ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও (বৃহস্পতিবার) ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়াপাল্টা-ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দুপুর ১২টার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। দুই ছাত্রসংগঠনের পালটাপালটি সংঘর্ষ, ধাওয়াপালটা-ধাওয়ার ঘটনায় পুরো ক্যাম্পাস উত্তপ্ত।
হেলমেট পরে চাপাতি, দা, লাঠি, রড, ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্পসহ দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করা হয়েছে। আর এতে প্রায় ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছে বলে দাবি ছাত্রদলের।
এদিকে একপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাচ্ছে উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাবি উপাচার্য।
পদ্মা সেতু ইস্যুতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ করে ছাত্রদল। ছাত্রলীগের অভিযোগ, সেই সমাবেশে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ‘কটূক্তি’ করেছেন। এরপর থেকেই ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল ইউনিটের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে ছাত্রদলকে প্রতিহতের ঘোষণা দেন।
ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদকের সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয় ছাত্রদল। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে আসার পথে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার এলাকায় ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন তারা। ওই দিন অর্ধশতাধিক কর্মী আহত হন বলে দাবি ছাত্রদলের। আর এই হামলার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচির পালনের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি।
এদিকে ছাত্রদলের কর্মসূচি ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে মহড়া দিতে থাকেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল শাখার নেতাকর্মীরা। এ সময় তাদের হাতে রড, স্ট্যাম্প, লাঠি, লোহার পাইপ, হকিস্টিক, বাঁশ ইত্যাদি দেখা যায়। এদিন পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি করতে ১২টার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অভিমুখে মিছিল নিয়ে যাত্রা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
ছাত্রদলের মিছিলটি হাইকোর্ট এলাকায় এলে কার্জন হলের সামনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের ধাওয়া করেন। এতে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়াপাল্টা-ধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে কার্জনে অবস্থান নেওয়া ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গে মধুর ক্যান্টিন, টিএসসি এলাকায় অবস্থান নেওয়া নেতাকর্মীরা যোগ দিলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। পরে তারা হাইকোর্টের ভেতরে অবস্থান নেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হাইকোর্টের গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে তাদের ওপর ফের হামলা চালান। এ সময় বাঁশ, লাঠি, রড ও লোহার পাইপ দিয়ে কয়েকজন ছাত্রদল কর্মীকে পেটানো হয়। ছাত্রলীগের কর্মীরা এ সময় কয়েকজন সাংবাদিককেও মারধর করেন।
হাইকোর্ট এলাকায় ছাত্রদলের ওপর হামলার সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা অনলাইন পোর্টাল ডেইলি ক্যাম্পাসের সাংবাদিককে পিটিয়ে মোবাইল ছিনতাই করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।এ সময় ওই সাংবাদিককে ছাত্রলীগের কর্মীরা বেধড়ক মারধর করে। আহত ওই সাংবাদিকের নাম আবির আহমেদ (২৭)।
এদিকে হামলায় আহত ছাত্রদল কর্মীদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের শাহবুদ্দীন শিহাব নামের এক কর্মীকে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে।
ছাত্রদলের আহতরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন, সদস্য সচিব আমানুল্লাহ আমান, যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক সদস্য মো. তারিকুল ইসলাম তারিক, জিয়াউর রহমান হলের সভাপতি তারেক হাসান মামুন, বিজয় একাত্তর হলের সহসভাপতি তানভীর আজাদী, ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মাসুদ রানা প্রমুখ।
ছাত্রদলের দাবি, আহতদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের জুয়েল হোসেন, দক্ষিণের লিখন আহমেদ, ঢাবির বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের সহসভাপতি তানভীর আজাদি হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হটাতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হেলমেট পরে চাপাতি, দা, লাঠি, রড, ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্পসহ দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দিক থেকে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়ার শব্দও শোনা যায়।
হামলার বিষয়ে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক আক্তার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে গেলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র হামলা করে। ছাত্রদলের ৩০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে।
ছাত্রদলকে প্রতিহতের ব্যাখ্যা জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, ছাত্রদল তার পুরনো ইতিহাসের মতো ফের ক্যাম্পাসকে উত্তপ্ত করতে চাইছে। যেভাবে তারা অতীতে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে, এখনো তারা সেটাই করছে। এরই অংশ হিসেবে মিছিলের নামে মহড়া দিচ্ছে। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসকে শান্তিপূর্ণ রাখতে রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করেছে। তাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছি আমরা ছাত্রলীগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতের মতো তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম, খুন ও হত্যা হতে দিতে পারি না আমরা। বিগত বছরগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো মেধাবীর প্রাণ ঝরেনি, কেন না সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। আমরা চাই না, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতের মতো সন্ত্রাসীদের হাতে প্রাণ ঝরুক মেধাবী শিক্ষার্থীদের। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও চায় না। আর এ কারণেই এই প্রতিরোধ।
এ বিষয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় বলেন, অছাত্রদের নিয়ে গড়া ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বুড়ুদের ছাত্রসংগঠন। চাচ্চুদের নিয়ে গড়া এই অছাত্রদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বাঁশ হাতে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর চরাও হয়েছে। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো চাচ্চু এসে যদি শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা ছাড় দেবে না এটাই স্বাভাবিক।
তিনি আরও বলেন, স্বীকার করতে হবে বিগত বছরগুলোতে ক্যাম্পাসে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারছে। হঠাৎ করে কী এমন হয়েছে যে তারা ক্যাম্পাসে এভাবে চড়াও হবে? এমন শান্তিপূর্ণ দেশ তারা কখনো চায়নি। আর তারা চাঁদাবাজিতে চ্যাম্পিয়ন ছিল। এখন ক্যাম্পাসে কিন্তু সেই টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজি হয় না। এই যে শিক্ষার্থীরা ভালো আছে, এটাই তারা দেখতে পারছে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে অতীতে যেভাবে ছাত্রলীগ ছিল, এখনো সেভাবেই আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বরদাস্ত করবে না। ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে এক পক্ষ। সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। যাতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবহার করতে না পারে।


