প্রতিরক্ষা মহাহিসাব নিরীক্ষকের কার্যালয়ের অধীন ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অডিটর পদে নিয়োগের প্রশ্নফাঁসের মূল হোতা নোমান সিদ্দীকি। ৮ বছর ধরে তিনি বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসে জড়িত ছিলেন।
সেই ফাঁসের প্রশ্ন দিয়ে তার নিকটাত্মীয়স্বজনের চাকরিরও ব্যবস্থা করিয়েছেন। আবার বিক্রি করে উপার্জন করেছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। গড়ে তুলেছেন বাড়িগাড়ি। তার চক্রে রয়েছেন জনপ্রতিনিধিসহ একাধিক রাঘববোয়াল। এ ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে আরও একাধিক ব্যক্তির সন্ধানে নেমেছেন গোয়েন্দারা। এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্ত চলাকালেই তড়িঘড়ি করে এরই মধ্যে (২৩ জানুয়ারি) অডিটর পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে।
জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মশিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় মাস্টারমাইন্ড নোমান সিদ্দীকি। তিনি একসময় সরকারি চাকরি করতেন। ২০১৪ সালে তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়ার পর প্রশ্নফাঁসে জড়িয়ে পড়েন। সেখান থেকে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা উপার্জন করেছেন। একই সঙ্গে তার আত্মীয়স্বজনকেও চাকরির ব্যবস্থা করেছেন ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে।
সম্প্রতি তিনি তার চক্রে আরও একাধিক সদস্যকে যুক্ত করেন। এর মধ্যে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) নিবন্ধিত ফারুক নামে এক ব্যক্তিও রয়েছেন। তাকেসহ আরও একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, ডিফেন্স ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের অডিটর পদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে প্রমাণিত। বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানোও হয়েছে। এরপরও যেহেতু ফল প্রকাশ করা হয়েছে, তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না।
ডিসি মশিউর রহমান জানান, ৮ বছরে নোমান একাধিক ব্যক্তিকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন দিয়ে চাকরির ব্যবস্থা করেছেন। তাদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। এছাড়া তিনি আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। তদন্তের স্বার্থে এখনই তাদের নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, নোমান সিদ্দীকি এবং বগুড়ার ধুপচাঁচিয়া উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবা নাসরীন রূপাসহ ১০ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার তাদের দুই দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে। রিমান্ডে তারা অনেক গডফাদারের নাম বলেছেন। এনটিআরসি-এ নিবন্ধিত ফারুকসহ যাদের নাম এসেছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
ডিবি সূত্র জানায়, ফারুকের সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল মাহবুবা নাসরীন রূপার। রূপা ইডেন কলেজের সাবেক ছাত্রলীগ নেত্রী। তদবির বাণিজ্য করেও কামিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। সম্প্রতি তিনি সরকারি চাকরির জন্য বিভিন্ন স্থানে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। একপর্যায়ে ফারুকের মাধ্যমে পরিচয় নোমান সিদ্দীকির সঙ্গে। সেই সূত্র ধরে কিছু পরীক্ষার্থী সংগ্রহ করেন রূপা। ওইসব পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা করে। ১
৮ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া টাকা বিকাশ ও রকেটে লেনদেনের বিষয়টি অস্বাভাবিক হওয়ায় নজরে আসে গোয়েন্দাদের। এরপর তারা নজরদারি শুরু করলে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি বেরিয়ে আসে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ২১ জানুয়ারি কাফরুল থানার শেনপাড়া পর্বতার ৪৯৮/৪ ভবনের এ/২ ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। এ সময় সেখান থেকে নোমান সিদ্দীকিকে গ্রেফতার করা হয়। তার বাসা ও দেহ তল্লাশি করে ৪টি মোবাইল ফোন সেট ও একটি ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। পরে সেখান থেকে ৬ পাতা অডিটর নিয়োগ পরীক্ষার পার্ট-১-এর এমসিকিউ প্রশ্নপত্রের ফটোকপি পাওয়া যায়।
একই সঙ্গে ওই পরীক্ষার ৮ জন প্রার্থীর নামের তালিকা উদ্ধার করা হয়। ওই প্রার্থীরা হচ্ছেন ফারদিন ইসলাম, লুৎফর রহমান, আমিনুল ইসলাম, সেলিম মাতবর, আহাদ খান, পারুল বালা, আকলিমা খাতুন ও মোরশেদ।
ডিবি সূত্র জানায়, মাহমুদুল হাসান আজাদের দেহ তল্লাশি করে মফিজুর রহমান, পল্লব কুমার, হাসিবুল হাসান, সুরুজ আহম্মেদ নামে ৪ জনের প্রবেশপত্র ও হাতে লেখা উত্তরপত্র উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে গ্রেফতার নাইমুর রহমান তানজীর ও শহিদুল্লার কাছ থেকেও ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তরপত্র ও বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একাধিক বিকাশ ও রকেটের নম্বরও উদ্ধার করা হয়।
ডিবি গুলশান জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) রেজাউল হক জানান, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের আশঙ্কা থেকেই পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। অনেকটা ফাঁদ পেতে চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার নোমানসহ কয়েকজনের নামে কাফরুল থানায় মামলা করা হয়েছে। চক্রের প্রধান আসামি নোমানের গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগতি থানার চর আলগিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম মো. আবু তাহের মিয়া। প্রশ্নফাঁসের টাকায় তিনি ঢাকায় ও তার গ্রামের বাড়িতে অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। প্রশ্নফাঁসে ছাপাখানার কেউ জড়িত আছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গ্রেফতা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
ডিবি সূত্র জানায়, নোমান সিদ্দীকির বাসায় অভিযান শেষে পুলিশ অডিটর পদের পরীক্ষাকেন্দ্র বিজি প্রেস স্কুলে অভিযান চালায়। সেখান থেকে পরীক্ষারত অবস্থায় ভাইস চেয়ারম্যান রূপাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মেসেঞ্জার থেকে হিরণ খান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখানে প্রশ্নফাঁস নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়। এমনকি ফাঁস হওয়া প্রশ্নের কিছু উত্তরও পাওয়া যায়। রূপার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রমনা থানাধীন ৫৫/১ নিউ শাহীন হোটেলের ২৪ নম্বর রুমে অভিযান চালায় ডিবি। সেখান থেকে মো. আল আমীন আজাদ রনি, মো. রাকিবুল হাসান, মো. হাসিবুল হাসান ও নাহিদ হাসানকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে অত্যাধুনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। ওই ডিভাইসের মাধ্যমে পরীক্ষাকেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের কাছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সমাধান পাঠানো হচ্ছিল।
ডিবি গুলশান জোনের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার খলিলুর রহমান জানান, রমনার হোটেল থেকে গ্রেফতার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। ওই মামলায় আসামি পাঁচজন। এছাড়া পলাতক আরও একাধিক ব্যক্তির নাম এজাহারে আছে। তদন্তের স্বার্থেই ওইসব নাম এখন বলা যাচ্ছে না।


