। ফায়ার সার্ভিসের চলমান দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে ছয়টি স্থল কাম নদী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন স্থাপন করা হবে।

আরও তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে ১৩টি স্থল কাম নদী স্টেশন করার চিন্তা করছে তারা। চলমান ও পরিকল্পনায় থাকা প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলেও তা মোট নদীপথের তুলনায় খুব সামান্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল যুগান্তরকে বলেন, নৌযানে অগ্নিদুর্ঘটনার মূলে কাজ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর তদারকির অভাব।

মালিকপক্ষ অনেক সময় সরকারি সংস্থাগুলোকে ‘ম্যানেজ করে’ ত্রুটিপূর্ণ নৌযান চালায়। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে উভয়পক্ষই সেই ত্রুটির পক্ষে সাফাই গায়। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌযানের আধুনিকায়ন হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে।

কিছু অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকলেও নৌযানের কর্মীরা তা ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণে নৌযান নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের আন্তরিক ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসকেও নৌযানের নিরাপত্তার জন্য ঢেলে সাজাতে হবে। বাড়াতে হবে রিভার ফায়ার সাজাতে হবে। বাড়াতে হবে রিভার ফায়ার স্টেশন।

নৌ-অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো এতটাই নাজুক যে নদীবিধৌত বেশির ভাগ জেলায় এখনো নদী স্টেশন করতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই স্থল স্টেশনগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের।

পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও জনবলের অভাবে তারাও অনেক সময় জলযানের আগুন নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে। কিছু দিন পরপরই নদীপথে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ৪০ মিনিটে কুতুবদিয়ায় মাঝ সাগরে হঠাৎ বে-ওয়ান জাহাজে আগুন লাগে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত নদী ফায়ার স্টেশন থাকলে কেবল নৌ-অগ্নিদুর্ঘটনা নয়, সব ধরনের নৌ-দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা যেত। নৌপথে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অগ্নিদুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর।

সেদিন রাতে ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার পথে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৪৮ জনের মৃত্যু হয়। আজীবনের জন্য আগুনের ক্ষত বয়ে চলছেন আরও শতাধিক ব্যক্তি। সেই আগুনে বেশির ভাগ মানুষ এমনভাবে পুড়ে যায় যে, তাদের মরদেহও চিহ্নিত করা যায়নি।

জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, নৌযানগুলোর নিজস্ব অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের কোনো বিকল্প নেই।

এটি নিশ্চিত করা গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে অনেকাংশেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। সে ক্ষেত্রে নৌযান নির্মাণের সময় অগ্নিনিরাপত্তার সব দিক বিবেচনা করেই ডিজাইন করতে হবে।

স্থপতিদের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসকেও নৌপথের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রস্তুত করা হচ্ছে। কয়েকটি নদী কাম ফায়ার স্টেশন চালুর প্রক্রিয়া চলমান। আরও বেশি কয়েকটি নির্মাণের পরিকল্পনা আছে।

দেশে চালু থাকা নদী ফায়ার স্টেশনগুলো হলো-ঢাকার সদরঘাট নদী ফায়ার স্টেশন, নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশন, নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন নদী ফায়ার স্টেশন, মুন্সীগঞ্জের কমলাঘাট স্থল কাম নদী ফায়ার স্টেশন, ভৈরব নদী ফায়ার স্টেশন, চট্টগ্রাম সমুদ্রগামী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশন ও চাঁদপুর নদী ফায়ার স্টেশন।

আরও রয়েছে-সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী নদী ফায়ার স্টেশন, খুলনা নদী ফায়ার স্টেশন, বরিশাল নদী ফায়ার স্টেশন, পটুয়াখালী নদী ফায়ার স্টেশন, মানিকগঞ্জের আরিচা স্থল কাম নদী ফায়ার স্টেশন এবং খুলনা স্থল কাম নদী ফায়ার স্টেশন।

চালু থাকা এসব স্টেশনের চারটির কোনো পন্টুন কিংবা জেটি নেই। ফায়ার ফ্লোট নেই সাতটির। নদীতে দ্রুত চলাচলে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যান স্পিডবোটও নেই সাতটি স্টেশনে। ফায়ার পাম্প নেই দুটি স্টেশনে।

তবে তিনটি স্টেশনে তিনটি করে এবং ছয়টি স্টেশনে দুটি করে ফায়ার পাম্প রয়েছে। ওয়াটার বাইক নেই ১১টি স্টেশনে। নারায়ণগঞ্জ নদী ফায়ার স্টেশনে জেনারেটরও নেই। তবে অন্য ১২টিতে রয়েছে। চারটি ফায়ার স্টেশনের নেই ‘ফায়ার টেন্ডার’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here