ইসলামে অনুসন্ধানের স্বাধীনতা

0
200

ফরাসি প্রাচ্যবিদ বারঁ কারা দ্যো ভ (Baron Carra de Vaux ) রচিত ‘দ্য লিগ্যাসি অফ ইসলাম’ বইটি ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয়। লেখক যদিও জ্ঞানবিজ্ঞানে আরবদের অবদান কৃতজ্ঞ চোখে দেখেছেন, তারপরেও ‘গ্রিকদের ছাত্র’ বলে তাদের অবদানকে খাটো করতে ভুলেননি।

বার্ট্রান্ড রাসেলও তার ‘হিস্টরি অফ ওয়েস্টার্ন ফিলোসোফি’ নামক ইতিহাসধর্মী বইতে আরবদেরকে কেবল ‘গ্রিক ধ্যানধারনা প্রচারক’ আখ্যা দিয়েছেন। মানে তারা কেবল গ্রিক জ্ঞানবিজ্ঞান অনুবাদ করে ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন।

আদতে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্যগুলো মোটেও সঠিক নয়। এভাবে ভাবলে আক্ষরিক অর্থেই আরবদের শিক্ষা এবং কৃতিত্বের প্রতি অবিচার করা হবে।

একথা সত্য যে, আরবরা গ্রিক বিদ্যা অর্জন করেছিল এবং তা থেকে উপকৃতও হয়েছিল। কিন্তু তৎপরবর্তীকালে তারা যে জিনিস ইউরোপে পৌঁছে দেয় তা গ্রিকদের থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি ছিল। আর এটিই ইউরোপের রনেসাঁসের সূচনা ঘটায়।

ইউরোপে রনেসাঁসের সূচনা কোনো গ্রিক চিন্তাধারা থেকে হয়নি। যদি তাই হতো, তাহলে বহু আগেই ইউরোপের উন্নত হয়ে যেত, নবজাগরণের জন্য তাদের হাজার বছর অপেক্ষা করতে হতো না।

একথা সবারই জানা, প্রাচীন গ্রিকরা যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তা শুধু মাত্র শিল্প ও দর্শনের (Art and Philosophy) মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বিজ্ঞানের শাখায় তাদের অর্জন এতটাই সীমিতএবং নিম্নমানের ছিল যে, তা গণনার মধ্যেই পড়ে না। এই বিষয়ে তাদের একমাত্র উল্লেখ্যযোগ্য কাজ হলো আর্কিমিডিস (Archimedes)-এর (Hydro Statics) হাইড্রোস্টাটিক্স।

এটা সর্বজন স্বীকৃত যে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য এমন পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে চিন্তাক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে। প্রাচীন আমলে এমন কোনো দেশ পাওয়া যাবে না যেখানে এতটা স্বাধীনভাবে চিন্তা করার পরিবেশ ছিল, এমনকি গ্রিসেও ছিল না।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সক্রেটিসকে এথেন্সের যুবকদের মধ্যে মুক্তচিন্তা ও গবেষণায় উৎসাহ যোগানোর শাস্তিস্বরূপ হেমলক (বিষ) পান করিয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করা হয়েছিল। অন্যদিকে রয়েছে আর্কিমিডিস। আর্কিমিডিসকে (২১২ খ্রিষ্টপূর্ব) একটি রোমান সৈন্য হত্যা করে, যখন তিনি শহরের বাইরে বালির উপরে জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান করায় ব্যস্ত ছিলেন।

প্লুটার্কের বর্ণনা মতে, স্পার্টার বাসিন্দারা শুধুমাত্র কর্মের প্রয়োজনে লিখতে এবং পড়তে শিখতো। তাদের সমাজে অন্য সকল প্রকার গ্রন্থ এবং বিজ্ঞানীদের লেখাজোখা পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এথেন্সে চিত্রকলা ও দর্শনের উন্নতি হয়েছিল সত্য কিন্তু তারপরও তৎকালীন বহু শিল্পী এবং দার্শনিক যেমন অ্যাসকিলাস, ইউরিপিদিস, ফিদিয়াস, সক্রেটিস এবং অ্যারিস্টটলদের নির্বাসন, কারাদণ্ড বা প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় অথবা তারা দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

অ্যাসকিলাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তিনি এলুসিনিয়ান রহস্যের (যা ছিল গ্রিক চিন্তাধারার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ) গোপনীয়তা ভঙ্গ করেছেন। তৎকালীন গ্রিসে বিজ্ঞানের উন্নয়ন ও বিপ্লব ঘটানোর মত পরিবেশ ও পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল না।

আধুনিক বিজ্ঞানের যুগের আগমনের পূর্বের যুগগুলিতে ইউরোপের কি অবস্থা ছিল তা জানার জন্য একটি উপমা উপস্থাপন করছি :

দ্বিতীয় পোপ সিলভাস্টার যিনি সাধারণত গারবার্ট নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন, ৯৪৫ সালে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন আর ১০০৩ সালে মারা যান। তিনি গ্রিক ও ল্যাটিন, এই দুই ভাষাতেই যথেষ্ঠ পারদর্শী ছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন।

তিনি ৯৬৭ সালে একবার স্পেনে সফর করেছিলেন এবং বার্সেলোনা শহরে তিন বছর অবস্থান করেছিলেন। সেই সময়গুলিতে তিনি আরবদের লিখিত বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ অধ্যায়ন করেছিলেন এবং তাদের লেখা পড়ে দারুণভাবে মুগ্ধ ও প্রভাবিত হয়েছিলেন।

স্পেন থেকে ফিরে আসার সময় তিনি তার সাথে আরবদের লিখিতও অনূদিত কিছু পুস্তক ও একটি অ্যাস্ট্রোল্যাব সাথে করে নিয়ে আসেন। তিনি আরবদের লিখিত বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা (আরবিতে মানতেক শাস্ত্র বলা হয়), গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। আর এজন্য তাকে কঠিন বাধা ও বিপত্তির সম্মুখে পড়তে হয়।

কিছু সংখ্যক খ্রিষ্টান পাদ্রি বলতে থাকে যে, গারবার্ট স্পেনের মুসলিম থেকে যাদুবিদ্যা শিখে এসেছে। আবার কিছু মানুষ বলা শুরু করে, তার ওপর শয়তান ভর করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ১০০৩ সালের ১২ মে রোমে তার মৃত্যু হয়।

ইসলাম আগমনের পূর্বে, সংগৃহীত মানব ইতিহাসে দৃষ্টিপাত করলে স্পষ্ট দেখা যায় সে সময়কালে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আর এর ফলেই প্রাচীনকালে বৈজ্ঞানিক চিন্তন সংক্রান্ত বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা বা হাতেগোনা কিছু উদাহরণ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায় না।

আর ওই সমস্ত বৈজ্ঞানিক চিন্তন গুটি কতক ব্যক্তি মানসেই সীমাবদ্ধ ছিল। চিন্তা ও গবেষণার স্বাধীনতা না থাকার দরুণ এমন হাজারো চিন্তা ও গবেষণাকারীর জন্ম হলেও তাদের কর্ম বিলীন হয়ে গিয়েছে।

ইসলামই সর্বপ্রথম এই পরিবর্তনের জন্য বিপ্লব শুরু করে এবং ধর্মীয় জ্ঞান এবং প্রাকৃতিক জ্ঞানকে একে অপরের থেকে পৃথক করে।

ধর্মীয় জ্ঞানের উৎস হিসেবে স্রষ্টাপ্রদত্ত স্বর্গীয় বাণী (যার বিশদ প্রমানপুষ্ট এবং বিশুদ্ধ সংস্করণ হিসেবে আল কুরআন রূপে সংরক্ষিত রয়েছে) সাধারণভাবে স্বীকৃত হতো। যার সংরক্ষণ ও স্থায়িত্বের ভার স্বয়ং আল্লাহ নিয়েছেন। অন্যদিকে প্রাকৃতিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলাম সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেছিল যাতে কোন ব্যক্তি স্বাধীনভাবে তার নিজস্ব সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে।

হাদিস শাস্ত্রের মধ্যে দ্বিতীয় বিশুদ্ধ ও প্রামান্য গ্রন্থ হলো ইমাম আল মুসলিম (রহ) সংকলিত গ্রন্থ সহিহ আল মুসলিম। এখানে একটি অধ্যায় লিখিত রয়েছে : ‘শরীয়ত হিসেবে পয়গম্বর (সা.) যা আদেশ করেছেন তা অবশ্য পালনীয় আর পার্থিব বিষয়ের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।’

এই অধ্যায়ে ইমাম মুসলিম (রহ) একটি বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন যা মুসা ইবনে তালহা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন— আমি একবার নবী (স) এর সঙ্গে ছিলাম যখন তিনি কিছু লোকদের অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তারা তখন খেজুর গাছের শীর্ষে আরোহণ করেছিল। তারা কি করছিল সে বিষয়ে নবী (সা.) খোঁজ নিলেন। তারা তাকে জানাল যে নর ও নারীফুল স্পর্শ করে তারা গাছগুলির পরাগমিলন ঘটিয়ে গর্ভনিষেক করছে।

নবী (সা.) তখন বললেন, আমার মনে হয় এতে তাদের কোনো লাভ হবে না। যখন তারা নবী (সা.)-এর কথা শুনতে পেল তারা তখন পরাগায়ণ করা বন্ধ করল। সে বছর খুব অল্প ফলন হলো। যখন নবী (সা.) ঘটনাটি জানতে পারলেন, তিনি বললেন যদি তারা পরাগায়ণ করে উপকৃত হয় তাহলে অবশ্যই তারা ওই কাজ চালিয়ে যাবে। আমি কেবল অনুমান করেছিলাম, এটা আমার একটি অভিমত ছিল মাত্র। এই ধরনের ব্যাপারে আমার অভিমত অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। তবে স্রষ্টা সম্পর্কে যদি আমি কিছু বলি, তা অবশ্যই মেনে চলতে হবে; কারণ আল্লাহ সম্পর্কে আমি কখনো অসত্য বলি না।

এই একই ঘটনা নবী (সা.)-এর স্ত্রী আয়েশা এবং তার আজীবন সঙ্গী সাবিত ও আনাস বর্ণনা করে বলেছেন। সবশেষে তিনি ওই খেজুর উৎপাদনকারীদের ডেকে তাদের নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা বলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘তোমাদের বিষয়টি তোমরাই ভালো জানো।’

এই হাদিস অনুসারে একথা পরিষ্কার, ইসলাম ধর্মীয় বিষয় ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়কে একে অপরের থেকে পৃথক করেছে।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক নির্দেশনাকে আবশ্যিকভাবে মানতে হবে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে মানুষের অভিজ্ঞতা অনুসারে তাদের কর্মকান্ড পরিচালিত হবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই বিষয়টি এক মহাবিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here