দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন দীর্ঘ নয় মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে ১ নভেম্বর থেকে ভ্রমণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের অনুমোদন মিললেও বাস্তবে সেখানে এখনো কোনো পর্যটক যাত্রা শুরু হয়নি। কারণ, দ্বীপে ওঠানামার জন্য ব্যবহৃত একমাত্র জেটিঘাটের সংস্কারকাজ এখনো শেষ হয়নি। ফলে নতুন পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে দ্বীপ ভ্রমণ নিয়ে।
🛳️ জেটিঘাট সংস্কারে ধীরগতি, পর্যটন অনিশ্চিত
সেন্টমার্টিনের জেটি নির্মাণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান এস. এস. রহমান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড জানিয়েছে, সাত কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় ৭০টি পাইলিংয়ের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। তবে সিঁড়ি ও রোলিং কাঠামো তৈরির কাজ বাকি। সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ চলায় নির্মাণের গতি মন্থর, এবং স্থানীয়দের অভিযোগ—মানও নিম্নমানের। তাই বর্তমানে জাহাজ ভিড়ানোর মতো উপযুক্ত ঘাট এখনো তৈরি হয়নি।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. আলী হায়দার বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি মৌসুমের মধ্যেই কাজ শেষ করতে। রোলিং কাঠামো ও সিঁড়ি তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।”
⚓ দিনে গিয়ে দিনে ফেরা: নতুন নিয়মে ভাটা পর্যটনে
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে সেন্টমার্টিনে শুধু দিনে গিয়ে দিনে ফেরার সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ। এই বিধিনিষেধের কারণে পর্যটন ব্যবসায় নতুন করে ভাটা নেমেছে। শনিবার (১ নভেম্বর) থেকে ভ্রমণের অনুমতি থাকলেও কোনো জাহাজ ছাড়েনি, কোনো পর্যটকও যাননি দ্বীপে।
সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর জানান, কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া থেকে ‘কর্ণফুলী এক্সপ্রেস’ ও ‘বার-আউলিয়া’ জাহাজ চালুর কথা থাকলেও মালিকপক্ষ সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। দিনে গিয়ে দিনে ফেরার সিদ্ধান্তকে তিনি “বাস্তবসম্মত নয়” বলে মন্তব্য করেন।
🌊 নতুন নির্দেশনা ও পরিবেশ সুরক্ষার কৌশল
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জারি করা ১২ দফা নির্দেশনা অনুযায়ী,
-
কোনো নৌযান বিআইডব্লিউটিএ ও মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া দ্বীপে যেতে পারবে না।
-
পর্যটকদের অনলাইনে কিউআর কোডযুক্ত টিকিট কিনতে হবে।
-
দিনে সর্বাধিক ২ হাজার পর্যটক যেতে পারবেন।
-
রাতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ, মোটরসাইকেল বা সি-বাইক চালানো নিষিদ্ধ।
-
কেয়াবন, সামুদ্রিক কাছিম, প্রবাল বা শামুক-ঝিনুকের ক্ষতি করা যাবে না।
-
একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
এছাড়া ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সীমিত পর্যটকদের জন্য রাত্রীযাপনের অনুমতি থাকবে, কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে দ্বীপে পর্যটন পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
🏖️ স্থানীয়দের হতাশা ও ব্যবসায় মন্দা
সেন্টমার্টিন হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির আহ্বায়ক আবদুর রহমান জানান, দ্বীপে প্রায় আড়াই শতাধিক হোটেল-রেস্টহাউজ থাকলেও এখনো কোনো প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “গত বছরও দেখেছি, কক্সবাজার থেকে আট ঘণ্টা ভ্রমণ শেষে কেউ রাত্রিযাপনের আগ্রহ দেখায়নি। এবারও হয়তো ডিসেম্বরের আগে পর্যটক আসবে না।”
🌱 সরকারের লক্ষ্য—দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, “দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ১২ দফা নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য সেন্টমার্টিনকে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের আদর্শ মডেল হিসেবে গড়ে তোলা।”
শেষ কথা:
নয় মাস পর সেন্টমার্টিনে পর্যটনের দিগন্ত খুললেও অসম্পূর্ণ অবকাঠামো ও কঠোর নির্দেশনার কারণে এই মৌসুমে দ্বীপ ভ্রমণ এখনো অনিশ্চিত। পরিবেশ রক্ষা ও পর্যটন টিকিয়ে রাখার ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।


