অভিবাসনের সুখ-বিড়ম্বনা! (পর্ব-৮)

0
214

ঢাকা থেকে দুবাই এবং দুবাই থেকে হিথ্রো যাত্রায় দেশীয় সংস্কৃতির উপস্থিতি ব্যাপক হলেও, লন্ডন থেকে কেলগেরীর যাত্রাটি যেন একেবারেই অন্যরকম! আমার মতো বাদামিদের সংখ্যা একেবারেই হাতে গুণা, আর যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এয়ার হোস্টেজদের খাতির যত্নটাও যেন তাদের দিকেই একটু বেশি। সংখ্যালঘু বা গায়ের রঙের কারণে কিনা জানিনা, আমাদের দিকে বিমানবালাদের কর্কশ চাহনি মোটেও আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। গত পর্বে উল্লেখ করেছিলাম, আমার তিন বছরের শিশু সন্তান হালকা গরম দুধে আসক্ত। যখনি তার বিরক্তির মাত্রাটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, হালকা গরম দুধই যেন তার প্রশান্তি এনে দেয়। কোন বিধিবিধান আর নিরাপত্তা কৌশল জানিনা, এয়ার কানাডা গরম দুধতো নয়ই, গরম পানি সরবরাহেও তাদের চরম আপত্তি!

দীর্ঘ প্রায় দশ ঘন্টার যাত্রায় দু’বার কোমল পানীয়, আর চা,কফি বাদে একবার ডিনার সরবরাহ হবে। এর বাহিরে এয়ার কানাডার কাছ থেকে আর কোন খাদ্য সেবা পাওয়া যাবে না, এটি বুঝতে খুব বেশি সময় লাগেনি। আকাশ পথে যাত্রী সেবার এমন কসরত, এর আগে কখনো চোখে পড়েনি। যাত্রা শুরু হওয়ার ঘন্টা খানেকের মধ্যে স্ন্যাকসের সাথে কোমল পানীয়, ক্ষুধার্ত পেটে মন্দ যায়নি। এয়ারক্রাফটটি যতই এগিয়ে চলছে, ফেলে আসা অতীত কখনো আমায় বিষন্ন করে তুলছে আবার কখনো নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি আর নতুন সমাজের ভাবনায় কিছুটা উত্তেজনাও কাজ করছে।

সময় জানান দিচ্ছে, অর্ধেকের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছি। এয়ার হোস্টেজরা খাবার পরিবেশনে ব্যস্ত। বিফ,চিকেন আর ভেজিটেবল এর কোন একটা বেঁচে নিতে হবে, সাথে নাকি অন্নও আছে। শিশু সন্তানটি ক্ষুধায় চটপট করছে, এমিরেটসের মতো এয়ার কানাডায় শিশুদের জন্য কোন বাড়তি খাতির যত্ন নেই, বরং নানারকম বিরক্তিকর অনুশাসন আছে। এয়ার হোস্টেজ খাবার নিয়ে হাজির, জানালেন আমাদের জন্য কোন অপশন নেই। তিনজনের জন্যই হালাল খাবার বরাদ্ধ আছে। মনে মনে ট্রাভেল এজেন্সির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্যাকেটগুলো খুলতে শুরু করি।

তিনটি আলাদা আলাদা ট্রে পরিপাটি করে সাজানো। ফয়েল মুড়ানো প্যাকেটগুলো খুলেই বুঝতে পারি, এগুলো আমার খাদ্য নয়। স্বাস্থ্যসম্মত ও হালাল তাতে কোন সন্দেহ নেই, তবে আমার জন্য তা মোটেও উপাদেয় নয়। লবন,মসলা ছাড়া তেল বিহীন সিদ্ধ সবজি আর মাংস, আমার পাকস্থলীতে যাওয়ার কোন উপায় নেই। দেখতে পছন্দ না হলে, সে খাবারে আমার পাকস্থলী গরম হয়ে যায়, তাই সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে সরবরাহকৃত খাবার বর্জনেরই সিদ্ধান্ত নিলাম। দুটো ছোট প্লাস্টিকের বাটিতে অল্প কিছু গাজরের হালুয়া ছিল, এ দিয়ে ছেলে আর আমার আপাত ক্ষুধা নিবারন করতে হলো। স্ত্রীর আবার এসব নিয়ে কোন বালাই নেই, খাদ্য যেমনই হোক, ভূরিভোজনে তার কোন সমস্যা নেই।

দীর্ঘ পথের ক্লান্তিতে অবসন্ন হলেও কখন কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাবো এ নিয়ে এক ধরনের টানটান উত্তেজনা কাজ করছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বড় ভাই, ভাবী আর আমাদের পরিবারের একমাত্র আদুরে মেয়ে অর্পার সংগে দেখা হবে, এ যেন শেকরের সন্ধানে এক অন্যরকম অনুভূতি। একমাত্র বোন নিউইয়র্ক প্রবাসী লিমা ও তার স্বামী রিংকু, আমাদেরকে অভিবাদন জানাতে কেলগেরীতে অপেক্ষা করছে, আর মাত্র ঘন্টা দু’য়েকের মধ্যেই তাদের সাথেও দেখা হবে। পেছনের বিষন্নতার চেয়ে সামনের আনন্দ শিহরণের মুহূর্তগুলোই যেন এখন আমায় টানছে বেশি।

জুন ২৭, ২০০৬ এর রৌদ্রস্নাত বিকেল সাড়ে চারটা, আর মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যেই কেলগেরী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে এয়ার কানাডার বোয়িং। জানালা দিয়ে মনে হচ্ছে, স্বচ্ছ আকাশটি যেন ন্যুয়ে পড়েছে। এয়ারক্রাফটটি ল্যান্ড করার সাথে সাথেই আমার শিশু সন্তানটির মুখেও হাসির ঝিলিক। সে যেন আর এক মুহূর্তও এয়ার কানাডার বদ্ধ ঘরে থাকতে নারাজ। মাইক্রোফোনে পাইলট সবাইকে ধন্যবাদ জানানোর সাথে সাথেই যাত্রীরা সবাই একে একে হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে সামনের দিকে এগুচ্ছে। ইমিগ্রেশনের সাইন অনুসরণ করে আমরাও এগিয়ে চলছি। সামনেই সুশৃঙ্খল সারিবদ্ধ লাইন।

কোন ভিআইপি, ভিভিআইপি ব্যবস্থা নেই, আমলা,মন্ত্রী বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আর আমার মতো সাধারণের জন্য একই ব্যবস্থা। কেউ কাউকে ডিঙিয়ে সামনে যাবে, এমন প্রবণতাও চোখে পড়েনি। যেখানটায় আমরা দাঁড়িয়েছি, তা থেকে সামনে শতাধিক মানুষ অপেক্ষমান। কারো মাঝে উদ্বেগ উৎকন্ঠা আর তাড়াহুড়োর বালাই নেই। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, সবাই একে একে আমাদের কে সামনের দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। প্রাথমিক অবস্থায় বিষয়টি বুঝতে একটু দেরী হলেও, পরক্ষণেই বুঝতে পারি, সংগে থাকা শিশু সন্তানের জন্য সবার দৃষ্টিতেই আমরা প্রাধিকার পাচ্ছি। সিনিয়র সিটিজেন বা বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরাও এভাবেই ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যায়। আশ্চর্যজনক হলো, এ প্রাধিকার ব্যবস্থার জন্য কোন পূর্ব ঘোষণা বা নির্দেশনার প্রয়োজন পড়েনি। বয়োজ্যেষ্ঠ, শিশুসন্তান, সন্তানসম্ভবা নারীদের প্রতি এখানকার নাগরিকদের দায়িত্ববোধ দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই। শিশু সন্তানের কল্যাণে কিছুক্ষণের জন্য আমরাও যেন ভিআইপি হয়ে উঠলাম!

পাসপোর্টগুলো এগিয়ে দিতেই হাস্যবদনে ইমিগ্রেশন অফিসার অনেকগুলো ফর্ম বাড়িয়ে দিয়ে স্বাক্ষরের স্থানগুলো দেখিয়ে দিলেন, সেই সাথে বর্তমান ঠিকানা আর ফোন নম্বরের গুরুত্বটিও ব্যাখ্যা করলেন। প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো লিপিবদ্ধ করে ফর্মগুলো জমা দিলে এমনভাবে কনগ্রেচুলেশন বললেন, মনে হলো আমাদেরকে অভিবাদন জানাতেই যেন তিনি সেখানে বসেছিলেন। ইমিগ্রেশনে অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ নিয়ে,ঢাকা থেকে রওয়ানা হওয়ার আগেই,মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আবেদনের আগেই জানতাম, ইমিগ্রেশনে তিনজনের পরিবারে সতেরো হাজার কানাডিয়ান ডলারের সক্ষমতার প্রমাণ দিতে হবে। তাই ট্রাভেল চেক আর ক্যাশ মিলিয়ে, সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়া ছিল।

ইমিগ্রেশন অফিসার শুধু জানতে চাইলেন, ‘দশ হাজারের বেশি ক্যাশ আছি কিনা?’ বাকী দু’জনের কাছে কোন নগদ ডলার নেই, সেটি জানার পর, আমার ফরমটিতেও ‘না’ বোধক মার্ক দিয়ে দিলেন। ‘দু’সপ্তাহ পর তিনজনের পারমানেন্ট রেসিডেন্সি কার্ড ঠিকানা অনুযায়ী পৌঁছে যাবে’ সেটি জানিয়ে বাড়তি কোন সাহায্যের প্রয়োজন আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। ‘ওয়েলকাম টু কানাডা’ বলে ল্যান্ডিং পেপারগুলো ধরিয়ে দিলেন। এক্সিট ফলো করে এরাইভ্যাল এরিয়াতে লাগেজ পিকআপের নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যাই। সেখানে গিয়ে ভাই, ভাবী, লিমা, রিংকুসহ অনেক স্বজনের দেখা, মনে এক ভিন্ন রকম আবেগ অনুভূতির জন্ম দেয়। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করতেই চারটি লাগেজ চলে আসে, তবে শেষ অবধি অপেক্ষা করেও বাকি দু’টোর কোন হদিস নেই।

কিছুটা দুশ্চিন্তা নিয়ে পাশে থাকা লাগেজ ম্যানেজমেন্ট অফিসে যাই। বিষয়টি খুলে বলতেই, আমাদের টিকেটগুলো চেক করে বললেন, আজকের ফ্লাইটে আসেনি, কাল আমার দেয়া নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে যাবে। দুঃখ প্রকাশ আর বিনয়ের এমন নজির আমার চোখে এমনটি আর পড়েনি। ধন্যবাদ জানিয়ে সদলবলে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যাই। গাড়ির কাছাকাছি যেতেই লাস্যবদনে জড়িয়ে ধরে ভূতাত্ত্বিক অগ্রজসম রওশন ভাই, শৈশবকাল থেকেই যিনি আমাদের অতি আপনজন। কোলাকুলি করে হ্রদয়ের উষ্ণ বন্ধনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় বড় ভাবীর অনুজ সদ্য ইমিগ্র্যানট হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্সের শিক্ষক তপন ভাই, যার সংগে একসময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অফিসে আমার নিয়ত বৈকালিক আড্ডা ছিল।

কয়েক মিনিটের কুশলাদি আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর গাড়িতে আরোহন করি। বরফের দেশ কানাডা, জুনের রৌদ্রোজ্জ্বল বিকেলে এটি বুঝার ঝো নেই। এয়ারপোর্ট থেকে মাত্র পনেরো মিনিটের দুরত্বে কেলগেরী শহরের উত্তর পূর্ব জোনের আবাসিক এলাকা মার্টিনডেল। যতই মার্টিনডেলের দিকে এগিয়ে চলছি, ততই যেন বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যাচ্ছি! প্রকৃতির প্রতি কোন দেশের মানুষ, সিটি কাউন্সিল আর সরকারের এমন ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা আর সযত্নে লালনের দৃষ্টিান্ত স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। রাস্তার দু’ধারে সমদূরত্বে একই প্রজাতির একই সমান সবুজ বৃক্ষরাজী যেন শিল্পী জয়নুল আবেদীনের শস্য শ্যামল বাংলার কল্পিত কোন চিত্রকর্ম!! সড়ক আর আবাসিক এলাকার পরিচ্ছন্নতা দেখলে মনে হয়, এ যেন বাস্তবের নয় স্বপ্নের কল্পিত কোন রুপনগর। আর নান্দনিক শৈলকর্মে তৈরী প্রায় একই রকম নকশার বাড়ীগুলো যেন স্থাপত্য কলার অপুর্ব নৈসর্গিক নিদর্শন!!

অর্থ-বিত্তের মোহ আর যান্ত্রিকতার চাপে বাঙালি সমাজের ঐতিহ্য যখন নানারকম চ্যালেঞ্জের মুখে, সেই সময়ে প্রবাসের ব্যস্ততম জীবনে আতিথেয়তার সংস্কৃতি দেখে বিমোহিত হয়ে যাই। আত্নীয় পরিজন থেকে শুরু করে আমার ন্যুনতম চেনাজানা সবারই মিলনমেলা বসেছে আমার বড় ভাইয়ের বাসায়। সবার সমন্বিত অংশগ্রহণে মুখরোচক রুচিসম্মত খাবারের আয়োজন দেখে শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত গ্রামীণ আতিথেয়তার কথা মনে পড়ে যায়। জেনে আনন্দিত হই, নানা উছিলায় এভাবে প্রবাসের বাঙালি কমিউনিটি একত্রিত হয়, সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা বিনিময়ের মাধ্যমে বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করার প্রাণপণ চেষ্টা চালায়। এরই মধ্যে জেনে গেলাম, এদেশে দুটো দলিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এর একটি ছাড়াও জীবন চলে না!!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here