তদন্তাধীন ৫৫ মামলায় চার্জশিট মাত্র ৩টিতে

0
186

ই-কমার্স প্রতারণার অভিযোগে ২৫টির বেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত এক বছরে শতাধিক মামলা হয়েছে। এসবের মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ৫৫টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এই মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটিতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। বাকি মামলাগুলো তদন্তাধীন। তদন্তাধীন মামলাগুলোর চার্জশিট দ্রুত দাখিল করার লক্ষ্যে কার্যক্রম চলমান বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরীনসহ পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন থানায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। এসবের মধ্যে রাজধানীর গুলশান, ধানমন্ডি ও বাড্ডা থানায় করা তিনটি মামলা তদন্ত করছে সিআইডি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে করা ওই তিনটি মামলায় প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্ত চলমান বলে জানিয়েছেন সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর ভাটারা থানায় এবং যশোর কোতোয়ালি থানায় রিং আইডির পরিচালক সাইফুল ইসলামসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুইটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা দায়েরের পর সাইফুলসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতারের পর রিং আইডির প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন সাইফুল। রিং আইডি একটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফরম হিসাবে অ্যাপ লঞ্চ করে। পরে তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধভাবে আমানত সংগ্রহ করে। তারা তিনটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিন মাসেই গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মূল মালিক সোনিয়া মেহজাবিন, তার স্বামী মাকসুদুর রহমান, অন্যতম মালিক বীথি আক্তার, সিইও আমানউল্লাহ চৌধুরী এবং প্রতিষ্ঠানটির পৃষ্ঠপোষক বনানী থানার তৎকালীন পরিদর্শক সোহেল রানাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় ২১টি মামলা হয়। কোনো মামলাতেই এখনো চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বেশির ভাগ কর্মকর্তা গ্রেফতার হলেও সোহেল রানা পলাতক থাকেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ভারতে গ্রেফতার হন। এখনো তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা যায়নি। ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়ার মামলাগুলোর চার্জশিট দ্রুত দেওয়ার লক্ষ্যে তদন্তকাজ চলছে বলে জানিয়েছেন সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি ইমাম হোসেন।

ধামাকা শপিং ডটকমের বিরুদ্ধে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ এবং মানি লন্ডারিং আইনে কয়েকটি মামলা হয়েছে। এসবের মধ্যে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে করা বনানী থানায় এবং ওই বছরের অক্টোবরে করা হাজারীবাগ থানার মামলার তদন্ত করছে সিআইডি। বনানী থানার মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন পণ্যের লোভনীয় অফার ও ভার্চুয়াল সিগনেচার কার্ড বিক্রির প্রলোভন দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৮০৩ কোটি টাকা আদায় করে প্রতিষ্ঠানটি।

হাজারীবাগ থানায় করা মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ধামাকা শপিং ডটকমের কোনো প্রকার অনুমোদন ও লাইসেন্স নেই। নেই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট। ইনভেরিয়েন্ট টেলিকম বাংলাদেশ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে ব্যবসায়িক লেনদেন করেছে তারা। প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হয় ‘ধামাকা ডিজিটাল’ নামে, পরে ২০২০ থেকে ‘ধামাকা শপিং ডটকম’ নামে কার্যক্রম শুরু করে।

প্রতারণার মাধ্যমে মাত্র দুই দিনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নগদের ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৬৩ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান সিরাজগঞ্জ শপ ডটকমের মালিক জুয়েল রানার (২২) বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বছরের ৩০ ও ৩১ আগস্ট সিরাজগঞ্জ শপ ডটকম থেকে বিভিন্ন নগদ অ্যাকাউন্টে গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য একের পর এক ‘রিফান্ড রিকোয়েস্ট’ পাঠিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপরাধ, অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান কিউকমের বিরুদ্ধে পাঁচটির বেশি মামলা হয়েছে। এসবের মধ্যে রাজধানীর লালবাগ থানার একটি এবং গুলশান থানার দুটি মামলার তদন্ত করছে সিআইডি। এসব মামলায় কিউকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রিপন মিয়া ও হুমায়ুন কবির (আরজে নিরব) বিভিন্ন মেয়াদের রিমান্ডে ছিলেন। এখন তারা জামিনে মুক্ত। মামলাগুলোর তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

সিআইডি আরও যেসব ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত করছে, সেগুলোর মধ্যে আছে টুয়েন্টিফোর টিকেটি লিমিটেডের বিরুদ্ধে তিনটি (পল্টন, উত্তার পশ্চিম ও কাফরুল থানার), এহসান গ্রুপের বিরুদ্ধে চারটি (পিরোজপুর সদর থানার) এবং র‌্যাপিড ক্যাশ কুইক অনলাইন ই-লোনস অ্যাপ, সহজ লাইফ অ্যান্ড লাইভলি লাইফ, আনন্দের বাজার, তলয় ডটকম, আলিফ ওয়ার্ল্ড এবং দালাল প্লাস ডটকমের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানায়, ই-কমার্সের ছয়টি মামলার তদন্ত শুরু করে ডিবি। এই ছয়টি মামলায় আসামি ছিল ৩১ জন। মামলাগুলোর মধ্যে তিনটির চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে ১৮ জনকে আসামি করা হয়।

ডিবি জানায়, এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আল আমিন ও তার স্ত্রী পরিচালক শারমিন আক্তারসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। উচ্চ কমিশনের প্রলোভন দেখিয়ে ২৩ লাখ আইডির বিপরীতে ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলার তদন্ত চলছে। কলাবাগান থানায় করা মানি লন্ডারিং আইনের মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, কোম্পানির হিসাব থেকে ১ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করে মানি লন্ডারিং করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে নিরাপদ ডটকম নামে একটি অনলাইনভিত্তিক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৬ জুন আদাবর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির সিআইও শাহরিয়ার খান এবং পরিচালক ফারহানাকে গ্রেফতার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ। ইতোমধ্যে এই দুইজনের চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় নিরাপদ শপের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত বছরের অক্টোবর করা একটি মামলার তদন্ত চলমান।

এক হাজার ৬০০ গ্রাহকের কাছ থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে রিওয়ার্ডরুপি ডটকমের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কদমতলী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। এ মামলায় এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন বলে ডিবির সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গত বছরের ৬ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় করা এক মামলায় এজাহারে বলা হয়েছে থান্ডার লাইট টেকনোলজি লিমিটেড দুইটি অ্যাপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এ মামলায় এ পর্যন্ত ১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন বলে জানিয়েছেন ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইমের উপকমিশনার তারেক বিন রশিদ। তিনি জানান, প্রায় ১০ হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইপিসি গ্লোবাল লিমিটেডের নামে গত বছরের ২ নভেম্বর বাড্ডা থানায় একটি মামলা হয়। এ মামলায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ মামলাটিও তদন্তাধীন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here