দক্ষিণ উপকূলে সদ্য ঘোষিত বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা যুবলীগের নতুন কমিটিতে স্থান পাননি দলের ত্যাগী ও পরিক্ষিত নেতারা। অনুপ্রবেশকারী ও বিএনপি পরিবারের সদস্য, চাকরিজীবী,নিস্ক্রিয় এবং স্থানীয় বিভিন্ন নির্বাচনে নৌকার বিরোধীতাকারী ও বিতর্কিতদের জয়জয়াকার অবস্থা।
এনিয়ে দলের অভ্যন্তরে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ ও হতাশা। বিএনপি-জামাতসহ বিরোধী জোটের আগামী দিনের আন্দোলন সংগ্রাম মোকাবিলা করতে কতটুক সক্ষম হবে দুই জেলার এই ঐতিহ্যবাহী এই যুব সংগঠনটি। তা নিয়ে খোদ দলের মধ্যেই চলছে চুলছেড়া বিশ্লেষণ। যুবলীগের নতুন কমিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে।
গত ৭ মার্চ বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ দুই জেলার ১০১ সদস্যের বরগুনায় সুপার ২৮ ও পটুয়াখালী জেলায় সুপার ২১ জনের নাম ঘোষণা করে।
সদ্য ঘোষিত বরগুনা যুবলীগের সভাপতি রেজাউল করিম এ্যাটম একসময় ছিলেন জাতীয় পার্টির ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার এক চাচাতো ভাই ইলিয়াস পৌর বিএনপির ১ নং ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক। আরেক ভাই শাহদাৎ জেলা তাঁতী দলের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ৫ চাচাত ভাই বিএনপির বিভিন্ন পদে রয়েছেন। আর সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বাবু বরগুনা পৌর বিএনপির আহবায়ক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য।
প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মহসিন মিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে এক সময়ে ছাত্রদল করার অভিযোগ। বামনা উপজেলা বিএনপির এক নেত্রীর ছেলে এড: ইমরান জেলা যুবলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক। আরো ১০/১২ জনের বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান ও নানা অনৈতিক ও বিতর্কিত কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে।
সদ্য ঘোষিত বরগুনা জেলা কমিটিতে ত্যাগী ও যোগ্যদের বাদ পড়া ও বিতর্কিতদের স্থান পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা গোলাম সরোয়ার টুকু যুগান্তরকে বলেন, যুবলীগ নিয়ে মিডিয়ার কাছে ওপেন মন্তব্য করা কঠিন। কিন্তু সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে ব্যাপক হতাশা, ব্যাপক প্রশ্ন যুবলীগের মধ্যেই আছে, আওয়ামী লীগের মধ্যেও আছে এবং সাধারণ মানুষের মঝেও আছে। সকলের প্রত্যাশা ছিল ৩ মাসব্যাপী এত তদন্ত ,গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া, এত কিছুর পর কেন্দ্রীয যুবলীগ একটি ভালো কমিটি উপহার দিবে কিন্তু আমরা খুবই হতাশ। সামগ্রিক ২৮ জন সম্পর্কেই বলছি এর চেয়েও ভালো কিছু করার সুযোগ ছিল। এ সুযোগ কেন হাতছাড়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এভাবে বলতে পারব না, এটা পার্টির অভ্যন্তরীন ব্যাপার। এই কমিটি মানতে না পারলেও তো মানতে হবে। তবে আমি হতাশ।
বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো.জাহাঙ্গীর কবিরকে বরগুনা জেলা যুবলীগের কমিটিতে বিএনপিসহ অন্য দলের অন্তর্ভূক্তির ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার কাছে বহু ম্যাসেজ আছে, আমিও খোঁজ খবর নিচ্ছি। আমি এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের মিটিং ডাকব। মিটিংয়েই এনিয়ে আলোচনা হবে।
বরগুনা জেলা যুবলীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু যুগান্তরকে বলেন, সুবিধাবাদীরা সুযোগ পেলে সুযোগ নিবে এটাই স্বাভাবিক। তবে দুঃসময়ে তারা কেউ থাকবে না। তবে যুবলীগের চেয়ারস্যান ও সাধারণ সম্পাদক যদি জানতে পারেন, নৌকা বিরোধীরা বরগুনা জেলা যুবলীগের কমিটিতে স্থান পেয়েছে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন এটা আমার বিশ্বাস।
বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক এডঃ কামরুল আহসান মহারাজ যুগান্তরকে বলেন, কেউ আমার মতামতও নেয়নি, আর কেউ কিছু জিজ্ঞেসও করেনি। অন্য দলের লোকজন যুবলীগের কমিটিতে ঢুকছে বলে আমি শুনছি এর বেশি কিছু বলতে পারব না।
পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ্ব কাজী আলমগীর বলেন, নৌকার বিরোধী ও বিতর্কিতদের তালিকা আমি কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে দিয়েছি। তারা কমিটি দিলে আমার কি করার আছে?
বরিশাল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন পর পটুয়াখালীতে কমিটি হয়েছে। কম-বেশি ভুল হতেই পারে। শুধু একটি ছেলে ভুল ইনফরমেশন দিয়ে প্রচার সম্পাদকের পদ নিয়েছে। তার ভাই দশমিনা বিএনপির নেতা, তা আমরা পরে জেনেছি। এর বাইরে আমাদের আর কোন ভুল ধরার সুযোগ নেই। একটি কমিটির মূল হল সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কমিটি দিলেই ভাবার কোন কারণ নেই যে, তারা সেট হয়ে গেছে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমানিত হলে তাকে বাদ দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
বরগুনা জেলা যুব লীগের কমিটি নিয়ে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কথা বলার কোন সুযোগ নেই। শুধু দুটি কেলেম আপনি দিতে পারবেন, সহসভাপতি বাবু ও আইন সম্পাদক ইমরানের ব্যাপারে। যুবলীগকে নতুন ধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কে যুবলীগের কমিটিতে থাকবে সেটা কেন্দ্রীয় যুবলীগই সিদ্ধান্ত নিবে। আমরা যে কমিটি দিব সেটাকে সহয়তা করা জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্ব। তাড়াহুড়া করে কমিটি দেওয়ায কিছু ভুলত্রুটি হয়েছে।
বরিশাল বিভাগের দায়িত্ব প্রাপ্ত কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম বদি বলেন, সিভি ক্যালেকশন করে যাছাইবাছাই করেই যুবলীগের কমিটি করা হয়েছে। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে যদি বিএনপি বা অন্য দলের কেউ ঢুকে থাকে উপযুক্ত প্রমান স্বাপেক্ষে তাদেরকে বাদ দেওয়া হবে।
অনুপ্রবেশকারী ও বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্য ও দলের জন্য নিবেদিত কর্মীদের মূল্যায়ন করে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলা যুবলীগের পুর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার দাবী দুই জেলার দলীয় কর্মী-সমার্থদের।


