বাতিলের খাতায় যাদের নাম লেখা হয়েছিল, সেই অস্ট্রেলিয়াই হাসল শেষ হাসি। গত পরশু রাতে দুবাইয়ে শেষ মহারণে নিউজিল্যান্ডকে আট উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো টি ২০ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলো অস্ট্রেলিয়া। কেমন হলো এবারের টি ২০ বিশ্বকাপ? সাবেক অধিনায়ক রকিবুল হাসান ও অভিজ্ঞ কোচ সারোয়ার ইমরান চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন।
রকিবুল হাসান : টি ২০ বিশ্বকাপের শুরুতে অস্ট্রেলিয়াকে কেউ এগিয়ে রাখেনি। ফেভারিট মনে করা হয়েছিল ভারত ও ইংল্যান্ডকে। ভারত শুরুর ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই তাদের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়। ভালো খেলে ফাইনালে এসে হারল নিউজিল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়া ঠিক সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান খেলেছে অসাধারণ। কিন্তু হোঁচট খেয়েছে আসল সময়ে। রোমাঞ্চ ছড়িয়েছে এবারের টুর্নামেন্ট। এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর ছিল টস। শিশিরের কারণে পরে ব্যাট করা দলের সুবিধা হয়েছে। পাকিস্তানের ফাইনাল খেলা উচিত ছিল হয়তো। তারা নিজেদের আলাদাভাবে চিনিয়েছে। নিউজিল্যান্ড বারবার ফাইনালের মঞ্চ থেকে ফিরছে। কেইন উইলিয়ামসনের দলটা অসাধারণ। তারা মানসিকভাবে অনেক শক্ত। ফাইনালেও তারা পরে ব্যাট করলে অন্যরকম ফল হতে পারত। এশিয়ায় বিশ্বকাপ হলো, অথচ ফাইনালে এশিয়ার কেউ থাকল না।
প্রথমদিকে বিশ্বকাপের উইকেট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরে ভালো উইকেটে খেলা হয়। বোলিংয়ে সেরা পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই স্পিনার, সেরা দুজন লেগ-স্পিনার। অভিজ্ঞরা এই বিশ্বকাপে প্রভাব ফেলেছে। ব্যাটিংয়েও পরীক্ষিতরাই ভালো করেছে।
এই বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু নেওয়ার আছে। কীভাবে উইকেট বুঝতে হবে, উইকেট বুঝে ব্যাটিং-বোলিং করতে হবে, এই বিশ্বকাপ অনেকটাই তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। বোলার ও ব্যাটার বুঝে পরিকল্পনা সাজাতে হয় কীভাবে, সেটাও দেখিয়েছে।
সারোয়ার ইমরান : বিশ্বকাপে এবার যে ধরনের উইকেটে খেলা হয়েছে, তাতে প্রথমদিকে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান ফেভারিট ছিল। ভারত তো প্রথম দুটি ম্যাচে খুবই খারাপ করল। এই বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে খুবই ভালো খেলতে দেখা গেছে। অথচ, সেমিফাইনাল থেকে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ড বিদায় নিল। শুরুটা অগোছালো মনে হলেও শেষের দিকে অস্ট্রেলিয়া ভালো খেলেছে। নিউজিল্যান্ড ছিল ধারাবাহিক। ইংল্যান্ড ও পাকিস্তান গ্রুপপর্বে যেভাবে খেলেছে, সেভাবে এগোলে তারা আরও সামনে যেতে পারত। অস্ট্রেলিয়া শেষের দিকে চমৎকার ক্রিকেট খেলেছে।
নিউজিল্যান্ড বারবার ফাইনালে হারছে, এতে ওদের দোষ নেই। ফাইনালে খেলাই বিরাট ব্যাপার। এবার বিশ্বকাপে টস গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যারাই টস জিতেছে তারাই পরে ব্যাট করার সুবিধা পেয়েছে। তারাই বেশি ম্যাচ জিতেছে। ফাইনালেও সেই সুযোগটা নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। এই বিশ্বকাপে পাকিস্তান অনেক ভালো খেলেছে। অনেকদিন ধরে তারা ঘরের মাঠে প্রাণ খুলে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলতে পারে না। এবার তারা দারুণ ক্রিকেট খেলেছে।
বাংলাদশ এই বিশ্বকাপ থেকে কী নিতে পারে, একথা বলার আগে নিজেদের ঘর আগে ঠিক করতে হবে। কিছু নেওয়ার আগে ঘর গোছাতে হবে। তা না হলে জোর করে কিছুই নিতে পারবে না। দলের মধ্যে কোন্দল, বিশৃঙ্খলা থাকা কোনো ভালো খবর নয়। বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে যারা নতুন দায়িত্বে আসছে তারাও কিছু করতে পারবে না। বরং আরও খারাপ হবে। তাই ভালো কিছুর জন্য সঠিক লোককে খুঁজে নিতে হবে।
একটা কথা বলা উচিত, সেই নদীতেই মাছ ভালো হয়, যেখানে কোনো বাধা থাকে না। তৃতীয়, দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগ কিংবা জাতীয় লিগ কীভাবে চলছে? জাতীয় লিগের কোনো মান নেই। ১০০ রান তাড়া করতে পারছে না কোনো দল। দেশের এই ক্রিকেট দেখার জন্য অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের কোচ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। ক্রিকেটারদের যেটা বেশি প্রয়োজন, সেই অনুশীলনের সুযোগ কী আছে এদেশে? ঢাকায় এক মিরপুরই ভরসা। বিভাগীয় শহরে কিছুই নেই। অথচ, আমাদের সমকক্ষ যাদের মনে করা হয়, সেই শ্রীলংকার অনুশীলন, জিম ও ক্রিকেটারদের সুযোগ-সুবিধা আমাদের চেয়ে শতগুণ ভালো। পাকিস্তানের প্রতিটি প্রথম শ্রেণির ক্লাবের আলাদা মাঠ, অনুশীলন ও খেলার সুবিধা আছে। ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া তো অনেক দূরে। তাই বিশ্বকাপ থেকে ভালো কিছু নেওয়ার আগে নিজের ঘর ঠিক করে গোছান।


