বইমেলায় চলছে শেষ মুহূর্তের বিক্রি। এখনো বিকালে পাঠকরা মেলায় আসছেন। অনেকের এখানে এসে বইয়ের সঙ্গে সময় কাটানোটা এই অল্প সময়ে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বেলা বুঝি এবার ফুরালো। বইমেলায় বিদায়-রাগিণী বেজে উঠেছে।
সেখানে এখন তাই ভাঙনের সুর। প্রকাশনাগুলোর প্যাভিলিয়ন স্টলে শেষ মুহূর্তেই বিক্রির পাশাপাশি মেলা শেষে কিভাবে কাঠামো ভেঙে ফেলবে, কিভাবে বই যার যার অফিসে নিয়ে যাওয়া হবে সেই আলোচনাও হচ্ছে।
মঙ্গলবার বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে গিয়ে দেখা যায়, বিকাল হতেই বেশ অনেক মানুষ আসতে শুরু করেছেন। এদিন সোমবারের তুলনায় পাঠকের অংশগ্রহণ বেশি ছিল। এসেছিলেন লেখকরাও। মেলার ছোট-বড় প্রতিটি প্যাভিলিয়ন ও স্টলেই টুকটাক বিক্রি চলছিল।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে এ বইমেলা আমাদের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি বলেন, এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস জানার আগ্রহ হোক, তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করুক, তাই হবে বইমেলার সফলতা। মঙ্গলবার বিকালে একুশে বইমেলায় গ্রন্থ উন্মোচন মঞ্চে রাজনীতিক রাশেক রহমান রচিত ‘প্রণয়ের রাজনীতি’, কৃষিবিদ সালেহ মোহাম্মদ রশীদ অলক গ্রন্থিত ‘গণমাধ্যমে হাতেখড়ি’, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী অবলম্বনে তথ্য ক্যাডার কর্মকর্তা আফরোজা নাইচ রিমার কাব্যগ্রন্থ ‘শতবর্ষে শত কবিতা’, কবি সৌমিত্র দেব সম্পাদিত প্রবন্ধ সংকলন ‘বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ’ এবং সাংবাদিক সাজেদা পারভীন সাজুর কাব্যগ্রন্থ ‘অপেক্ষা’র মোড়ক উন্মোচন শেষে তিনি এসব কথা বলেন।
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ, সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবুসহ আরও অনেকে।
এদিন সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসাবে বঙ্গবন্ধু-মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলন বিষয়ক ১০টি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সবগুলো বই-ই প্রকাশ করেছে আগামী প্রকাশনী। বইগুলো হলো আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘ইডিপাশের গল্প এবং বাংলাদেশ’, ড. মেসবাহ কামাল সম্পাদিত ‘একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী : মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নির্মাণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, আনোয়ারা সৈয়দ হকের ‘বঙ্গমাতা ও দুই কন্যার কথা’ এবং ‘রাসেল তার আব্বুর হাত ধরে হেঁটে যায়’, ‘মোনায়েম সরকার রচনাবলি প্রথম খণ্ড; বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ’, অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদারের ‘মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নপূরণে সুশাসন’, বিভুরঞ্জন সরকারের ‘বঙ্গবন্ধু : ইতিহাসের নির্মাতা’, ড. এম আবদুল আলীমের ‘রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন : জেলাভিত্তিক ইতিহাস’ এবং সিরাজুল ইসলাম মুনিরের ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’। কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক, আগামী প্রকাশনীর প্রকাশক ওসমান গণিসহ আরও কয়েকজন লেখক এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
মঞ্চের আয়োজন : বিকালে বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘ভাষাসংগ্রামী অজিত কুমার গুহ : জীবন ও কর্ম’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান।
প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হাসান ইমাম মজুমদার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জাফর ওয়াজেদ, মোহাম্মদ জয়নুদ্দীন এবং রাজীব সরকার। সভাপতিত্ব করেন বেগম আকতার কামাল।
প্রাবন্ধিক বলেন, পূর্ববাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসে অবিস্মরণীয় নাম অজিত কুমার গুহ। শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশে, মানবতার মূল্যবোধ ও সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে আমৃত্যু লড়াই করে ইতিহাসে নিজের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। প্রগতিশীল চিন্তার বাহক, মুক্তমনের অধিকারী, আপসহীন, দৃঢ়চেতা, আদর্শবাদী, বুদ্ধিজীবী, বাগ্মী, শিক্ষাবিদ প্রভৃতি যে বিশেষণেই বিশেষিত করা হোক না কেন, তার অন্যতম প্রধান পরিচয় ভাষাসংগ্রামী অজিত কুমার গুহ। যে-কোনো রাষ্ট্রিক-সামাজিক বিপর্যয়ে ভাষা-আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী অধ্যাপক অজিত কুমার গুহর সাহসী অবস্থান লক্ষণীয়।
আলোচকরা বলেন, খুব তরুণ বয়স থেকেই অজিত কুমার গুহর মধ্যে স্বাধীনচেতা, অসাম্প্রদায়িক এক আদর্শ গড়ে উঠেছিল। নিজের মূল্যবোধ ও আদর্শ থেকে তিনি কখনও বিচ্যুত হননি। তিনি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে চেয়েছিলেন যারা দেশ, দেশের মানুষ এবং শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে ভালোবাসবে। নতুন প্রজন্মের সামনে অধ্যাপক অজিত কুমার গুহর আলোকিত জীবন ও মূল্যবান রচনা তুলে ধরতে পারলে জাতি উপকৃত হবে।
বেগম আকতার কামাল বলেন, ছাত্রদের মধ্যে আদর্শ একটি জীবনচেতনা গড়ে তোলাই ছিল অজিত কুমার গুহর শিক্ষক জীবনের লক্ষ্য। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এ বিরল মানুষ বহু অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। মানবতাবাদী, দেশপ্রেমী ও উদার মানসিকতার অধিকারী অজিত কুমার গুহ যে আদর্শ আমাদের সামনে রেখে গেছেন তা অনুসরণ করেই আগামীর পথে অগ্রসর হতে হবে।
এদিন ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজের বই নিয়ে আলোচনা করেন আহমাদ মোস্তফা কামাল।
অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি রাম চন্দ্র দাস, মোতাহের হোসেন মাহবুব, আয়শা জাহান নূপুর এবং ইসমাত শান্তি। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী রাশেদ হাসান, সুবর্ণা আরফীন, নাসিমা খান বকুল, ফারজানা করিম এবং রুমা সরকার। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল ফয়জুল্লাহ সাঈদের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘ঢাকা স্বরকল্পন’, অতনু করণজাইয়ের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভোলা থিয়েটার’, মো. মাসুম হুসাইনের পরিচালনায় নৃত্য সংগঠন ‘পরম্পরা নৃত্যালয়’ এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন সুফী ব্যান্ড ‘আনজুমানে রহমানিয়া মইনীয়া মাইজভাণ্ডারীয়া’র পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সাধিকা সৃজনী তানিয়া।
নতুন বই : মঙ্গলবার মেলায় নতুন বই এসেছে ১২১টি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশ হয়েছে আসাদুুদ জামানের ‘রাহাতের রাত দিন’, অবসর থেকে মলয় পাঁড়ে অনূদিত আবদুলরাজাক গুরনাহের ‘প্যারাডাইস’, পলল প্রকাশনী থেকে খান মাহবুবের ‘পূর্বাপরে আফগানিস্তান’, চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন থেকে তুষার কবিরের ‘প্রেম সংক্রমণ’। শান্তির প্রবেশ এনেছে রাসেল আশিকীর তিনিট বই ‘নামহীন মহাকাব্য’, ‘ভালোবাসার সিলমোহর’ ও ‘ভাবতরঙ্গের আলো’, বাংলা একাডেমি এনেছে তানভীর আহমেদ সিডনীর ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি চেতনা, বীরেন মুখার্জির ‘বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা’, সুবর্ণ এনেছে মুনতাসীর মামুনের ‘একাত্তরে গানে গানে জাগরণী’, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি এনেছে ফকর উদ্দিন তালুকদার, মো. খালিদ আওরঙ্গজেব ও খলিল আহমদ সম্পাদিত ‘ছাদকৃষির সহজপাঠ’ ও ‘পশুপাথি পালনের সহজপাঠ’, আরডিএম মিডিয়া এনেছে মো. জিহাদ সরকারের ‘একজন জিন্নাহ ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা’, বইঘর এনেছে মুহম্মদ নূরুল হুদার ‘আয় দুখু আয়’, অয়ন প্রকাশন এনেছে দিলু খন্দকারের ‘ক্রীড়া সাংবাদিকতায় চার দশক’, পুথিনিলয় এনেছে ইমরান-উজ-জামানের প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের মেলা পার্বণ’।


