স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে নিজের দক্ষতা, সচ্ছতা, দূরদর্শীতা, আপসহীনতা, অপ্রতিরোধ্য পথচলা ও জনদরদী রাজনীতির জন্য যে মহান ব্যক্তিরা আজীবন গণমানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন, মিডিয়া কর্মী, বন্ধুপ্রতীম ও ভিন্নমতের রাজনৈতিক দলের লোকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান করে নিয়েছিলেন অধ্যাপক মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দীন রহ. ছিলেন তাদের অন্যতম।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার তিন সেশনের (১৯৮১-৮৩) কেন্দ্রীয় সভাপতি ছিলেন।
১৯৮১ সালে বাংলাদেশ জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার উদ্যোগে আলিয়া মাদরাসা ছাত্রদের ১৭ দফা দাবি আদায়ে জাতীয় সংসদ ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।
দূরদর্শী ও অপ্রতিরোধ্য অন্দোলনের মাধ্যমে অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের স্বায়ত্বশাসনের দাবি আদায় করেন। পরবর্তীতে স্বায়ত্বশাসিত মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের প্রথম চেয়ারম্যান জনাব বাকিবিল্লাহ খানের উপস্থিতিতে মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দীনকে সংবর্ধিত করা হয়। এটি তার সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে অন্যতম বড় সফলতা।
বাগেরহাটের মোড়লগঞ্জে বাবা আলহাজ মাওলানা আব্দুল আলীর প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়ার হাতেখড়ি তাঁর। তারপর খুলনা শিরোমনি হাফেজিয়া মাদরাসায় পবিত্র কুরআন হেফজ করেন তিনি। পরে ঢাকা আলিয়া থেকে কামিল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজে এমএ সম্পন্ন করেন তিনি।
আপাদমস্তক এই রাজনীতিবিদ অধ্যাপনা ও সমাজমুখী কাজে ছিলেন এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। ফার্মগেটের পশ্চিম রাজাবাজার জামে মসজিদে ৪২ বছর ধরে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এছাড়াও তিনি মালিবাগ আবুজর গিফারী কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন এবং আমৃত্যু রামপুরা কামরুন্নেসা ডিগ্রি কলেজের সহযোগী অধ্যাপকের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৮৭ সালে পশ্চিম রাজাবাজার হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ঢাকার মালিবাগে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী আবুজর গিফারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। কিছুদিন তার পিতার প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি রামপুরা একরামুন্নেছা ডিগ্রি কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন।
মাওলানা এটিএম হেমায়েত উদ্দিন পশ্চিম রাজাবাজার হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও মাতুয়াইল আল্লাহ কারীম মাদ্রাসাসহ বহু মসজিদ-মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
সদা হাস্যোজ্জ্বল, সদালাপী ও বিনয়ী মানুষটি যখন রাজপথে মুষ্টিবদ্ধ হাতে শ্লোগান তুলতেন তখন যে কারো তনু মনে এক ধরনের রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে যেত। নিজেকে ধরে রাখতে পারতেন না। অঝোর ধরায় অগ্নিঝরা ভাষণের জন্য তিনি ছিলেন সুপরিচিত। গগনবিদারী বক্তব্যে মুহূর্তের মধ্যেই আলোড়ন তুলতো সর্বত্র। তার পুরো দেহ ও হৃদয়জুড়ে প্রতিবাদের স্রোতধারা বয়ে যেতো। তার শরীরের প্রতিটি রক্তকণায় মিশে ছিল দেশপ্রেম, ইসলাম আর কল্যাণরাষ্ট্র বিনির্মাণের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। নির্মল আদর্শের অকুতোভয় এক সৈনিক ছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির পথিকৃৎ হাফেজ্জী হুজুর রহমাতুল্লাহর সঙ্গের ইনসাফপূর্ণ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন।
খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে থেকেই হাফেজ্জী হুজুরের রহ.-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল খুবই মধুর। হাফেজ্জী হুজুরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি ঝাপিয়ে পড়েন সর্বস্ব দিয়ে। খেলাফতের স্বপ্ন পূরণে ত্যাগ আর কুরবানির নযরানা পেশ করেন। হাফিজ্জী হুজুরের মৃত্যুর পর হাফিজ্জী হুজুরের শিষ্য মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করিম (পীর সাহেব চরমোনাই রহ.) এর নেতৃত্বে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন জনদরদী সংগ্রামী নেতা মাও. এটি এম হেমায়েত উদ্দীন রহ.।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম (পীর সাহেব চরমোনাই রহ.)এর মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে বলিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।
১৯৮৭ সালে ১৩ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হওয়া সেই রাজনৈতিক শক্তিটি আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম ইসলামী শক্তি হিসেবে আবিভূত হয়েছে। তিনি ইসলামী আন্দোলনের রাজনীতির সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে ছিলেন, মনে হতো তার জীবনের লক্ষ্য, নেশা এবং পেশাই ছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। পীর সাহেব চরমোনাইর প্রতি তার আনুগত্য, সংগঠনপ্রীতি, ইসলাম দেশ ও মানবতার প্রতি দরদ ছিল অতুলনীয়।
অধ্যাপক মাও. এটিএম হেমায়েত উদ্দিন রহ. ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে সর্বশেষ অবিভক্ত ঢাকা মহানগরীর দীর্ঘদিনের লড়াকু সভাপতি ও পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ ও ৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ঐক্যজোটের অন্যতম শরীক দল পীর সাহেব চরমোনাইর নেতৃত্বাধীন ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পক্ষ্য মিনার প্রতিকে বাগেরহাট-৪ আসন থেকে নির্বাচন করেন।
২০০১ সালে ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বাগেরহাট ৩-৪ আসনে নির্বাচন করেন। তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট ছিল ২০০২ সালে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের হয়ে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা অবস্থান। সেই নির্বাচনে সাদেক হোসাইন খোকার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ঢাকাবাসীসহ দেশবাসিকে চমক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।
পীর সাহেব চরমোনাই আহুত ইসলাম, দেশ ও মানবতার পক্ষের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে প্রথম সারির এক বীরের নাম এটিএম হেমায়েত উদ্দীন। আন্দোলন, সংগ্রাম, মিছিল মিটিংয়ে পুলিশের টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে পল্টনের রাজপথে সর্বদা গর্জে ওঠতেন বীরদর্পে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংগ্রামী আমির, পীর সাহেব চরমেনাই রহ. এর ডানহাত হয়ে ইসলামী রাজনীতিতে জীবন বিলিয়েছেন লাভ লোকসানের হিসেব মিলানো ছাড়াই। বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিবাদ করে জেল খেটেছেন দীর্ঘ সময়। ভারতের ফারাক্কা ও টিপাইমুখ বাঁধ বিরোধী আন্দোলন, বাবরি মসজিদ রক্ষার আন্দোলন, মায়ানমার, ফিলিস্তন, কাশ্মীর ও ওইঘুরে মুসলিম নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন,ফতোয়া বিরোধী আন্দোলন সহ এমন কোন আন্দোলন সংগ্রাম নেই যেখানে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করেননি। রাজপথ থেকে যতবার গ্রেফতার হয়েছেন ততবারই দ্বিগুণ আগ্রহ নিয়ে ফিরে এসেছেন আবারও রাজপথে। রাজনীতিতে ভয় বলে কোন শব্দ ছিল না তার জীবনে। বহুবার মিছিলের ব্যানার ছিনেয়ে এনেছেন পুলিশের হাত থেকে।
ইসলাম, দেশ ও মানবতার অতন্দ্র প্রহরী এই মহান ব্যক্তি দীর্ঘদিন ফুসফুসে আক্রান্ত থেকে ২০১৯ সালের ১১ অক্টোবর মহান প্রভূর ডাকে সাড়া দিয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন। আল্লাহ সুবহানুহু তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করুন।
লেখক: নূরুল বশর আজিজী
নির্বাহী সম্পাদক, প্রেজেন্ট নিউজ


