নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে সিগারেট বাজারজাত করছে ৪ প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিক্রি হওয়া মোট ৯টি ব্র্যান্ডের সিগারেটে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করা হচ্ছে। আর ৪টি ব্র্যান্ডে পুনঃব্যবহৃত ব্যান্ডরোল লাগানো হয়। সম্প্রতি ভ্যাট গোয়েন্দার গোপনীয় প্রতিবেদন থেকে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য জানা গেছে।
নকল ব্যান্ডরোল লাগিয়ে সিগারেট বাজারজাতের অভিযোগ বেশ পুরোনো। কিন্তু অতীতে এটি বন্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। গত বছরের ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম কাস্টমসে পৃথক দুটি জাল ব্যান্ডরোলের চালান আটকের পর নড়েচড়ে বসে এনবিআরের বর্তমান প্রশাসন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট অফিসকে সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর তদারকির নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে ভ্যাট গোয়েন্দাকে এ ব্যাপারে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয়।
সূত্র জানায়, এনবিআরের নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ভ্যাট গোয়েন্দা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ১০টি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনকৃত ২৮ ব্র্যান্ডের সিগারেট সংগ্রহ করে। এরপর সেগুলোর ব্যান্ডরোল যাচাইয়ের জন্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে পাঠানো হয়।
বিস্তর যাচাই শেষে ৫ জানুয়ারি করপোরেশন ভ্যাট গোয়েন্দায় একটি প্রতিবেদন পাঠায়। এতে বলা হয়, ৭টি ব্র্যান্ডের সিগারেটে নকল ব্যান্ডরোল ব্যবহার হয়। এগুলো হলো-তারা ইন্টারন্যাশনাল টোব্যাকোর জেট ও পিকক; হেরিটেজ টোব্যাকোর গুরু, ভার্গো টোব্যাকো পার্টনার, দেশ গোল্ড, ভার্জিন; মিরাজ টোব্যাকোর সেনর গোল্ড।
এছাড়া ৪টি ব্র্যান্ডের সিগারেটের ব্যান্ডরোল পুনঃব্যবহারের প্রমাণ পায় করপোরেশন। এগুলো হলো-হেরিটেজ টোব্যাকোর সিটি গোল্ড ও গুরু; ওয়ান সিগারেট ফ্যাক্টরি বাংলাদেশের রিজেন্ট ও টপ১০। আর দুটি ব্র্যান্ডের সিগারেটে স্ট্যাম্প-ব্যান্ডরোল পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম কাস্টমসে আটককৃত জাল ব্যান্ডরোলের সঙ্গে ভ্যাট গোয়েন্দার পাঠানো সিগারেটের প্যাকেটে ব্যান্ডরোলের মিল পাওয়া যায়নি। স্ট্যাম্পে ব্যবহৃত কাগজ, কালি, হলোগ্রাফিক ফয়েল ও মুদ্রণ পদ্ধতিতে সাদৃশ্য নেই। অর্থাৎ ওইসব ব্যান্ডরোল এসব ব্যান্ডে ব্যবহার করা হয়নি।
এ বিষয়ে সিগারেট ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বয়ক শেখ শাবাব আহমেদ বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি, অবৈধভাবে আমদানিকৃত এবং নকল ব্যান্ডরোলের সিগারেটের কারণে সরকার ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। চট্টগ্রাম কাস্টমসে নকল ব্যান্ডরোল আটকের পর ভ্যাট গোয়েন্দার অনুসন্ধানে সেটি আবারও প্রমাণিত হলো।
যেসব কোম্পানি চিহ্নিত করা গেছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে শিগগিরই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। তিনি আরও বলেন, শুধু সিগারেট কোম্পানিই নয়, বিড়ি উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকেও কঠোর নজরদারিতে আনা প্রয়োজন।
এদিকে ১৯ জানুয়ারি অবৈধভাবে আমদানিকৃত জাল/নকল সিগারেট স্ট্যাম্পের ব্যবহার রোধকল্পে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিমের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়।
ওই সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান সন্দেহজনক সিগারেটের ব্যান্ডরোল যাচাই, বন্ধ সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনিটরিং এবং বিড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কঠোর নজরদারিতে আনার নির্দেশ দেন। সভার কার্যবিবরণী সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, স্থানীয় রাজস্ব আহরণে সিগারেট একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এ খাতে রাজস্ব ফাঁকি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনিটরিং করা গেলে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।
বাজারে বিক্রীত কোনো সিগারেটের ব্যান্ডরোল নিয়ে সন্দেহ হলে তাৎক্ষণিক সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে পাঠিয়ে তা পরীক্ষার নির্দেশ দেন।
সভায় মূসক বাস্তবায়ন ও আইটি অণুবিভাগের সদস্য আব্দুল মান্নান শিকদার বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা নামমাত্র নিবন্ধন গ্রহণ করে গোপনে সিগারেট ও বিড়ি উৎপাদন করছে।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের এসব প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারি করতে পারলে স্বার্থ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এ সম্পর্কে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, নিবন্ধন গ্রহণ করে ব্যবসা করছে না-এমন প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করে নিবন্ধন বাতিলসহ তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অবৈধ স্ট্যাম্পের ব্যবহার অনেকাংশে কমে যাবে।
তাছাড়াও বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো গোপনে সিগারেট উৎপাদন করছে কি না, তা গভীর নজরদারির মধ্যে রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, সিগারেটের পাশাপাশি বিড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় নজরদারি বৃদ্ধি করা দরকার। প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় তারা ব্যবহৃত ব্যান্ডরোল বাজার থেকে সংগ্রহ করে বিড়ির প্যাকেটে পুনঃব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে থাকে। এজন্য নিয়মিত মনিটরিং করলে এ খাতে রাজস্ব ফাঁকি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে।


