হৃদরোগ জীবনযাত্রার বহু কিছুই বদলে দেয় কিন্তু এজন্য আমরা চাই না যৌন সংসর্গ ও বেশি পরিমাণ ও বেশি দিন বাধাগ্রস্ত হোক। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রভুত উন্নতিতে দ্রুত ও সময়মতো রোগ নির্ণয়, জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা এবং ভালো কার্যকর ও কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পন্ন ওষুধ আবিষ্কারের ফলে হাজার হাজার হৃদরোগীরা হার্ট অ্যাট্যাকের পরও স্বাভাবিক ও কর্মক্ষম জীবনযাপন এমনকি যৌনমিলনও করতে পারছে। যদিও হৃদরোগীদের শারীরিক ও মানসিক বিভিন্ন দুশ্চিন্তা ও চাপ নিবিড় যৌন সম্পর্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে তাই পারস্পরিক ধৈর্য ও বোঝাপড়া খুবই জরুরি। কোনো ব্যক্তি পুরুষ বা মহিলা যেই হোক না কেন যিনি হৃদরোগে ভুগছেন, যৌনক্রিয়া অবশ্যই মানসম্মত জীবনাচরণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
এ বিষয়ে যুগান্তরকে পরামর্শ দিয়েছেন মেডিনোভা সার্ভিসেসের মেডিসিন ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. মো. তৌফিকুর রহমান।
বিভিন্ন কারণ নিবিড় যৌন সম্পর্কের বাধা হতে পারে। যৌনমিলনের সংখ্যা ও গুণগতমান কোনো মানুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। হৃদরোগের অনেক উপসর্গ যেমন বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট বা দম বন্ধ হয়ে আসা বা অতিরিক্ত বুক ধড়ফড় করা যৌনমিলনের যথাযথ আনন্দকে কমিয়ে মাটি করতে পারে। পুরুষের ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গে প্রয়োজনীয় রক্ত সরবরাহ না হলে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা যৌন দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। যদিও মহিলাদের ক্ষেত্রে যোনীপথের উত্তেজনা ও যথাযথ পিচ্ছিলকরণের জন্য এখানে রক্ত সরবরাহের কোনো সম্পর্ক নেই। তাছাড়া উচ্চরক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও ডিপ্রেসন যথাযথ যৌন আকাঙ্ক্ষা ও সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করতে পারে।
হৃদরোগে ব্যবহৃত কিছু কিছু ওষুধও যৌন আকাঙ্ক্ষা ও চরম যৌন সুখের অনুভূতিতে বা ওরগ্যাজমে ব্যাঘাত করতে পারে। হৃদরোগ বা হার্ট ফেইলুরের জন্য দেয়া কোনো ওষুধ চিকিৎসকের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই পরিবর্তন বা বাদ দেয়া যাবে না, এ আশংকায় যে এই ওষুধগুলো যৌন দুর্বলতা করছে বা যৌন আকাঙ্ক্ষা কমিয়ে দিচ্ছে, কারণ সব কিছুর ওপরে সুস্থ হার্ট বা হৃদ স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। পরিপূর্ণ আনন্দময় যৌন জীবনের জন্য অবশ্যই হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখতে হবে।
স্বাভাবিক যৌন জীবনে ফিরতে সব চেয়ে বেশি সমস্যা হয় বাইপাশ সার্জারি করার পর, যদিও স্বাভাবিক কাজকর্ম, চাকরি বা পেশায় বা সামাজিক জীবনে ফিরতে তেমন সমস্যা হয় না। অপারেশন পরবর্তী অস্বচ্ছন্দ অনুভব করা, নিজের বুকের মাঝখানের কাটা দাগ এবং বিপরীত যৌন অংশীদারের অহেতুক ও অমূলক আশংকা ও ভয় স্বাভাবিক যৌন জীবনে ফিরতে বাধা। কিন্তু যারা বাইপাশ অপারেশন পরবর্তী সময়ে কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে ও নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করে তারা খুবই দ্রুত এমনকি কয়েক মাসের মধ্যেই স্বাভাবিক যৌন সম্পর্কে ফিরতে পারে, এমনকি তাদের যৌন তৃপ্তির মাত্রাও বেশি হয়।
হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর বা হার্ট এট্যাক হলে বা কোনো হার্ট ফেইলুর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর যে ভয়টা সবচেয়ে বেশি কাজ করে যে, নিবিড় যৌন সম্পর্কের সময় নতুন করে হার্ট এট্যাক হয় কিনা বা পুনরায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয় কিনা বা হঠাৎ মৃত্যু হয় কিনা। যদিও সিনেমা বা মিডিয়াতে যা দেখান হয়, বাস্তবে যৌন সংসর্গের সময় রোগীর হার্ট এট্যাক হওয়া খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায় কারণ যৌনমিলনের সময় যে শারীরিক পরিশ্রম হয় তা খুব কম সময় ব্যাপী। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ও পরিচিত যৌন পার্টনার বা অংশীদারের সঙ্গে তাই যৌনক্রিয়ার সময় হার্ট এট্যাকের ঘটনা খুবই কম। শারীরিক পরিশ্রমের দিক বিবেচনা করলে যৌনমিলন অল্প থেকে মাঝারি ধরনের শারীরিক ব্যায়াম যা হালকা গৃহকর্মের সমান বা দুই ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠার সমান।
তবে হৃদরোগীদের যাদের হৃদযন্ত্রের করোনারী ধমনীতে ব্লক আছে তাদের কারও কারও যৌনমিলনের কয়েক মিনিট বা ঘণ্টার পর বুকে মৃদু ব্যথা হতে পারে, তবে যারা নিয়মিত ব্যায়ামের সময় কোনো বুকে ব্যথা অনুভব করেন না তাদের ক্ষেত্রে এটা খুবই কম হয়। হৃদরোগীদের জন্য এ সতর্ক বার্তা যে, যারা বুকে ব্যথার জন্য নিয়মিত নাইট্রেট জাতীয় ওষুধ খান তারা অবশ্যই ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা যৌন দুর্বলতার জন্য ব্যবহৃত সিলডেনাফিল বা টাডালাফিল জাতীয় ওষুধ পরিহার করবেন।
যেসব হৃদরোগীদের বুকে ইমপ্লান্টেড কার্ডিয়াক ডিফিব্রিলেটর মেশিন লাগান আছে তারা বা তাদের যৌন পার্টনার অনেক সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে যে, নিবিড় ভালোবাসাবাসির সময় মেশিন কোনো ইলেকট্রিক শক দেয় কিনা আর শক দিলেও যৌন পার্টনার সাধারণত কোনো ব্যথা পান না বা তার কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু কেউ যদি শক পায়, সেক্ষেত্রে অবশ্যই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
যাদের হৃদরোগ আছে ও তা নিয়ন্ত্রণে আছে তাদের যৌনমিলনে কোনো সমস্যা নেই। যদিও অধিকাংশ হৃদরোগীদের যৌনমিলনে কোনো সমস্যা হয় না তারপরও বিশেষ করে হার্ট এট্যাকের পর বা হার্ট ফেইলুর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তির পর হাসপাতাল থেকে ছুটি শেষে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষার পর যৌনমিলনে উপযুক্ততা সাপেক্ষে যৌনমিলনে অগ্রসর হওয়া যেতে পারে। যেসব হৃদরোগীরা উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন যেমন অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ, আনস্ট্যাবল বা অস্থিতিশীল এনজাইনা বা গুরুতর হার্ট ফেইলুর রোগীদের ক্ষেত্রে যৌন সংসর্গ এড়িয়ে চলতে হবে এবং যথাযথ চিকিৎসা ও কার্ডিয়াক রিহ্যাবিলিটেশনের পর রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকলে তখন যৌনমিলন করা যাবে।
হৃদরোগীদের জন্য যৌন পার্টনারের সঙ্গে নিবিড় ভালোবাসা করা এক ধরনের ইমোশনাল চ্যালেঞ্জ বা প্রতিকূলতা। নিজের চিকিৎসক ও নিজের যৌন অংশীদারের সঙ্গে যথাযথ আলোচনার মাধ্যমে তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। নিজের দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তাদের সঙ্গে শেয়ার করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনার চিকিৎসক আপনাকে প্রয়োজনীয় শিক্ষণীয় জিনিসপত্র বা ক্ষেত্র বিশেষে আপনার ও আপনার জীবন সঙ্গীকে প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং বা পরামর্শ প্রদান করবেন যা আপনাকে স্বাভাবিক যৌন জীবনে ফিরতে সাহায্য করবে।
হৃদরোগীদের জন্য হৃদরোগ নির্ণয়ের পর সফলভাবে যৌন জীবন শুরু করার জন্য কতিপয় পরামর্শ হল-
* এমন এক সময় বের করতে হবে যখন দুজনই বিশ্রামে ও রিল্যাক্সড। সাধারণত কোন বেলার খাবার খাওয়ার কমপক্ষে ২ ঘণ্টার পর হলে ভালো।
* এমন জায়গা পছন্দ করা উচিত যা পরিচিত, ঘরোয়া, ব্যক্তিগত ও আরামপ্রদ।
* যৌনমিলনের পূর্বে আপনার চিকিৎসক আপনাকে কোন ওষুধের পরামর্শ করলে তা গ্রহণ করতে হবে।
* আলিঙ্গন ও আদর বা সোহাগের মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে যা অধিক আরামপ্রদ। যদি কোনো বুকে ব্যথা বা শ্বাসকষ্ট না হয় তবে আরও অগ্রসর হওয়া যেতে পারে।
* যৌনমিলনের সময় নিজেদের পারস্পরিক অবস্থান হবে আরামপ্রদ ও অভ্যাস মতো। সতর্ক থাকতে হবে যে যিনি উপরে অবস্থান করবেন তার অধিক শক্তির প্রয়োজন।
* যদি কোনো উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা থাকে তা জীবন সঙ্গীকে অবহিত করতে হবে, পরস্পরের আবেগ অনুভূতিকে মূল্যায়ন বা সম্মান দিতে হবে।


