আমি চট্টগ্রামে থাকি। তাই প্রতিদিন অমর একুশে বইমেলায় আসার সৌভাগ্য হয় না। কিন্তু বইমেলাকে উপলক্ষ্য করেই এ সময়টাতে দু-একবার মেলা প্রাঙ্গণে আসা হয়। প্রতিবারই বইমেলাকে আমার কাছে নতুন মনে হয়। যেহেতু দূরে থাকি।
দূরের জিনিসের প্রতি মানুষের এক ধরনের দুনির্বার আকর্ষণ থাকে। ঢাকায় যারা থাকেন নিত্যদিনের দেখার কোনো একটা চমৎকার জিনিসও হয়তো কখনো ম্লান মনে হয় তাদের। কিন্তু আমরা যারা দূরে থাকি তাদের কাছে আকর্ষণটা ভিন্ন। এ দূরে থাকার কারণেই বইমেলার প্রতি এক ধরনের প্রীতি ও ভালোবাসা আছে। এ কারণে বইমেলায় বারবার আসি। মেলার অনেক ত্রুটির কথা জেনেও যে কদিন থাকি, মেলাকে উপভোগ করি আনন্দের সাথে।
তবে এটি বললে ঠিক হবে না যে, এবারের বইমেলা সর্বার্থেই ভালো হয়েছে। দিনে দিনে আমাদের উন্নতি হচ্ছে। সেটা রাষ্ট্রীয়, অবকাঠামো, শিক্ষার ক্ষেত্রে। লেখালেখির ক্ষেত্রেও হচ্ছে। সেদিক থেকে বলতে গেলে বইমেলার যে উত্তরণ, সেটাও হওয়া উচিত। গতবছর মেলায় বেশ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছি। সুন্দর করে মেলামাঠে ইট বিছানো ছিল। বেশ কয়েকবার পানি ছিটাতেও দেখেছি। কিন্তু এবার সেরকম কিছু চোখে পড়েনি। মেলায় অনেক ধুলোবালি উড়ছে। অনেক জায়গায় ইট বিছানো নেই। আবার অনেক স্টলে ইট এমন অগোছালোভাবে বিছানো হয়েছে তাতে কাউকে কাউকে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে দেখেছি।
আরেকটি বিষয় বলতেই হয়। অনেকে বিশেষ করে মধ্যবয়সি ও বয়স্ক মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসেন। নানা কারণে ওয়াশরুম ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে তাদের। কিন্তু এবার সেখানে বেশ নোংরা অবস্থা দেখেছি। মেলায় আগতদের বসার জন্য ভালো ব্যবস্থা এবার করা হয়নি। কিছু সাদা বেঞ্চ দেওয়া হলেও সেগুলো মিডিয়ার মানুষদের ব্যবহারের জন্যই ছিল বলে মনে হয়েছে। অল্প-বয়সিরাই সেগুলো দখলে রেখেছেন। কিন্তু বয়স্ক বা মধ্যবয়সি মানুষের জন্য পুরো মেলায় যে বসার ব্যবস্থা তা নেই। তারা ক্লান্ত হয়ে গেলে কোথাও একটু শান্তি নিয়ে বসবেন সে জায়গা নেই।
বইয়ের দোকানগুলো খুঁজে নেওয়াটা খুব কঠিন হয়ে গেছে। একদিন আমি নিজেও প্রয়োজনে দুটি স্টল খুঁজে বের করতে পারিনি। তারপর আরেকদিন গিয়ে খুঁজে পেয়েছি।
তবে বইমেলার যে বিস্তৃতি সেটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার। সেই বিস্তৃতির সঙ্গে বসায় জায়গা, পানি ছিটিয়ে ধুলো নিয়ন্ত্রণ, পরিছন্ন ওয়াশরুম, সুন্দর করে সব জায়গায় ইট বিছানো বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। যে বইমেলার সঙ্গে গোটা বাঙালির চিন্তা ও ভালোবাসা জড়িয়ে আছে এবং প্রতিবছর হয় সেটা এক মাসের জন্য কেন সুসংস্কৃত হবে না। আরামপ্রদ হবে না। মনে রাখতে হবে, এখানে যারা আসেন তারা বইয়ের টানেই আসেন।


